হেফাজতের দাবির মুখে ২০১৭ সালের ২৫ মে রাতে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে থেমিসের ‘কংক্রিটের আকৃতি’ অপসারণ করা হয়। ফাইল ছবি

প্রতিস্থাপন কাহিনি: আবেগ ও কতিপয় সেকুলারগণ

দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে, যারা রাজনীতিতে ইসলামকে অস্বীকার করেননি এবং ইসলামকেই রাজনীতি বানাননি, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাই ছিল সময়োপযোগী।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ২০:১৮ আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ২০:১৮
প্রকাশিত: ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ২০:১৮ আপডেট: ০৫ নভেম্বর ২০১৮, ২০:১৮


হেফাজতের দাবির মুখে ২০১৭ সালের ২৫ মে রাতে সুপ্রিম কোর্ট চত্বর থেকে থেমিসের ‘কংক্রিটের আকৃতি’ অপসারণ করা হয়। ফাইল ছবি

‘হেফাজত’ প্রশ্নে দেখলাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে আলোচনার ঝড়। যদিও সিংহভাগই সমালোচনা। আর এসব সমালোচনায় হেফাজতের বর্তমান অবস্থান নিয়ে হা-হুতাশ করেছেন অনেকেই। আর যারা হেফাজতের পূর্বের অবস্থা নিয়ে ‘হাউ-কাউ’ করেছিলেন তারা চুপটি মেরে গেছেন। আমি তাদের সুরে আলোচনা-সমালোচনায় যেতে চাই না। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের রাজনীতির ধরন বা তাদের কাজকর্ম নিয়েও আলোচনা করতে চাই না। সুযোগ-সন্ধানী রাজনীতির দেশে দলগুলো সুযোগ সন্ধান করবে এটাই স্বাভাবিক, এতে দোষের কিছু নেই। মূলত আলোচনাটা হওয়া উচিত দলের বাইরে থেকে যারা সুযোগ সন্ধানের রাজনীতির দরোজাটা খুলে দেন তাদের জন্য।

হাইকোর্টের সামনে ‘থেমিস’ নিয়ে তুলকালামটি এত দ্রুত বিস্মরিত হওয়ার কথা নয়। তখন শারীরিকভাবে দলের বাইরে থাকা ‘বিশেষ মানুষ’দের কথা, বক্তব্য, লেখা এসবও বিস্মরণের নদীতে ডোবার নয়। লজ্জার নদীতে ডুবলে অবশ্য আলাদা কথা। সে সময় যারা হেফাজতের ‘থেমিস’ বিরোধিতাকে ‘দেশ গেল’ বলে জিকির তুলেছিলেন, তারা ভেবেছিলেন সময়ের বোধহয় পরিবর্তন নেই। হয়তো তাদের হৃদয়ঙ্গম হচ্ছে, আজ তারা বুঝতে পারছেন, সময় পরিবর্তনশীল। বিপরীতে যারা ভাবছেন, সব আজকের মতোই থাকবে, তারাও পরিবর্তন বিস্মৃত মানুষ।

যাকগে, ‘থেমিস কাণ্ডে’ আসি। সে সময় ‘থেমিস’ সরানোর বিষয়ে আমিও কিছু কথা বলেছিলাম। নিজে ‘থেমিস’ স্থাপনের পক্ষে ছিলাম না এবং এই পক্ষে না থাকাটা ধর্মীয় চিন্তা থেকে নয়, সাংস্কৃতিক চিন্তা থেকে। ‘থেমিস’ মূর্তিটি আমাদের সাংস্কৃতিক চেতনার সঙ্গে যায় না। আর ‘থেমিসে’র শাড়ি পরা রূপ ছিল, রীতিমতো ‘জগাখিচুরি’ চিন্তার ফসল। মোদ্দা কথা ‘থেমিস’ আমাদের সংস্কৃতি ছিল না, এটা ছিল ধার করা। যারা এর পক্ষে ছিলেন, তারা এই বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তাদের গোয়ার্তুমি ছিল অহংবোধে। তারা মূর্তি সরানোটাকে নিজ মতের পরাজয় হিসেবে ভাবছিলেন। তাদের কথিত সেকুলারিত্বের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল তৎকালীন সেই শাড়ি পরা ‘থেমিস’। ‘ইগো’জনিত জটিলতায় সেকুলারগণ ধর্ম আর সংস্কৃতি কোনোটাকেই পৃথকভাবে বোঝার ক্ষমতা রাখেননি, জটিলতা না কাটায় এখনো রাখেন না।

শাপলা চত্বরের রক্তাক্ত অধ্যায়কে যারা রাজনৈতিক পুঁজি বানাতে চেয়েছিলেন, সে অর্থে যারা হেফাজতকে সমর্থন করেছিলেন, তারা ছিলেন চিন্তার দৈন্যতার শিকার। আজ তাদের হা-হুতাশে ভরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। সমর্থন আর বিরোধিতা এ দুটোরই আধিক্যের একটা সীমা থাকা উচিত, তা তারা উপলব্ধি করতে পারেননি। তাদের চিন্তায় ছিল কেবল উদ্দেশ্যে সাধন। সাধন-ভজনের এই রাজনীতিতে প্রতিপক্ষও যে পিছিয়ে নেই, সে সময় তাদের ভাবনায় তা ছিল না। হালে হয়তো তারা উপলব্ধি করতে পারছেন বা পারবেন, ‘কেউ কারো নাহি ছাড়ে সমানে সমান’। তাতেও যদি না পারেন, তাহলে তারাও ব্যর্থ।

