শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রবণতা দূর করতে সবারই সচেতন হওয়া উচিত। প্রতীকী ছবিটি সংগৃহীত

আত্মহত্যা এবং কিছু অপ্রিয় সত্য

আসলেই কি সব সেই শিক্ষিকার দোষ? নাকি আমরাও সমানভাবে দায়ী?

ফুয়াদ খন্দকার
লেখক
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:৪৩
আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:৪৭


শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রবণতা দূর করতে সবারই সচেতন হওয়া উচিত। প্রতীকী ছবিটি সংগৃহীত

সম্প্রতি ভিকারুননিসা স্কুলের একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এটা বর্তমানে দেশের সবচেয়ে ভাইরাল বিষয়ের একটা। বিষয়টা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন রকম মত প্রকাশ করছে সবাই। ঘটনা হচ্ছে, স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীকে পরীক্ষায় নকল করার অভিযোগে স্কুলের শিক্ষক তার বাবাকে ডেকে তার সামনেই অপমান করেন। এটা সহ্য করতে পারেনি ছোট্ট অরিত্রী। যার জন্যে সেদিনই বাসায় ফিরে আত্মাহুতি দেয় সে। 

এবার আসি মূল কথায়। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছে সারা দেশের মানুষ। বিভিন্ন জায়গাতে প্রতিবাদ মিছিলও হয়েছে। সবাই ঘটনার নিন্দা জানাচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে। এ ঘটনার জন্য সবাই দায়ী করছেন সেই শিক্ষককেই। এ নিয়ে অনেক মিডিয়া ব্যক্তিত্বরাও নিজেদের মতামত তুলে ধরছেন। 

বিষয়টি আসলেই খুবই বেদনাদায়ক যে অকালে একজন শিশুর জীবন ঝরে গেল।  কিন্তু এ ঘটনার জন্য একজন শিক্ষিকাকে যেভাবে দোষ ও অপদস্ত করা হচ্ছে, তা সত্যিই আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। আসলেই কি সব সেই শিক্ষিকার দোষ? নাকি আমরাও সমানভাবে দায়ী? 

কি অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন আমরা কীভাবে দায়ী? আচ্ছা দাঁড়ান বলছি।

প্রথমেই আসতে হবে কী কারণে আজকাল আত্মহত্যার প্রবণতা এত বৃদ্ধি পেয়েছে? এর পেছনে অনেক কারণ আছে। অনেক নামি নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আজকাল আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা গেছে, এদের বেশির ভাগই ক্যারিয়ার নিয়ে প্রচণ্ড হতাশ ছিল অথবা প্রেমঘটিত কোনো কারণে কিংবা কোনো অপমানের কারণে।

ভার্সিটির ছাত্রদের আত্মহত্যার বেশির ভাগ কারণই ক্যারিয়ারের হতাশা অথবা প্রেমঘটিত কোনো কিছু। কিন্তু এর চেয়ে ছোট বয়সের যারা আছেন, তাদের আত্মহত্যার বেশির ভাগ কারণ হচ্ছে, হয় বাবা বকেছে, স্কুলে মেরেছে, না হয় অপমান করেছে। আজকালকার জেনারেশনের সবাই কেন জানি একটু বেশিই অভিমানী। কিছু একটা হলেই আত্মহত্যা করতে হবে—এটাই যেন একমাত্র পথ। টিভিতে পছন্দের নাটক দেখতে দেয়নি, এর জন্যে আত্মহত্যা করেছে এমন ঘটনাও আমাদের দেশে রয়েছে। এখন আপনার প্রশ্ন হচ্ছে—সব ই তো বুঝলাম, কিন্তু আমরা এর সাথে জড়িত কীভাবে?

