সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বিন মুর্তজা। পুরনো ছবি

অদম্য মাশরাফির ১৭ বছর

১৭ বছরের সময়টা সত্যিকার অর্থেই মহাকাব্যিক। সেখানে উত্থান আছে, পতন আছে; আছে হাসি ও কান্নাও।

মুশাহিদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:২৭ আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৪:২৭


সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বিন মুর্তজা। পুরনো ছবি

(প্রিয়.কম) ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। সময়টা ২০০১ সালের ৮ নভেম্বর। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার সিরিজের প্রথম টেস্ট। বাংলাদেশ দলে অভিষেক হয় ১৭ বছরের এক তরুণ পেসারের। দেশের ক্রিকেট সমর্থকরা তখনো জানতেন না, কী অমূল্য এক রত্ন টেস্ট ক্যাপ পেয়ে গেছেন।

জিম্বাবুয়ে তখন পরাশক্তি না হলেও বিশ্ব ক্রিকেটে ছিল সমীহ জাগানিয়া দল। দলে ছিলেন হিথ স্ট্রিক, অ্যান্ডি ফ্লাওয়ার, গ্র্যান্ট ফ্লাওয়ারদের মতো তারকা ক্রিকেটার। এমন দলের বিপক্ষে সেদিন সেই তরুণ পেসার বল হাতে তোলেন গতির ঝড়। ১০৬ রানের বিনিময়ে প্রতিপক্ষের চার উইকেট তুলে নিয়ে অভিষেক ম্যাচেই নিজের জাত চেনান।

এর মধ্যে তখনকার সময়ের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের উইকেটও ছিল। তখন তিনি নিজেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট তো দূরের কথা, ঘরোয়া ক্রিকেটের অলি-গলি পর্যন্ত চিনে উঠতে পারেননি।

সেই থেকে শুরু। এরপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে ১৬টি বছর। সেদিনের সেই ‘বিস্ময় বালক’ আজকে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজা।

অভিষেক টেস্টে মাশরাফি। ছবি: সংগৃহীত

এখন থেকে ঠিক ১৭ বছর আগে এই দিনটাতেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ খ্যাত মাশরাফির। বাংলাদেশ ক্রিকেটে তিনিই প্রথম ক্রিকেটার, যিনি মাঠে থেকেই পূর্ণ করতে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ১৭ বছর, পা রাখবেন ১৮ বছরে!

অনেক উত্থান আর পতনের মধ্য দিয়েই এগিয়েছে মাশরাফির ক্যারিয়ার। দুর্ভাগ্যজনক কিছু ভয়াবহ ইনজুরির শিকার হয়ে বারবার ছিটকে পড়েছেন ক্রিকেট থেকে। ক্যারিয়ারের এই ১৭ বছরে দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচার হয়েছে সব মিলিয়ে সাত বার। তবুও দমে যাননি তিনি। প্রতি বার দুঃসময়ের সঙ্গে লড়াই করে যখনই ফিরেছেন, প্রমাণ করেছেন নিজেকে। নিজে উঠে দাঁড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ক্রিকেটকে দেখিয়েছেন সামনে এগিয়ে যাওয়ার অদম্য সাহসিকতা।

ইনজুরির কারণে টেস্ট ছেড়েছেন ২০০৯ সালেই। ছবি: সংগৃহীত

এই ইনজুরির কারণে টেস্ট ছেড়েছেন ২০০৯ সালেই। মাঝে ২০১১ সালে দেশের মাটিতে বিশ্বকাপ খেলা হয়নি। আর সেটার দুঃখ ভুলতেই কিনা ২০১৫ সালে এসে বাংলাদেশের ইতিহাসে সেরা বিশ্বকাপ স্মৃতি উপহার দিলেন মাশরাফি। তার নেতৃত্বেই প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ পৌঁছে বিশ্ব ক্রিকেট মঞ্চের কোয়ার্টার ফাইনালে। এর পর থেকেই বাংলাদেশের পারফরম্যান্সের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফটা এখন গোটা বিশ্বের কাছেই স্পষ্ট।

