আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন ক্যামেরা খোলেন মুখ দিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

হাত-পাবিহীন একজন ‍আলোকচিত্রীর স্বপ্ন ছোঁয়ার গল্প

১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার এক মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন।

আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৮ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৮
প্রকাশিত: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৮ আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৮


আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন ক্যামেরা খোলেন মুখ দিয়ে। ছবি: সংগৃহীত

(ইউএনবি) দুই হাতের কনুই পর্যন্ত নেই; দুই পাও নেই। এরপরও হতাশ নন তিনি। তার স্বাভাবিক জীবনযাপন, উচ্ছ্বাস-উদ্দীপনা বলে দেয় সমাজের আর ১০ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো তিনিও একজন। যার কথা বলছি, তিনি ইন্দোনেশিয়ায় জন্ম নেওয়া শারীরিক প্রতিবন্ধী আহমদ জুলকারনাইন। তার ক্যামেরায় প্রতিনিয়ত ধরা পড়ে আকর্ষণীয় সব ছবি।

জুলকারনাইন ক্যামেরা খোলেন মুখ দিয়ে। আর ছবি তোলেন কনুইয়ের কাছে জমাট বাঁধা চামড়া দিয়ে। সেসব ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বিশ্বে। তার জীবনের সংগ্রাম ও সফলতা নিয়ে লিখেছেন রিফাত কান্তি সেন।

জীবনযুদ্ধ

আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন ১৯৯২ সালের ৭ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ার এক মুসলিম পরিবারে জন্মেছিলেন। অন্য অনেক শিশুর মতো স্বাভাবিক জন্ম হয়নি তার। জন্মলগ্ন থেকেই তিনি পঙ্গু। তাই ছোট থেকেই তাকে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠতে হয়েছে। দেখতে দেখতে পার করেছেন জীবনের ২৫টি বছর। 

আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন।
কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেননি আত্মবিশ্বাসের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হতে পারেন বিকলাঙ্গ জুলকারনাইন। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবন্ধকতা জয়

সহস্র প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জীবনযুদ্ধে সফল হয়েছেন জুলকারনাইন। ছোটবেলা থেকেই তাকে নিয়ে ছিল পরিবারের নানা চিন্তা। কী করবেন তিনি? তার তো হাত-পা নেই, তবে কী তার ভবিষৎ অন্ধকার? এমন নানা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে বিষণ্ন হয়ে পড়ত মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজন। কেউ কেউ তাকে ‘প্রতিবন্ধী’ বলে মশকরা করত। এতে তিনি ভীষণ কষ্টও পেতেন। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে যে ইচ্ছাশক্তি, প্রবল মনোবল আর আত্মবিশ্বাসের এক জ্বলন্ত উদাহরণ হতে চলেছেন জুলকারনাইন, সেটা বোধ হয় তার মা-বাবা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি। অথচ সবকিছুকে উপেক্ষা করে, জীবনের প্রতিটি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে তিনি পৌঁছেছেন এক অনন্য উচ্চতায়।

বিকলাঙ্গ হয়েও চমৎকার সব ছবি তুলে তিনি বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ছবি তোলার ওপর খেতাবও পেয়েছেন ২৫ বছরের দুরন্ত এই তরুণ।

আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন।
প্রকৃতির বহু রূপ ধরা পড়েছে জুলকারনাইনের ক্যামেরায়। ছবি: সংগৃহীত

যেভাবে হলেন আলোকচিত্রী

একসময় স্থানীয় একটি ইন্টারনেট ক্যাফেতে কাজ করতেন জুলকারনাইন। সেখানে ছিল একটি ফটোগ্রাফি সার্ভিসও। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ ক্যাফেটিতে ছবি তুলতে আসতেন। আর তা দেখেই ছবি তোলার প্রেমে পড়েন তিনি। পরিবার ততটা স্বচ্ছল ছিল না তার। আর তাই ক্যামেরা কেনার টাকাও ছিল না।

একটা সময় ধার করা টাকা দিয়ে একটি ক্যামেরা কিনেন জুলকারনাইন, নেমে পড়েন ছবি তোলার কাজে। প্রথম প্রথম নিজের এলাকার ভোটার আইডি কার্ডের ছবি তুলতেন তিনি। একসময় পেশাদার আলোকচিত্রী হয়ে ওঠেন।

শুধু সমতলেই ছবি তোলেন না তিনি, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০০ মিটার উঁচু থেকেও দৃশ্য ধারণ করেছেন। একবার একটি জলপ্রপাতের ছবি তুলতে গিয়ে পাহাড় থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার একটা বাজে অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার। ভাগ্যিস চোট পেলেও তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন।

জুলকারনাইন এখন কোম্পানির মালিক

শুধু শখের বসে যে ছবি তোলা শুরু করেছিলেন, সেটাই এখন পেশা হিসেবে দাঁড়িয়েছে, গড়ে তুলেছেন নিজের কোম্পানি। নাম দিয়েছেন ‘ব্যাঙ ডেজোয়েল’। বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমেও তার তোলা ছবি ছাপা হচ্ছে। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জুলকারনাইন বলেন, ‘যদি সেরা হতে চাও, তাহলে তোমার সীমাবদ্ধতাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দাও। তুমি যা করো, সেখানে সেরা হতে তোমাকে নিখুঁত হতে হবে না।’

আলোকচিত্রী আহমদ জুলকারনাইন।
জুলকারনাইন মনে করেন, তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী হলেও পরাজিত নন। ছবি: সংগৃহীত

তার ছবি এখন ভাইরাল

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জুলকারনাইনের ছবি এখন ভাইরাল। হাত-পা না থেকেও এত ভালো ছবি তুলতে পারেন বলেই রাতারাতি তার দৃষ্টিনন্দন আলোকচিত্রগুলো ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। তাকে এখন পুরো বিশ্বের মানুষই এক নামে চিনে।

ফেসবুক, টুইটার থেকে শুরু করে সব সামাজিক মাধ্যমেই তাকে নিয়ে চলে আলোচনা। যে ছেলেটির জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিল তার পরিবার, সে ছেলেটিই এখন অনেক বিজ্ঞ লোকের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জুলকারনাইনের কথায় আছে অনুপ্রেরণা

যারা আলোকচিত্র শিখতে চান, তাদের সাহায্য করতে চান জুলকারনাইন। তিনি বলেন, ‘যারা স্বাভাবিক, শুধু তাদের কাছ থেকেই নয়, যারা ভিন্নভাবে সক্ষম, তাদের কাছ থেকেও অনুপ্রেরণা নেওয়ার মতো অনেক কিছু রয়েছে। আমি আমার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গর্বিত। আমি ডিজেবলড (শারীরিক প্রতিবন্ধী)। কিন্তু পরাজিত নই।’

প্রিয় সংবাদ/আজহার

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...