২৩ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণায় জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। ছবি: প্রিয়.কম

তফসিলকে কীভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা

সংলাপ ও বৈঠকের পরও সরকারবিরোধী জোট জাতীয় যুক্তফ্রন্টের দাবি-দাওয়া মানেনি সরকার বা নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৪৩ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৫৭
প্রকাশিত: ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৪৩ আপডেট: ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:৫৭


২৩ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল ঘোষণায় জানান প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোর দাবি-দাওয়া মেনে নেয়নি ক্ষমতাসীনরা। দাবি-দাওয়া উপেক্ষা করায় ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেয় ক্ষমতাসীন ১২টি রাজনৈতিক দল, অন্য দলগুলো নির্বাচন বর্জন করে। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগেও সরকারের সঙ্গে সংলাপ ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠকের পরও সরকারবিরোধী জোট জাতীয় যুক্তফ্রন্টের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়া হয়নি। তাদের দাবি উপেক্ষা করেই ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণা করেছে ইসি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে না ক্ষমতাসীন জোট ও ইসি। বিরোধীরা নির্বাচনে আসলে আসুক, না আসলে না-আসুক ভেবে নিয়েই তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পরপর দুইবার নির্বাচনে না আসা ও মনোনয়ন প্রত্যাশীদের চাপের কারণে দাবি না মানলেও বিরোধী জোট নির্বাচনে আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

৮ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার জাতির উদ্দেশে ভাষণে তফসিল ঘোষণা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা নিবন্ধিত সব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে উপলক্ষ করে নির্বাচনি সংলাপে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান অনেক অংশীজন। কিন্তু সংলাপের ফলাফল আসেনি। কোনো দাবি মানা হয়নি বিরোধীদের। অন্যদিকে সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা থেকে বিরত থাকার দাবি জানায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, সেটিও রক্ষা করেনি ইসি।

এমন সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনকে আরও বিতর্কিত করল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ইসি তফসিল ঘোষণা করে রাজনৈতিক অঙ্গনে সাম্প্রতিক সংলাপকে কেন্দ্র করে সুবাতাসের জানালাটা খোলা হয়েছিল, সেটি বন্ধ করে দিলো। তাতে অবাক হওয়ার কিছু নাই। কমিশন ইতোমধ্যে যেভাবে বিতর্কিত হয়েছে, তার সাথে আরও একটু উপাদান যুক্ত হলো মাত্র।’

নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে আহ্বান করা ছাড়া ‘বিশেষ কিছু করেনি’ বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের অবস্থান দেখে মনে হয়েছে, তারা ঐক্যফ্রন্টের দাবি-দাওয়া মানবে না।’

সিইসি নূরুল হুদা তার ভাষণে আরও বলেছেন, নির্বাচনে সব প্রার্থীর জন্য অভিন্ন আচরণ ও সমান সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করা হবে। দেশে একাদশ জাতীয় নির্বাচন করার অনুকূল আবহ তৈরি হয়েছে।

সিইসির এমন মন্তব্যে আশ্বস্ত নন দিলীপ কুমার। তার ভাষ্য, ‘এর আগে সিটি নির্বাচনে দেখা গেছে, কমিশন নির্দেশনা দিচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলো মানছে না। খুলনা সিটি নির্বাচনের তদন্ত হলো, কেউ কেউ দায়ী হলেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিল না কমিশন। জাতীয় নির্বাচনেও মনে হয় না কমিশন কোনো উদ্যোগী ভূমিকা নিবে।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনে আসার কারণও ব্যাখ্যা করেছেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী। দিলীপ কুমার সরকারের মতে, ‘তারা সব দিক থেকে কোনঠাসা অবস্থায় আছে। এক্ষেত্রে তাদের পথ দুইটা, হয় নির্বাচন, নয় আন্দোলন। নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা যদি মনে করে, তাদের দাবি মানছে না, এর আগে সিটি নির্বাচনগুলোতেও ব্যাপক গ্রেফতার-হয়রানি, কর্মীরা মাঠে ভালোভাবে নামতেই পারেনি, সেদিক থেকে তারা মনে করতে পারে, নির্বাচনে যাব না। তবে এর প্রতিক্রিয়া হয়তো দুই-এক দিনের মধ্যেই পাওয়া যাবে।’

