সোনারগাঁও হোটেলের লবিতে মুর্তজা অতাশ জমজম। ছবি: মিঠু হালদার। প্রিয়.কম

যুদ্ধ এক ধরনের ব্যবসা হয়ে গেছে, বললেন ইরানি নির্মাতা

ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি নির্মাণ করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ও তথ্যচিত্র।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১০:২৯
আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১০:২৯


সোনারগাঁও হোটেলের লবিতে মুর্তজা অতাশ জমজম। ছবি: মিঠু হালদার। প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) ইরানের চলচ্চিত্র নির্মাতা মুর্তজা অতাশ জমজম। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি নির্মাণ করেছেন বেশ কিছু চলচ্চিত্র, স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি ও তথ্যচিত্র। বর্তমানে ব্যস্ত আছেন ইরান-বাংলাদেশ যৌথ প্রযোজনায় নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘দিন-দ্য ডে’র কাজ নিয়ে।

গত সপ্তাহে তিনি ঢাকায় এসেছেন লোকেশনের খোঁজে। এরপর ১৬ নভেম্বর, শুক্রবার ছেড়েছেন ঢাকা। এর আগে শুক্রবার সকালে রাজধানীর পাঁচ তারকা হোটেল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে প্রিয়.কমের মুখোমুখি হন মুর্তজা।

প্রায় এক ঘণ্টার আলাপে মুর্তজা তার নির্মাণের প্রতি ভালোলাগা, ক্যারিয়ার, চলচ্চিত্র নির্মাণ, বর্তমান ব্যস্ততা ছাড়াও কিছু প্রসঙ্গে কথা বলেন।

আলাপের সময় প্রতিবেদককে ভাষাগত জটিলতা এড়ানোর জন্য সহযোগিতা করেন মুর্তজা অতাশ জমজমের ‘দিন-দ্য ডে’ ছবির বাংলাদেশ অংশের উপদেষ্টা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুমিত আল রশিদ।

মুর্তজা অতাশ জমজম ইরানের তৃতীয় বৃহত্তম নগরী ইস্পাহান শহরে জন্মগ্রহণ করেছেন। এরপর সেখানকার ইস্পাহান বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। গত ১৫ বছর ধরে তার বাস রাজধানী তেহরানে।

হেমন্তের সকাল, আলসে কুয়াশার চাদর সরিয়ে যখন আলো ছড়াতে শুরু করেছে, তার কিছুটা পরই মুর্তজার সঙ্গে আলাপের শুরু। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে শর্ট ফিল্ম নির্মাণ করতেন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটা ফিচার ফিল্ম নির্মাণ করেন।

‘সিনেমা হচ্ছে আসলে প্রেম। বিষয়টা তো আসলে ও রকম না, আমি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলাম আর সিনেমা বানিয়ে ফেললাম। যখন বুঝতে শিখেছি, তখন থেকেই এর প্রতি এক ধরনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ধীরে ধীরে এটার একটা বাহ্যিক অবয়ব তৈরি হয়েছে’, বলেন মুর্তজা।

ইরানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা বেজায় ছাড়াও নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি, দারিউস মেহেরজুইয়ের কাছ থেকে মুর্তজা অতাশ জমজম চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুপ্রেরণা পেয়েছেন।

এ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘যখন আমি কলেজে পড়ি, তখন একটা শর্টফিল্ম নির্মাণ করি। সেটাই প্রথম। সেটি ইস্পাহান টেলিভিশনে প্রচার হয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে আরও বেশি আকৃষ্ট হই।’

মুর্তজা জানান, তিনি শর্টফিল্ম নির্মাণ করেছেন ১২০টার মতো। ধারাবাহিক নাটক ৪টি, আর চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন ৪টি। এ ছাড়া ১২টি দেশের জন্য তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন। সে তালিকায় রয়েছে জার্মান, ফ্রান্স, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার মতো দেশে।

চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে কীভাবে জীবন বদলে গেছে, আলাপে সে কথা জানিয়েছেন মুর্তজা। তিনি বলেন, ‘আমার নির্মিত ফিচার ফিল্ম ‘‘যে নদীটিকে হত্যা করা হয়েছে’’ ইরানের সর্বোচ্চ পুরস্কার পেয়েছে। এটা আমার ক্যারিয়ারে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।’

