এক সময় রাত জেগে গ্রামের মানুষেরা ভিড় করতো পুতুল নাচ-গানের আসরে। ছবি: প্রিয়.কম

বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ

মাঝে মাঝে কোন বাঙালি অনুষ্ঠানে দেখা মেলে এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ ও গানের আসর।

কাঞ্চন কুমার
কন্ট্রিবিউটর, কুষ্টিয়া
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:১৯ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:২১
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:১৯ আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৬:২১


এক সময় রাত জেগে গ্রামের মানুষেরা ভিড় করতো পুতুল নাচ-গানের আসরে। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) পুতুল নাচ গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য। গানের তালে তালে ঐতিহ্যবাহী ঘটনার সঙ্গে বাদ্যযন্ত্র ও সুরের মূর্ছনায় পুতুলের নৃত্য। গ্রামীণ জনপদে শিশু-কিশোর ও সর্বস্তরের মানুষের বিনোদনের মাধ্যম। পুতুল খেলা শিশুদের কাছে উৎসবের মতো।

মেয়ে পুতুলের সঙ্গে সঙ্গে পুতুলের বিয়ে এ যেন গ্রাম বাংলার সাধারণ রূপ। আর তার সঙ্গে যদি সেই জড় পুতুল নাচে, কথা বলে তাহলে ছোট থেকে বড় সবাই যেন তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুভব করে। বাংলার সংস্কৃতিতে বিনোদনে বড় মাধ্যম এটি।

এক সময় রাত জেগে গ্রামের মানুষেরা ভিড় করতো এই পুতুল নাচ-গানের আসরে। পুতুল নাচের গল্পে তুলে ধরা হতো সে সময়ের মানুষের ধর্মকথা, নীতিকথা, সুখ–দুঃখ, রঙ্গরস, হাসি-ঠাট্টা ও নিত্যদিনের জীবনাচরণ। কাঠের পুতুল অথবা সোলা দিয়ে পুতুল তৈরি করে, সেটাতে রঙ তুলির আঁচড় দিয়ে, বিভিন্ন বর্ণিল সাজে সাজিয়ে বাদ্যযন্ত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুতার দিয়ে হেলিয়ে দুলিয়ে নাচায় এই পুতুল নাচের আসরে।

কুষ্টিয়া জনপদের বিনোদনে পুতুল নাচ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। আজো মাঝে মাঝে কোন বাঙালি অনুষ্ঠানে দেখা মেলে এই ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ ও গানের আসরের। তবে কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী এই পুতুল নাচ আজ প্রায় বিলুপ্তির তালিকায় নাম লিখিয়েছে।

কুষ্টিয়ার ‘মনহারা’ পুতুল নাচের যৌবনে দীপ্তমান কদর থাকলেও আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। তবে আজো বিশেষ কোন আয়োজন ও গ্রামীণ ঐতিহ্যের বাহক হিসাবে প্রদীপের মতো টিপ টিপ করে বেঁচে আছে দেশের বিখ্যাত পুতুল নাচ ‘মনহারা’ পুতুল নাচ। এই দলের পুতুল নাচ দেখলে সত্যিই যে কারও মন হারিয়ে যায়।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়ী ইউনিয়নের নওদাপাড়া গ্রামের মৃত সলিম মালিথার ছেলে আব্দুস কুদ্দুস। জীবনের প্রায় সবটুকু সময় ব্যয় করে দিয়েছেন এই মনহারা পুতুল নাচের সঙ্গে। ১৯৭২ সাল থেকে তিনি এই পুতুল নাচের দলের হাল ধরে রেখেছেন। আজো স্বপ্ন দেখেন, পুতুল নাচের সুদিন ফিরবে। নিজ হাতে এখনো তৈরি করে যাচ্ছেন বিভিন্ন পালার জন্য পুতুল।

আব্দুস কুদ্দুস বলেন, ‘১৯৬৫ সালে তখন আমার বয়স ৯-১০ বছর। আমার বাবা খুবই সৌখিন মানুষ ছিলেন। তিনি আমাকে বিভিন্ন গান-বাজনা শেখানোর জন্য পুতুল নাচের ‘মনহারা’ পুতুল নাচের দলে নিয়ে যায়। সেখানে শুকচান মাল নামের একজন উস্তাদের কাছে নিয়ে যায় আমাকে। আমি তখন দেখতে খুব সুন্দর ছিলাম। সেখানে মাস কয়েক পুতুল নাচের বিভিন্ন গান শিখি। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শাড়ি পরে পুতুলের সঙ্গে নাচ-গান করি। এরই মধ্যে ওস্তাদের প্রিয় হয়ে উঠি। প্রায় ১৬ বছর আমি পুতুল নাচের আসরে পুতুলের সাথে মেয়ে সেজে গান করি। ৪-৫ দিন অনুষ্ঠান করলে আমি ৫০-১০০ টাকা পেতাম।’