আপনার কতজন পরিচিত এ ধরনের মানুষের পাশে আপনারা দাঁড়িয়েছেন? কতজনকে সাহস জুগিয়েছেন বেঁচে থাকার জন্য? বরং ঘাঁটলে দেখা যাবে ওই হতাশাগ্রস্ত আত্মহত্যা করা মানুষটা আপনাদের কাছ থেকে অবহেলা, হাসি, ঠাট্টা ছাড়া আর কিছুই পায় না। যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের অনেকের ফেসবুক প্রোফাইল দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কারণ আমি খুঁজতে চেষ্টা করি কেন তার এই পৃথিবীর প্রতি এত অভিমান। কী ছিল তার শেষ কথাগুলো। বেশির ভাগ প্রোফাইল চেক করলেই দেখা যায়, বিভিন্ন হতাশামূলক পোস্ট থাকে তাদের প্রোফাইলজুড়ে। কিন্তু তাদের এই সব অভিমানী পোস্টে আপনারা কী দিয়েছেন? শুধুই হাহা রিঅ্যাক্ট। কমেন্টে দেখা যায়, বিষয়টা নিয়ে কেউ কেউ বিভিন্ন টিটকারিও করেছে। আসলে সেই মানুষটার আত্মহত্যার জন্য পরোক্ষভাবে আমরা দায়ী কি না? 

আমাদের কাজ শুধু আত্মহত্যার পর কেউ একজনকে দোষী বানিয়ে সবাই মিলে তার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করে ফেলা। এই যে অরিত্রী মেয়েটা আত্মহত্যা করল, তার জন্যে কি শুধু সে শিক্ষিকাই দায়ী? আমি বাজি ধরে বলতে পারি, আত্মহত্যার কারণ যে রকম তার বাবাকে অপমান করা ছিল, ঠিক তেমনি আরেকটা না বলা কারণ হচ্ছে স্কুলের বন্ধুদের টিটকারি, সমাজের টিটকারি। আচ্ছা বুকে হাত দিয়ে বলুন তো, অরিত্রী যদি আত্মহত্যা না করে পরের দিন স্কুলে যেত তাহলে কি তাকে নকলবাজ বলে টিটকারি মারা হতো না? 

কিসের আমাদের এত সমস্যা? কেন অন্যকে নিয়ে মজা করতেই আমরা বেশি পছন্দ করি? কেন অন্যের সমস্যাতে আমরা পাশে দাঁড়াই না? এ প্রশ্নগুলো কখনো নিজেকে করেছেন? তাহলে দেখবেন আত্মহত্যার প্ররোচনার কারণ হিসেবে আপনার চেহারাও দেখতে পাবেন।

আমি ঢালাওভাবে আপনাদের মতো শুধু শিক্ষককেই দোষ দিতে পারছি না। একজন শিক্ষার্থী নকল করেছে। তিনি এর ব্যবস্থা নেবেন এটাই স্বাভাবিক। অবশ্যই তিনি ছাত্রীর সামনে বাবাকে অপমান করে ঠিক করেননি। কিন্তু তিনি তো আর সব শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা জানেন না। শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা সবচেয়ে ভালো জানা উচিত তার বাবা-মায়ের। তারা যদি আজ আরও সতর্ক হতেন, তাহলে হয়তো আজকের এ দিনটি দেখতে হতো না।

আর আমরা যারা আজকে ঢালাওভাবে শুধু সেই শিক্ষিকার দোষ দিয়ে যাচ্ছি। একটা ভিডিওতে দেখলাম গাড়ির ভেতর থেকে তাকে টানাহেঁচড়া করা হচ্ছে। তাকে যেভাবে অপদস্ত করা হচ্ছে। আজ যদি অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে সেই শিক্ষিকাই আত্মহত্যা করেন, তাহলে এর দায় কে নেবে?

তার মানে এই নয় যে শিক্ষকদের কোনো দোষ নেই। এত এত মানুষের এই প্রতিবাদই প্রমাণ করে শিক্ষকরা শিক্ষার নামে ব্যবসা করে আজ নিজেদের এ রকম কোনো অবস্থানে নিয়ে গেছেন। যার জন্যেই সবকিছুতে আজ তাদের দোষ খোঁজা হয়। তাদের উচিত শিক্ষকদের মর্যাদা ধরে রাখার চেষ্টা করা।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট
আত্মহত্যা নয়
আত্মহত্যা নয়
https://www.prothomalo.com/ - ১ week আগে

loading ...