আবদুল হান্নানকে (মাঝে) ভুয়া চিকিৎসক প্রমাণ করা বেশ কঠিন ছিল বলে দাবি পুলিশের। ছবি: প্রিয়.কম

মেডিকেলে না পড়েই তিনি এফসিপিএস!

৫০০ টাকা করে ভিজিট নিয়ে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতি সপ্তাহে রোগী দেখতেন আবদুল হান্নান।

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৬ আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৬
প্রকাশিত: ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৮:৪৬ আপডেট: ১৫ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৬


আবদুল হান্নানকে (মাঝে) ভুয়া চিকিৎসক প্রমাণ করা বেশ কঠিন ছিল বলে দাবি পুলিশের। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) পড়েছেন মাধ্যমিক পর্যন্ত। এরপর একজন চিকিৎসকের সাহায্যকারী হিসেবে কিছুদিন কাজ করে নিজেই বনে গেছেন চিকিৎসক। নিজের নামের আগে যোগ করেন এমবিবিএস ও এফসিপিএসের মতো ডিগ্রি। লোকজনের কাছে বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নিজের নামে ছাপান ভিজিটিং কার্ড। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) লোগোযুক্ত প্যাডে প্রেসক্রিপশনও করতেন। লোকজনও তাকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেই চিনতেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কয়েকটি জেলায় প্রতি সপ্তাহে রোগীও দেখতেন। 

এভাবেই প্রায় চার বছর ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিলেন ভুয়া চিকিৎসক আবদুল হান্নান মিয়া ওরফে আবুল বাশার মিয়া (৪৮)।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এমন প্রতারণা করতে গিয়ে ৯ নভেম্বর তিনি হাতেনাতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এখন সেই ভুয়া চিকিৎসকের জায়গা হয়েছে ঢাকার কেরানীগঞ্জ অবস্থিত কেন্দ্রীয় কারাগারে।

পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর বেরিয়ে এসেছে আবদুল হান্নান কীভাবে একজন ভুয়া চিকিৎসক হয়ে উঠলেন আর কীভাবে প্রতারণার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

পুলিশের ভাষ্য, ওই ব্যক্তি লোকজনের চোখে ধুলা দিয়ে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় সাপ্তাহিকভাবে রোগীও দেখেছেন। কিন্তু তিনি যে একজন ভুয়া চিকিৎসক, সেটি এতদিন কেউ আঁচও করতে পারেননি।

পুলিশের দাবি, তাদের কাছে অভিযােগ আসে, এক ব্যক্তি নিজেকে বিএসএমএমইউর একজন কনসালট্যান্ট দাবি করছেন। তিনি নিজেকে কনসালট্যান্ট দাবি করে যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি ফার্মেসিতে বসে রোগী দেখে হাতিয়ে নিতেন বিপুল টাকা। 

ভুক্তভোগী কয়েকজন রোগীর অভিভাবকের অভিযােগের প্রেক্ষিতে বিষয়টির তদন্তে নামে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তদন্তের ভার দেওয়া হয় উপপরিদর্শক (এসআই) সাইফুল ইসলামকে। তদন্তের আগে সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নানাভাবে যাচাই করেন ও শেষে মাঠে নামেন।

এসআই সাইফুল ইসলাম প্রিয়.কমকে জানান, গত ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিনি যাত্রাবাড়ীর শনির আখড়ার গোবিন্দপুর বাজার এলাকার আল মক্কা মার্কেটের আল আমিন মেডিকেল হলে যান। সে সময় সেই ভুয়া চিকিৎসক বিভিন্ন রোগী দেখছিলেন। পরে রোগী দেখা শেষ হলে তার সঙ্গে তিনি (সাইফুল) কথা বলেন ও আবদুল হান্নান যে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, তার স্বপক্ষে প্রমাণ চান।

এ কথা শোনার পর হান্নান নানাভাবে তর্ক-বিতর্ক করতে শুরু করেন। একপর্যায় তিনি তার ডিগ্রির সার্টিফিকেট দেখাতে রাজি হন। পুলিশ সদস্যরা প্রমাণস্বরূপ তার ব্যবহৃত ডিগ্রির কাগজপত্র চাইলে তিনি বলে উঠলেন, তার স্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন ও তিনি উত্তরার বাসায় থাকেন। তার স্ত্রীর বাসায় সেই কাগজপত্র রাখা আছে। শুরু হয় তাকে নিয়ে তার সার্টিফিকেট উদ্ধারের কাজ। আবুল বাশারও নিজেকে আসল চিকিৎসক প্রমাণের লড়াইয়ে নামে পড়েন।