‘অন্যদিকে নির্বাচনে না গেলে নিবন্ধন বাতিলের ঝুঁকি, তা ছাড়া দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা উদগ্রীব হয়ে আছে, তাদেরকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না। এই বিষয়গুলো কাজ করছে।’

এরকম পরিস্থিতিতে দিলীপ কুমার মনে করেন, ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যদি বলে, তারা (ক্ষমতাসীন) মানুক বা না-মানুক, আমরা নির্বাচনে যাব, তখন আলাদা ব্যাপার। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের অবস্থান এ রকমই যে, (বিরোধী জোট) আসলে আসুক, না আসলে না-আসুক।’

ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে না আসলে ক্ষমতাসীনরা কীভাবে এগোতে পারে, তাও জানালেন সুজনের এই সমন্বয়কারী। তিনি বলেন, ‘আমরা জাতীয় পার্টিকে বলতে তো দেখেছি, ঐক্যফ্রন্ট যদি না আসে তাহলে তারা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেবে।’ এই দলই আবারও বিরোধী দলের ভূমিকায় চলে আসতে পারে বলে মনে করেন দিলীপ কুমার।

পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তার জন্য আরও অপেক্ষা করা দরকার বলে মন্তব্য করেন এক সময়ের নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতী’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন মোর্শেদ। তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আরও পর্যবেক্ষণ ছাড়া এই মুর্হূতে কিছু বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে দেখা দরকার, অন্য দলগুলো নির্বাচনে কীভাবে আসছে এবং নির্বাচন কমিশন কীভাবে নির্বাচনি পরিবেশ তৈরি করছে, যাতে সব রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।’

তাড়াহুড়া করে তফসিল ঘোষণার কারণ বোধগম্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান।
তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি সেটা জানি না (তফসিল ঘোষণায় তাড়াহুড়া)। তবে এটা বুঝতে পারি যে, তফসিলটা নভেম্বরের শেষে করতে পারত ইসি। যথেষ্ট সময় ছিল, এত তাড়াহুড়ার কোনো দরকার ছিল না। নভেম্বরের শেষের দিকে তফসিল করলে ২০ জানুয়ারির দিকে নির্বাচন হতো। তাহলে আরও কিছু সময় পাওয়া যেত। সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের সংলাপ হলে হয়তো রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেকটা ভালো হয়ে আসত। এটাই আমরা আশা করে আসছিলাম। কিন্তু সেটা হলো না।’

বিরোধী দলীয় জোট নির্বাচনে অংশ না নিলে একতরফাভাবেই নির্বাচন হবে বলে মনে করছেন হাফিজউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘বিরোধী দলীয় জোট যদি অংশ না নেয়, তাহলে তো একরতফা। আর তারা অংশ নিলে তো হচ্ছে না।’

এমনটাই মনে করেন দিলীপ কুমারও। তবে যদি ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেয় তবে একতরফা হওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। দিলীপ কুমার বলেন, ‘কিন্তু এ রকম সিদ্ধান্তই যদি ঐক্যফ্রন্ট নেয়, দাবি মানেনি, আমরা নির্বাচনে যাব না। তবে তো একতরফার দিকেই যাচ্ছে।’

ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কমিশনকে বুঝতে হবে যে, সকলের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করে নির্বাচনের ফলাফল যেন কেবল ভোটারের রায়ের ওপর নির্ভর করে। আর পরিবেশ তৈরির কেন্দ্রীয় দায়িত্ব তাদেরই হাতে। আর এর প্রতিবন্ধক যেই হোক না কেন, রাজনৈতিক দল, প্রার্থী, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব কমিশনের হাতে। বিতর্কিত বর্তমান কমিশনের এই গুরুদায়িত্ব পালন কতটুকু সৎসাহস ও দৃঢ়তা দেখাতে পারবে, এমন প্রশ্ন আর উৎকণ্ঠা থাকাটা স্বাভাবিক।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...