বাংলাদেশে প্রথম আসা

গত বছরের আগস্টে রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন অভিযান শুরুর পর সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসে বহু রোহিঙ্গা। সে বছরের নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই সে চিত্র দেখার জন্য বাংলাদেশে আসেন মুর্তজা।

তিনি বলেন, ‘যখন দেখলাম রোহিঙ্গাদের নির্মম অত্যাচার করে মিয়ানমার থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছে, তখনই আমার মনে হলো আমার কিছু করা উচিত। আর আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি মুসলিম দেশগুলোর এ বিষয়ে নির্লিপ্ত আচরণ দেখে। তারা কোনো প্রতিবাদ করেনি।’

‘আসার পর কক্সবাজারে যাই। এরপরই রোহিঙ্গাদের নিয়ে আমি একটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করি ‘‘বিমর্ষ বুদ্ধ’’ নামে। সেখানে গিয়ে দেখি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ সাহায্য করছে। এটা আমার কাছে অসম্ভব ভালো লেগেছে। এরপর পাঁচ-ছয় মাস পর আবার বাংলাদেশে এসেছি, তাদের কী অবস্থা দেখার জন্য। বাংলাদেশ সরকার যেভাবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে সেজন্য তাদের ধন্যবাদ। ’

তথ্যচিত্রটি নির্মাণ করার সময় মুর্তজা দেখেছেন, হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মের লোকজন যে যার মতো করে রোহিঙ্গাদের সহযোগিতা করছে। তিনি বলেন, ‘আমাকে যে বিষয়টা পীড়া দেয়, সেটা হলো মুসলিম নামধারী রাষ্ট্রগুলো বলে তারা মুসলমান, কিন্তু তারা এ দিকটাতে খেয়াল করেনি! আমি চাই রাজনীতিকরাও সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এই দিকটা শিখুক।’

‘যখন অং সান সু চি (মিয়ানমারের কার্যত নেতা) গৃহবন্দী ছিল, তখন তার মুক্তির জন্য আমি ও আমার বন্ধুরা বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে মুক্তির জন্য স্লোগান দিয়েছি। কিন্তু সে সুচি এখন জালিমের রূপ ধারণ করেছে’, বলেন মুর্তজা।

‘পুরো পৃথিবীতে শিল্পীদের ভাষা একটাই। কিন্তু আফসোস যদি এই রাজনীতিকরা শিল্পী সত্তার অধিকারী হতো অথবা পুরো পৃথিবীতে যত রাজনীতিক আছেন, তারা যদি শিল্পী হতেন। কারণ একজন শিল্পী কখনই কোনো যুদ্ধ পছন্দ করেন না। তিনি প্রেম, ভালোবাসা পছন্দ করেন, সৌন্দর্য ভালোবাসেন’, যোগ করেন মুর্তজা।

‘দিন-দ্য ডে’র সঙ্গে যুক্ত হওয়া

চলতি বছরের শুরুর দিককার ঘটনা। ঢাকার ইরানিয়ান কালচারাল সেন্টার থেকে ‘দিন-দ্য ডে’ ছবিটি নির্মাণের বিষয়ে প্রাথমিক আলাপের জন্য যোগাযোগ করা হয় মুর্তজা অতাশ জমজমের সঙ্গে। তাকে জানানো হয় অনন্ত জলিল নামে বাংলাদেশের একজন ইসলামকে কেন্দ্র করে একটি চলচ্চিত্র বানাতে চান। আর অনন্তর সঙ্গে কালচারাল সেন্টারের যোগসূত্র হলো তার একটি ফেসবুক পোস্ট।

মুর্তজা জানান, অনন্ত জলিল একটি সিনেমার সিনোপসিস পাঠান তার কাছে। এরপর তারা বিষয়টা নিয়ে সামনে আগান।  প্রথম আলাপকালে এ নির্মাতা অনন্তকে বলেছিলেন, ‘চল আমরা একটা কমার্শিয়াল ছবি করি, অথবা আর্ট ফিল্ম করি।’

সে সময় অনন্ত বলেন, ‘না, আমি বাংলাদেশের মানুষকে কথা দিয়েছি, ইসলাম নিয়ে একটা ফিল্ম বানাব। আমি এর বাইরে যাব না।’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের ওপর যে নির্যাতন হচ্ছে, তা তুলে ধরা হবে ছবিতে। এর শুটিং হবে ইরান, বাংলাদেশ, লেবানন ও সিরিয়াতে।

