জাতীয় পার্টিকে ৪৫টি আসনের বেশি দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। ফাইল ছবি

বিপাকে মহাজােটের এরশাদের জাতীয় পার্টি

ঢাকা-১, ১৩, ১৭, পটুয়াখালী-১ ও খুলনা -১ আসনগুলো ছাড়ের ব্যাপারে দুই পক্ষই অনড়।

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৮ আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪২
প্রকাশিত: ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৮ আপডেট: ২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:৪২


জাতীয় পার্টিকে ৪৫টি আসনের বেশি দিতে নারাজ আওয়ামী লীগ। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) মহা বিপাকে পড়েছে মহাজোটের শরীক দল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেজাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটি থেকে গত শুক্রবার ৬০ আসন চেয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কাছে একটি তালিকা পাঠানো হলেও আওয়ামী লীগ ৪৫টির বেশি আসন দেবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

২৫ নভেম্বর, রবিবার রাত ১০টার দিকে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। তবে ঢাকা-১, ১৩, ১৭, পটুয়াখালী-১ ও খুলনা -১ আসনগুলোর ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। এই পাঁচটি আসনে ছাড় দিতে জাপা ও আওয়ামী লীগ দুই পক্ষই অনড়। ফলে পাঁচটি আসন নিয়ে বিপাকে পড়েছে জাপা। এ আসনগুলোতে কারা প্রার্থী হবেন, আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকবে নাকি জাপার প্রার্থী বহাল থাকবে তার ব্যাপারে ২৬ নভেম্বর, সোমবার সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। জাপার বিভিন্ন নীতি নির্ধারণী সভায় উপস্থিত থাকা একাধিক নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাপার চূড়ান্ত তালিকা করা পাঁচটি আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ঘোষণা করায় এখন মহা বিপাকে জাপার চেয়ারম্যান এরশাদ ও দলটির মহাসচিব এবং দলের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। তারা রবিবার সারাদিন বনানী অফিস আর আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস এবং গণভবন দৌড়ঝাঁপ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফয়সালা হয়নি। সারাদিন বনানী পার্টি অফিসে মহাসচিব ও দলটির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ অন্যান্যরা ছিলেন।

জাপার উপদেষ্টা কমিটির এক নেতা জানান, জাপার পক্ষ থেকে আসনের বিষয়টি জানার জন্য রবিবার সন্ধ্যার পর ধানমন্ডির আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে গিয়েছিলেন দলের মহাসচিব এ.বি.এম রুহুল আমিন হাওলাদার। তিনি সেখানে গিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং জাপার তালিকা করা ৬০টি আসনের মধ্যে কয়টিতে জাপার প্রার্থী থাকবে সেটি চূড়ান্ত করেছেন। তাতে আওয়ামী লীগ জাপাকে ৪৫ আসনের বেশি দিতে নারাজ। এই ৪৫টি আসনে কোনো প্রার্থী ঘোষণা করবে না আওয়ামী লীগ। শুধু জাপার প্রার্থীরাই লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন। বাকি আসনগুলােতে জাপার প্রার্থী থাকবে। তবে যেসব আসনে আওয়ামী লীগের জন্য বিজয় নিশ্চিত করা কঠিন হবে সেগুলােতে ভোটের আগের দিন ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি সিদ্ধান্ত হবে। আর সেই সংখ্যা নেহাত দেড়শ’র বেশি হবে না।

জাপার এই নেতা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আগামীকাল (সোমবার) দুপুরের মধ্যে ঢাকার তিনটি এবং ঢাকার বাহিরে দুটি আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের সাথে সমঝোতা হবে। সেই সমঝােতায় জাপার বিজয় হবে বলে আমরা আশাবাদী।’

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা থাকলেও ওই আসনে চিত্রনায়ক ফারুককে প্রার্থী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। ফাইল ছবি

ঢাকা-১৭ আসন থেকে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানানো হয়েছিল। তারপরও একই আসনে এরশাদকে প্রার্থী হিসেবে জাপা তালিকা প্রস্তুত করলেও সেখানে আওয়ামী লীগ চিত্রনায়ক আকবর হোসেন পাঠান ফারুককে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ফারুকের হাতে মনোনয়নের চিঠি তুলে দেওয়া হয়।