‘১৯৭২ সালে মনহারা পুতুল নাচের দলটির দায়িত্ব আমি পাই। তখনো ওস্তাদ আমার সাথে থাকতেন। তারপর ওস্তাদ শুকচান অসুস্থ্য হয়ে মারা যান। দলের প্রায় দুর্দিন নেমে আসে। আমাদের পুতুল নাচের দলে ছিল ১৪ জন সদস্য। এর মধ্যে ১০ জন গানের তালে পুতুলকে পরিচালনা করতো। বাকিরা বাদ্যযন্ত্র বাজাতো আর গান গাইতো। ১৯৭৫ সালে আমি হারমনি বাজানোর প্রশিক্ষণ নেয় কুষ্টিয়া শিল্পকলা থেকে। তারপরে দলের দুর্দিন প্রায় কাটিয়ে উঠি। একটা অনুষ্ঠানে গেলে আরেকটি অনুষ্ঠানের দাওয়াত পেতাম। বেশ ভালোই চলছিল আমাদের পুতুল নাচ। কুষ্টিয়াসহ বেশ কিছু অঞ্চলে পুতুল নাচ করে বেশ সুনাম অর্জন করি।’

কুষ্টিয়ার বিখ্যাত পুতুল নাচের দল ‘মনহারা’।
রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমীতে পুতুল নাচ প্রতিযোগিতায় কয়েকবার পুরষ্কার পায় কুষ্টিয়ার বিখ্যাত পুতুল নাচের দল ‘মনহারা’। ছবি: প্রিয়.কম

কুদ্দুস জানান, কুষ্টিয়ার বাইরে চুয়াডাঙ্গায় ‘রাজকণ্যা মনিক মালা’, ‘সীতার বনবাস’, ‘রুপবান’, ‘গরীবের ছেলে’, ‘গরীবের মেয়ে’, হিংসার পরিনাম’ এবং মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, নাটোর, রাজশাহী, নড়াইল, ঢাকায় ‘প্রেম সার্থক’ ও ‘কালো গাজী’ এর পুতুল নাচের পালা করেছেন তিনি। ঢাকার শিল্প কলায় ‘ঘুনাই সুন্দরী’ পালা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি পুতুল নাচে সাপ, নৌকামাঝি, কুমার, মাছ, বাঘ, হুনুমান, হরিণ, ঘোড়া প্রভূতি বিষয় নিয়ে গ্রাম্য জীবনভিত্তিক হাসি-ঠাট্টা ও তামাশামূলক গল্পে রচিত পুতুল নাচ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্যবার দেখিয়েছিলেন। আমার এই ‘মনহারা’ পুতুল নাচে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ‘সোনার যাদু’ ও ‘রুপবান’। এ ছাড়াও ‘সাগর ভাষা’, ‘ফেরারি সম্রাট’, ‘নাচ মহল’, ‘ভিখারির ছেলে’ অন্যতম পালা।

তিনি আরও বলেন, ‘২০০৭ সালে ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমিতে পুতুল নাচ প্রতিযোগিতায় আমি ও আমার দল অংশগ্রহণ করি। সেখানে সারা দেশের ৪৮টি পুতুল নাচের দলের মধ্যে আমি প্রথম হই। এ ছাড়া ২০১৩ সালে এবং ২০১৬ সালেও আমি পুরস্কার গ্রহণ করি। পুতুল নাচ বাংলার মানুষের প্রাচীন একটি ঐতিহ্য। এই পুতুল তৈরি করতে যেমন অর্থের প্রয়োজন তেমনি এই নাচ-গান পরিচালনার জন্যেও অর্থের প্রয়োজন। তবে বর্তমানে অশ্লিল নাচ গানের কারনে এই গান করতে নানান বাধার সম্মুখিন হতে হয়।’

‘প্রশাসন আমাদের প্রোগাম করার অনুমতি দেয় না। কারণ বিভিন্ন সময়ে দেখা যায় পুতুল নাচের নামে বিভিন্ন ব্যক্তিরা অশ্লীল নাচ গান করায়। তবে আমাদের এই মনহারা পুতুল নাচ দেখতে এখনো অনেক মানুষ ভিড় করে। দলটিতে খুব কষ্টে টিকিয়ে রেখেছি। সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা ছাড়া আর কতদিন এভাবে টিকে থাকবে ঐতিহ্যবাহী এই ‘‘মনহারা’’ পুতুল নাচ। তবে আমি যতদিন বেঁচে আছি এই পুতুলের সাথেই জীবনটা কাটিয়ে দেবো। মানুষের মনে একটু আনন্দ দেওয়ার চেষ্টা করবো।’

মিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম জামাল আহমেদ জানান, মিরপুর উপজেলার ‘মনহারা’ পুতুল নাচ জেলার মধ্যে তথা সারা দেশেই বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। আব্দুস কুদ্দুস তিনি এই দলটিকে ধরে রেখেছেন। বিভিন্ন স্থানে গ্রামের মানুষের মাঝে পুতুল নাচের মাধ্যমে সুষ্ঠু বিনোদন দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের পরে সরকারি কোন সাহায্য সহযোগিতা করা সম্ভব কিনা এ ব্যপারে ঊর্ধ্বতন সংশ্লিষ্টদের সাথে আমি যোগাযোগ করবো।’

প্রিয় সংবাদ/শিরিন/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...