ছবিটিতে অনন্ত জলিলের বিপরীতে থাকবেন স্ত্রী ও নায়িকা বর্ষা। মুর্তজা বলেন, ‘ইরান থেকে দুজন বিখ্যাত অভিনেতা এ ছবিতে অভিনয় করবেন। এখন তাদের নাম বলতে চাই না। সেটা সারপ্রাইজ হিসেবেই থাকুক। কারণ বাংলাদেশের দর্শকরা তাকে চেনেন।’

শুরুতেই ঢাকায় শুটিং করার পরিকল্পনা রয়েছে জানিয়ে মুর্তজা বলেন, ‘আমি অনন্ত জলিলকে অনুরোধ করেছি, আমরা ছবিটা ইরানি স্টাইলে নির্মাণ করব। তিনি এটা মেনে নিয়েছেন। আমরা বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করছি। শেষ হলেই শুটিং শুরু করব।’

‘আমি চাচ্ছি চারটি দেশ মিলে ভিন্ন একটা আবহ তৈরি হোক। কাজটা করা বেশ কঠিন হবে। কিন্তু আমি এ চলচ্চিত্রটি নিয়ে বেশ আশাবাদী।’

মুসলিম দেশগুলোর প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা দেশগুলোর বিরূপ ধারণা আছে। এমন বাস্তবতায় নির্যাতন বা এ ধরনের বিষয় চলচ্চিত্রে উপস্থাপন করাটা চ্যালেঞ্জিং কি না জানতে চাইলে এ নির্মাতা বলেন,‘শিল্পীদের সঙ্গে বাকি দুনিয়ার কারো কোনো সম্যসা নাই, সবাই বন্ধু।’

‘রাজনীতিকরাই পৃথিবীটাকে কলুষিত করেছে। এটা ব্যবসার কারণে। এটা নোংরা বিষয়। কারণ যুদ্ধ একটা ব্যবসা হয়ে গিয়েছে। সেখানে অস্ত্র বিক্রির বড় একটা মাধ্যম তৈরি হচ্ছে। এটা তো ভয়াবহ একটা দিক।’

বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রীয় বন্ধুত্ব তো অনেক দিনের। তারপরও দুই দেশের প্রযোজনায় কোনো চলচ্চিত্র ইতোপূর্বে নির্মিত হয়নি। ‘দিন-দ্য ডে’র মধ্য দিয়ে একটা সূচনা হতে যাচ্ছে। এটাকে কীভাবে দেখছেন জানতে চাইলে মুর্তজা বলেন, ‘ইরানি একটা প্রবাদ আছে, ‘‘মাছ যখনই তুমি শিকার করো, তখনই কিন্তু মাছটা তাজা।’’ অবশ্যই দেরি হয়ে গিয়েছে। তবে ভালো একটা কাজ হচ্ছে।’

প্রিয় বিনোদন/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
দীর্ঘদিনের প্রেমিকার সঙ্গে সিয়ামের বিয়ে
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
গল্পের প্রসঙ্গ অফিসে যৌন হয়রানি
নিজস্ব প্রতিবেদক ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
উর্মিলা-শ্যামলের ‘একদিন ভালো থাকি’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
মাহাদীর কণ্ঠে ‘বিজয়ের গল্প’
তাশফিন ত্রপা ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮
স্পন্সরড কনটেন্ট
নাগরিকে বিশেষ ৬ নাটক ও ৩ সিনেমা
নাগরিকে বিশেষ ৬ নাটক ও ৩ সিনেমা
বাংলা ট্রিবিউন - ২ দিন, ৭ ঘণ্টা আগে
মুক্তির নির্মাণ
মুক্তির নির্মাণ
https://www.prothomalo.com/ - ২ দিন, ২০ ঘণ্টা আগে
শাহবাজ মসজিদের অপরূপ নির্মাণশৈলী
শাহবাজ মসজিদের অপরূপ নির্মাণশৈলী
নয়া দিগন্ত - ৩ দিন, ৭ ঘণ্টা আগে
২০৩২ সালের সিনেমা, প্রস্তুতি এখনই!
২০৩২ সালের সিনেমা, প্রস্তুতি এখনই!
বাংলা ট্রিবিউন - ৩ দিন, ১৩ ঘণ্টা আগে
বন্ধ মনোয়ার সিনেমা হল চালু হবে ভোটের পর
বন্ধ মনোয়ার সিনেমা হল চালু হবে ভোটের পর
https://samakal.com/ - ৪ দিন, ৯ ঘণ্টা আগে