গত সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ফারুক গাজীপুর-৫ আসন থেকে মনোনয়নের দৌড়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেহের আফরোজ চুমকির সঙ্গে হেরে গিয়েছিলেন। ফলে ঢাকা-১৭ (গুলশান-বনানী-ক্যান্টমেন্ট একাংশ) আসন নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পার্টির আসন বন্টন সমঝোতা ভেস্তে যেতে বসেছে বলে জাপার একটি সূত্র জানায়।

জাপার আরেকটি সূত্র জানায়, ২৩ নভেম্বর দিনভর জাপার পক্ষ থেকে ঢাকা-১৭ আসন নিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে ব্যাপক দেন-দরবার হয়েছে। কিন্তু ওই আসনে ছাড় দিতে চায় না আওয়ামী লীগ ও জাপা। দুপক্ষই আসনটি ধরে রাখতে চায়। এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত জাপা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে কোনো গ্রিন সিগন্যাল (সবুজ সংকেত) পায়নি। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংকেত না পাওয়ায় হাসপাতালে অবস্থান করা দলটির চেয়ারম্যান এরশাদ বেশ ক্ষুব্ধ। তিনি শুক্রবার দলের নেতা-কর্মীদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছিলেন, ‘ঢাকা-১৭ আসন নিয়ে ফয়সালা না হলে জাতীয় পার্টি তিনশ’ আসনেই নির্বাচন করবে।’

কেন ঢাকা-১৭ আসনটি এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল তার কারণ হিসেবে জাপা নেতারা বলছেন, জাতীয় পার্টি ঢাকা-১৭ আসনটিকে প্রেস্ট্রিজ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে। কোনোভাবেই দল এ আসনটি ছেড়ে দিতে চায় না। আবার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চায় ধরে রাখতে। কারণ খুব সহজ, রাজধানীর ভিআইপি আসন। ফলে সেটি শতভাগ দুই পক্ষই কব্জায় রাখতে চায়। আওয়ামী লীগ কূটনৈতিক জোনের এ আসনটিতে নায়ক ফারুককে মনোনয়ন দিতে পারেন। এই আশ্বাসে আসনটিতে চিত্র নায়ক ফারুকও প্রচারনায় ব্যস্ত ছিলেন। গতকাল মনোনয়ন পেলেনও ফারুক।

জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রিয়.কমকে বলেন, ‘স্যার (এরশাদ) ঢাকা-১৭ আসনে নির্বাচন করবেন বলে আমরা জানি। বিষয়টি আওয়ামী লীগও জানে। কিন্তু সেখানে চিত্রনায়ক ফারুককে প্রার্থী ঘোষণা করা হলো এ বিষয়টি কেন জানি রহস্যময় মনে হচ্ছে। প্রথম দিকে জাপা ১০০ আসনে টার্গেট নিয়েছিল। কিন্তু পরে আওয়ামী লীগ ৪৫-এর বেশি রাজি না হওয়ায় আবার তা কমিয়ে ৬০ করা হয়। তবে স্যারের আসনে কেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলো সেটা মহাসচিবই ভালো বলতে পারবেন।’

এবারের আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের চূড়ান্ত মনোনয়ন তালিকা প্রকাশের ফলে আওয়ামী লীগের প্রধান শরিক জাপার সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্কের টানাপোড়েন মীমাংসা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ, ঢাকা-১৭, চট্টগ্রাম-৯সহ জাপা যে আসনগুলোতে বেশি প্রত্যাশী ছিল সেখানেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এই আসনগুলোর বিরোধ মীমাংসা যদি শেষ পর্যন্ত না হয়, তাহলে জাপা জোটগতভাবে নির্বাচন করবে কিনা, তা নিয়ে অনেকের সংশয় আছে বলে মনে করেন জাপার এই নেতা।

জাপার প্রভাবশালী এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে যে চাহিদা দেওয়া হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ রাজি না হলে জাপা তিনশ’ আসনেই নির্বাচন করার প্রস্তুতি রেখেছে। সে অনুযায়ী দলের সকল প্রার্থীকে বিষয়টি জানিয়েও দিয়েছেন দলের চেয়ারম্যান এরশাদ। আর তিনি (এরশাদ) নিজে ঢাকা-১৭ আসন থেকে নির্বাচন করবেন, এ বিষয়টি চূড়ান্ত। এই আসনটি জাপা কোনোভাবেই ছাড় দেবে না।’