সাত বার যেতে হয়েছে অস্ত্রোপচার কক্ষে। তবুও দমে যাননি মাশরাফি। ছবি: সংগৃহীত

আর সবকিছুর মূলে এই মাশরাফি। ওয়ানডে বিশ্বকাপ শেষে দেশের মাটিতে একে একে পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তানসহ টানা ছয়টি ওয়ানডে সিরিজে জয় পায় বাংলাদেশ। সবই হয়েছে মাশরাফির নেতৃত্বে। শুধু কি তাই? মাশরাফির হাত ধরেই প্রথমবারের মতো আইসিসির কোনো টুর্নামেন্টে সেমিফাইনালে খেলেছে বাংলাদেশ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সর্বশেষ আসরে ২০১৫ বিশ্বকাপের দুই ফাইনালিস্ট নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করেই বাংলাদেশ পৌঁছে যায় শেষ চারে।

বল হাতে দলকে সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন মাশরাফি। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ওয়ানডেতে নিয়েছেন ২৫০ উইকেট। ছবি: এএফপি

গেল ১৭ বছরে বাংলাদেশের হয়ে ৩৬ টেস্ট, ১৯৯ ওয়ানডে ও ৫৪ টি-টোয়েন্টি খেলা মাশরাফি ব্যাট-বল হাতেও কম যাননি। অভিষেকের পর থেকে টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে এখন পর্যন্ত তার ঝুলিতে রয়েছে ৩৭২টি উইকেট।

অসাধারণ নেতৃত্ব গুণের পাশাপাশি অদম্য মানসিকতার অধিকারী মাশরাফির ব্যাটে দেখা গেছে ‘ক্যামিও’ কিছু ইনিংস। ক্রিকেটের সব সংস্করণ মিলিয়ে ব্যাট হাতে তার সংগ্রহ দুই হাজার ৮৯৬ রান। রয়েছে চারটি হাফ-সেঞ্চুরিও।

মাশরাফি হতে পারতেন বিশ্বের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার। ছবি: সংগৃহীত

লাল-সবুজের পতাকা মাথায় নিয়ে ইতিহাসের পর ইতিহাস গড়ে দিয়ে যাচ্ছেন এই মাশরাফি। টেস্ট, ওয়ানডের পাশাপাশি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটেও দ্যুতি ছড়িয়েছেন মাশরাফি। কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের ইতি টানার আগে ২৭ ম্যাচে সামনে থেকে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। তার হাত ধরে টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে বেশি ৯টি জয় পেয়েছে বাংলাদেশ।

সব মিলিয়ে ৫৪ টি-টোয়েন্টি খেলা মাশরাফি বোলিংয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকেই। ৫৪ ম্যাচে মাশরাফির নামের পাশে রয়েছে ৪৩ উইকেট। টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারির তালিকায় তার অবস্থান তৃতীয়। 

ওয়ানডেতে মাশরাফির শিকার ২৫১ উইকেট। এই ফরম্যাটে দেশের হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট তারই দখলে। ৩৬ টেস্টে ৭৮টি উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহকের তালিকায় মাশরাফি রয়েছেন চতুর্থ অবস্থানে।

সব কিছুর ঊর্ধ্বে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক হয়ে উঠেছেন মাশরাফি। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে ক্রিকেটে মাশরাফিই একমাত্র ক্রিকেটার, যিনি কিনা কয়েক প্রজন্মের সঙ্গেই খেলেছেন। সাবেক ক্রিকেটার আকরাম খান, খালেদ মাহমুদ সুজন, খালেদ মাসুদ পাইলট থেকে শুরু করে শরীফ-বৈশ্য-তালহা-মোহাম্মদ আশরাফুলদের সঙ্গে খেলেছেন তিনি। এরপর সাকিব-তামিম-মুশফিকদের সঙ্গেও খেলেছেন। এখনও সমান তালেই খেলে চলেছেন লিটন-মিরাজ-শান্তদের সঙ্গে।

১৭ বছরের সময়টা সত্যিকার অর্থেই মহাকাব্যিক। ছবি: সংগৃহীত

১৭ বছরের সময়টা সত্যিকার অর্থেই মহাকাব্যিক। সেখানে আছে উত্থান-পতন; আছে হাসি ও কান্না। আছে অর্জন, আছে হারানোর বেদনা; আছে ৩৭২ টি আন্তর্জাতিক উইকেট, লোয়ার মিডল অর্ডারের ‘ক্যামিও’ কিছু ইনিংস, অসাধারণ অধিনায়কত্ব, লড়াকু মনোবল আর অদম্য মানসিকতা। সবকিছুর ঊর্ধ্বে বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রতীক হয়ে উঠেছেন মাশরাফি।

প্রিয় খেলা/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট
ট্রেন্ডিং