এখন আসি শারীরিকভাবে যারা নিজেদের দলহীন ভাবেন, তাদের কথায়। এর একটা বড় অংশ সমাজে ‘বুদ্ধিজীবী’ বা ‘সুশীল’ তকমাধারী। এদের বেশির ভাগের মধ্যেই একধরনের ‘ইসলামফোবিয়া’ রয়েছে। তাদের ধারণা, ইসলামের উত্থান ঘটলে কথিত ‘প্রগতিশীলতা’ ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাই তারা ইসলামকে ‘ডমিনেট’ করতে চান। এমন ‘ডমেনেটিং ক্যারেক্টারে’র জন্যই দেশ-বিদেশে মূল ইসলামকে পাশ কাটিয়ে চরমপন্থার উদ্ভব ঘটে। ‘মোর দ্যান মুসলিম’রা ঝড়ে বংশে বৃদ্ধি পায়। আর বৃদ্ধির গোড়ায় পানি ঢালে রাজনীতি’র পাইক-বরকন্দাজরা। যার দৃশ্যচিত্র এখন দৃষ্টির সীমানায়।

মাদরাসা শিক্ষার দুইটি ধারা একটি কওমি, আরেকটি আলিয়া। অথচ দুটি ধারাকেই এক করা যেত। ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে পার্থিব শিক্ষার সমন্বয় ঘটিয়েছে সৌদিআরব, তুরস্কসহ অন্যতম মুসলিম দেশগুলো। বাংলাদেশে তথাকথিত ‘সেকুলার’গণ, কথিত ‘ইসলামফোবিয়া’য় মাদরাসা শিক্ষাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছেন। তারা বিস্মৃত হয়েছেন, মুসলিমপ্রধান একটি দেশ এবং সংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বে চতুর্থ স্থানে, সেখানে নতুন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কিছু নেই। বাস্তবতার এমন পাঠে অহেতুক ইসলাম বিরোধিতা মানে বোকামি। আর এই বোকামির কারণেই সম্ভবত ‘চরমপন্থা’র উত্থান। বলা যায়, ‘চরমপন্থা’কে ডেকে এনে প্রতিষ্ঠা করা।

দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে, যারা রাজনীতিতে ইসলামকে অস্বীকার করেননি এবং ইসলামকেই রাজনীতি বানাননি, তাদের রাজনৈতিক চিন্তাই ছিল সময়োপযোগী। তাদের রাজনীতিতে কোনো ‘কনট্রাস্ট’ ছিল না, দ্বৈত ভূমিকা ছিল না। তারা বুঝেছিলেন সামাজিক সংস্কৃতিতে ধর্মের প্রভাবের গুরুত্ব। দেশের সিংহভাগ মানুষের দৈনন্দিন কাজ-কর্মে ধর্মের প্রভাব অবশ্য স্বীকার্য। একে অস্বীকার করতে গেলেই ঝামেলা। স্বাভাবিক যাপিত জীবনের সংস্কৃতিকে ‘ডমিনেট’ করে, অন্যরকম একটা সংস্কৃতিকে প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, যাপিত জীবনের সংস্কৃতিটাও আরোপিত সংস্কৃতিকে ‘ডমিনেট’ করতে চাইবে। হয়েছেও তাই, যার ফলেই দেশে ধর্মীয় রাজনীতির প্রভাব বেড়েছে, পুষ্ট হয়েছে। রাজনীতিকরাও ধর্মীয় আবেগটাকে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন।

তবে হঠাৎ করে ‘ইউ-টার্ন’ও বিপজ্জনক। ‘রেডিক্যাল চেঞ্জ’ প্রায় সময়ই সংশয় সৃষ্টি করে, অবিশ্বাসের জন্ম দেয়, মানুষ ভালো ভাবে নেয় না। যেমন–এক গাছের ‘ছাল-বাকল’ অন্যগাছে লাগে না। বিকল্প পথে লাগানো হলেও, তা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়। অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বাঁচা যায়, কিন্তু দীর্ঘ জীবন নিশ্চিত হয় না। বিশেষ করে রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রথম থেকেই নিজস্ব নীতি ঠিক করতে হয়, কর্মপন্থার সঠিক কৌশল নির্ধারণ করতে হয়। আর সে অনুযায়ী পরিচালিত হয় রাজনীতি। সেই রাজনীতি যদি মানুষের সার্বিক জীবনের সঙ্গে না মেলে, তবে সেই নীতি এবং নীতিসৃষ্ট কর্মপদ্ধতি ব্যর্থ হতে বাধ্য।

নীতির এই ব্যর্থতাকে ঢাকতেই তৈরি করতে হয়, নানা আড়াল, মুখোশ। মানুষের আবেগকে ব্যবহার করা হয় আড়ালের পর্দা হিসেবে, তৈরি করতে হয় সহমর্মিতার মুখোশ। ধর্মীয় রাজনীতির ধারকরা যেমন আবেগকে ব্যবহার করেন, তেমনি করেন নীতিতে ব্যর্থ কথিত সেকুলারকুলও। এদের কর্মপন্থা ‘কমন’ হয় আবেগের ব্যবহারে। অথচ আবেগ বিষয়টিই ক্ষণস্থায়ী, প্রিয়জনের মৃত্যুশোকও মানুষ কিছু দিনেই ভুলে যায়। কিন্তু যাপিত জীবনের প্রয়োজন মানুষ ভোলে না। যারা এই প্রয়োজনের সঙ্গে নিজ রাজনৈতিক নীতিটাকে ‘টিউন’ করতে পারেন তদের পথ চলা দীর্ঘ হয়। প্রকারান্তরে আবেগ নিয়ে যারা খেলেন, তাদের পড়তে হয় বারবার গাড্ডায়। এখন যেমন পড়েছেন, তথাকথিত ‘সেকুলার’গণ।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]