এ ছাড়াও দলটির চেয়ারম্যানের জামাই বলে পরিচিত জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুর চট্টগ্রাম-৯ আসনের বিপরীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নওফেলকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তবে সর্বশেষ খবর হলো- জাপার সাবেক মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে কক্সবাজার-১ আসনে নির্বাচন করার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে জাপার মহাসচিবের পদ হারান বাবলু। পরে তাকে জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিশেষ সহকারী করা হয়।

জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ.বি.এম রুহুল আমিন হাওলাদার।
জাতীয় পার্টির মহাসচিব এ.বি.এম রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই আসনটি দখলে নিতে মরিয়া আওয়ামী লীগ। ফাইল ছবি

পটুয়াখালী-১ আসন নিয়ে মহা চিন্তায় পড়েছেন জাপা। সেখানে এর আগে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জাপা মহাসচিব এ.বি.এম রুহুল আমিন হাওলাদার। তবে এবার সেই আসনটি নিজের দখলে রাখতে মরিয়া হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ। এ কারণে আসনটিতে দলীয় প্রার্থী শাহজাহান মজুমদারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। রবিবার তাকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে মনোনয়ন তুলে দেওয়া হয়।

আরও তিনটি আসন নিয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি জাপা ও আওয়ামী লীগের নীতি নির্ধারকরা। আর এই আসন তিনটি হচ্ছে ঢাকা-১, ঢাকা-১৩ এবং খুলনা-১ আসন। এই তিন আসনে জাপার প্রার্থীরা হলেন- অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম, সফিকুল ইসলাম সেন্টু ও জাপা চেয়ারম্যানের সাবেক প্রেস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সেক্রেটারি শুনীল শুভ রায়।

ঢাকা-১ আসন থেকে গতবার সংসদ সদস্য ছিলেন জাপার অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম। সেই আসনটিতে এবার মনোনয়ন চেয়ে বসেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। যদিও ইতোমধ্যে তিনি সেই আসনে মনোনয়ন তুলেছেন এবং তাকে প্রার্থী হিসেবে আওয়ামী লীগ ঘোষণাও দিয়েছে। আসনটিতে জাপার প্রার্থী সালমা ইসলাম থাকবেন নাকি সালমান এফ রহমান থাকবেন তার ব্যাপারটি এখনো ঝুলন্ত অবস্থায় আছে।

জাপার এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বলেন, ‘আসনটিতে সালমা ম্যাডামই লড়বেন। আমরা কোনোভাবেই আসনটি হাতছাড়া করতে চাই না। এ কারণে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালমান এফ রহমানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নাকি তাকে আশ্বাস দিয়েছেন কাজ করার জন্য।’

ঢাকা-১৩ আসনে জাপার পক্ষ থেকে সফিকুল ইসলাম সেন্টুকে প্রার্থী হিসেবে নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেখানেও তাদের নিজের প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এই আসনে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খানকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। ফলে আসনটিতে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক আর প্রার্থী হতে পারছেন না। সেই সাথে সেখানে জাপা থেকে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার দরজাও বন্ধ হয়ে গেল। যদিও শুক্রবার জাপার পক্ষ থেকে করা তালিকায় ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর) আসনে জাপার পক্ষ থেকে সফিকুল ইসলাম সেন্টুর নাম দেওয়া হয়েছিল। তবে আসনটির ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে। আজ এই ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জাপার একটি সূত্র জানায়।

ঢাকার বাইরে খুলনা-১ আসনে জাপার সাংসদ ছিলেন এরশাদের সাবেক প্রেসউইং শুনীল শুভ রায়। এবারও তিনি আসনটিতেও প্রার্থী হিসেবে লড়তে চান। তবে সেটিতে ইতোমধ্যে প্রাথী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ আসনটিতে শুনীল শুভ রায়ের মামাশ্বশুর পঞ্চানন বিশ্বাসকে মনোনয়ন দিয়েছে। ফলে এই আসনটি নিয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেনি জাপা।

এই ব্যাপারে জাপার মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের সাথে প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া দলটির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তার ফোনটি রিসিভ হয়নি।

প্রিয় সংবাদ/শিরিন/রুহুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...