এসআইয়ের ভাষ্য, কথা অনুযায়ী হান্নানকে নিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে যাত্রা শুরু হয় উত্তরার দিকে। পথে তিনি আবারও জানালেন, তার নাকি মালিবাগে আরেকটি বাসা আছে। কিন্তু সেখানে তিনি ঢুকলেন না। উত্তরায় পৌঁছার পর তার বাসায় না নিয়ে অটোরিকশা ঘোরাতে বলেন। তার ডিগ্রির সার্টিফিকেট নাকি ধানমন্ডির বাসায় রাখা আছে। এবার গন্তব্য শুরু হয় ধানমন্ডির বাসার দিকে। অটোরিকশাও ঘুরিয়ে নেওয়া হয়।

যথারীতি অটোরিকশা ছুটে চলে ধানমন্ডির বাসার ঠিকানা স্টার কাবাব এলাকার দিকে। সেখানে পৌঁছাতেই তিনি জানান, তার সার্টিফিকেট নাকি সেখানেও রাখা হয়নি, মালিবাগের বাসায় রাখা হয়েছে। এবার পুলিশের সন্দেহ আরও বেড়ে যায়। পরে অটোরিকশায় বসেই নিজেকে ভুয়া চিকিৎসক বলে স্বীকার করেন হান্নান।

এরপর পুলিশের এসআই সাইফুলের উদ্দেশে হান্নান বলেন, ‘স্যার আমাকে ছেড়ে দেন। যত টাকা চান, আমি আপনাকে খুশি করব।’ পরে তাকে ধরে সোজা থানায় নিয়ে যান পুলিশের সেই এসআই।

রোগীকে দেখে তার হাতে নিজের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিতেন হান্নান।
রোগীকে দেখে তার হাতে নিজের ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিতেন ভুয়া চিকিৎসক হান্নান। ছবি: প্রিয়.কম

ভুয়া চিকিৎসক আবদুল হান্নানের ভাষ্য, তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুরের রূপনগর থানার রূপনগর আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর রােডের ৪১ নম্বর বাসায়। সে বাসাতে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকেন। আর তিনি এভাবেই বিভিন্ন জায়গায় প্রতারণা করে যে আয় করতেন, তাতে সংসার চালাতেন। তবে তিনি রূপনগরের বাসাতে স্থায়ীভাবে থাকেন না।

তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের কেদার গ্রামে। তার বাবা প্রয়াত আবদুল কাদের মিয়া।

আবদুল হান্নান নিজ মুখে তার দোষ স্বীকার করেছেন। তিনি জীবনে যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন আর এই কাজ তিনি করবেন না বলে জানিয়েছেন। কিন্তু আইন কী তার কথা শুনবে? তার নামে যথারীতি একটি প্রতারণার মামলা হয়েছে। তাকে আদালতে তুলে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

হান্নান স্বীকার করেছেন, তিনি প্রায় চার বছর ধরে এই প্রতারণার কাজটি করে আসছেন। রোগীদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে ভিজিট নিতেন। এ কাজে তাকে আরও দুই ব্যক্তি সহায়তা করতেন। তার মধ্যে একজন তাকে সহায়তা করতেন, আরেকজন যখন যেই এলাকায় তিনি চিকিৎসক সেজে যান, সেখানে তার আগে মাইকিং করে বিষয়টি সবাইকে জানানাের কাজ করতেন। পাশাপাশি তার প্রচারণার জন্য তিনি প্রত্যেক রোগীকে দেখার পর হাতে তার ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিতেন, যেখানে তার পরিচয় একজন এমবিবিএস ও এফসিপিএস চিকিৎসক।

এসআই সাইফুল ইসলাম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘বিষয়টি তদন্তের ভার পাওয়ার আগে এই নামে কোনো চিকিৎসক আছেন কি না, তা যাচাই করার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়েছি। এ জন্য আমাকে হাসপাতালটিতে স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি যারা সেখানে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন, তাদের সবার নাম বের করতে হয়েছে; যেখানে যাচাই করে দেখা গেছে, এই নামে কোনো চিকিৎসক নেই।’

‘বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা তার ডিসপেনসারিতে অভিযান চালিয়েছি। বিষয়টি খুব জটিল ছিল। তিনি যে একজন ভুয়া চিকিৎসক, এটা প্রমাণ করা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু লেগে থাকার কারণে সেটি সম্ভব হয়েছে এবং তিনিও সেটি অকপটে স্বীকার করেছেন। তার সঙ্গে আরও দুজন জড়িত আছেন। তাদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।’

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ মিয়া জানান, থানা পুলিশের কাছে এমন একটি অভিযােগ ছিল। পরে সেটির সত্যতার পাওয়ার পর তাকে আটক করা হয়। তার নামে একটি প্রতারণার মামলা হয়েছে এবং তিনি এখন কারাগারে আছেন।

প্রিয় সংবাদ/শিরিন/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...