সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কপি।

ভাগাভাগির সমীকরণ, হলফনামা ও উল্টো কথা

নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল নিয়েও নানা খবর ছাপা হচ্ছে গণমাধ্যমে। অতীতের নানা উদাহরণ টেনে বর্তমানকে জটিল করতে চাইছেন তারা। আরে ভাই, অতীতের দিকে তাকান কেন, ভবিষ্যতের দিকে তাকান।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৯:৫০
আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:০২


সংসদ সদস্য (এমপি) প্রার্থীদের হলফনামা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের কপি।

এক.

চট্টগ্রামের এক বর্তমান সাথে ব্র্যাকেটে হবু এমপি বলেছেন, ‘নির্বাচনে জিতলে সবাই মিলে ভাগ করে খাব’। গণমাধ্যমের শিরোনামে এমনটাই এসেছে। এ নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা, রীতিমত ভাইরাল তার বক্তব্য। কেন-রে ভাই, এখানে খারাপটা কী! এ নিয়ে এত সমালোচনা কেন? ‘কেউ খাবে তো কেউ খাবে না, তা হবে না’–এমন শ্লোগানটিরই বাস্তব রূপ দিতে চাচ্ছেন তিনি। ভাগাভাগির বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক করতে চাচ্ছেন।

অনেকে কথায় কথায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরের গণতন্ত্রের কথা বলেন। আফসোস করেন সেখানে গণতন্ত্র নেই বলে। ওই ডাবল এমপি মানে বর্তমান আর হবু মিলে, সেই কথাই তো বলেছেন। বাইরের মানুষকে দেওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে খাবার ব্যাপারটি চালু করতে চাচ্ছেন। গত অর্ধ দশকেও তিনি যা চেষ্টা করে পারেন নাই। তার বক্তব্যেই সে ক্ষোভটি বোঝা যায়। তিনি নাম ধরে ধরে বলেছেন, অমুককে দিয়েছি, তমুককে দিয়েছি। অর্থাৎ এত দিয়েও পুরোপুরি দেওয়ার মানে ভাগ-ভাটোয়ারার ব্যাপারটিকে গণতান্ত্রিক করা সম্ভব হয়নি। তাই হয়তো আরো অর্ধ দশক তিনি থাকতে চাচ্ছেন। এরমধ্যে ভাগাভাগির গণতন্ত্রটি নিজেদের মধ্যে চালু করতে পারলে, অন্য দশকে না হয় আমজনতার কথা ভাবা যাবে। যে প্র্যাকটিস নিজেদের মধ্যেই সমানভাবে চালু হয়নি, সে ক্ষেত্রে আমজনতার ব্যাপারে এখনই ভাবাটা নেহাত বোকামি। সেই জন্যই কতেক বুদ্ধিজীবী বলেন, ‘নিজেদের মধ্যেই গণতন্ত্র নেই, আবার দেশের গণতন্ত্র নিয়ে মাথা ঘামানো’।

দুই.

প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুসারে গত এক দশকের তুলনা করছে গণমাধ্যমগুলো। দশ বছরে কার কত সম্পদ বেড়েছে এসব নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড। আরে, বিশ্বের দ্রুত ধনীর দেশটি হলো আমাদের। কিছু মানুষ আমাদের এই দুর্লভ সম্মানটি এনে দিয়েছেন। এসব মানুষেরা ধনী হওয়ার ক্ষেত্রে চীন, অ্যামেরিকা, জাপান–সবাইকে পিছে ফেলে দিয়েছেন। সারা দুনিয়ায় এমন অভিজাত একটি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়া কী চাট্টিখানি কথা!

গণমাধ্যম আসলে মানুষের ভালো দেখতে পারে না। দশ বছরে কার সম্পদ বাড়ল দশ থেকে একশ গুন, তাই নিয়েই আছে তারা। অথচ বিপরীতে সুফি, দরবেশ টাইপ প্রার্থীরাও রয়েছেন, যাদের কিছু নেই। সে নিয়ে কোনো পজেটিভ নিউজ নেই, ওটা নিয়েও নেগেটিভ নিউজ। কেউ কেউ তো আগ বাড়িয়ে হাসিঠাট্টাও করছেন। এ কেমন বিচার, বলুন দেখি। তবে এর মাঝেও বর্তমানের কথাও কেউ কেউ ভাবেন। তারা কিন্তু ঠিকই সুকুমার বাবুর ভাষায় বলছেন, ‘থালাটাও ভাঙাচোরা, বাটিটাও লিক আছে, তিনি হেসে বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছে’।

মাছ বেচে কী ধনী হওয়া যায় না? যায় তো। না হলে প্রার্থীদের হলফনামায় মৎস্য ব্যবসার এত প্রাবল্য কেন। এটা নিয়েও গণমাধ্যম রঙ-তামাশা করছে। ‘মারিব মৎস্য খাইবো সুখে’–এই প্রবাদটিও ভুলে গেছে গণমাধ্যম। সময় হোক, এসব গণমাধ্যমকে মনে করিয়ে দেওয়া যাবে ‘সুখে থাকলে ভূতে কিলায়’ প্রবাদটিও।

তিন.

নির্বাচনে প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল নিয়েও নানা খবর ছাপা হচ্ছে গণমাধ্যমে। অতীতের নানা উদাহরণ টেনে বর্তমানকে জটিল করতে চাইছেন তারা। আরে ভাই, অতীতের দিকে তাকান কেন, ভবিষ্যতের দিকে তাকান। অতীত মানে তো ইতিহাস। ইতিহাস খাওয়া যায় না, ইতিহাসে পেট ভরে না। বর্তমান হলো খাওয়ার সময়। সময়ের কাজ সময়েই করতে হয়। খেয়ে-পড়ে বাঁচতে হলে অতীতমুখী হওয়া যাবে না।

পশ্চাৎপদ কোনো কাজের কথা নয়। ভূতের পা চলে উল্টো। আমরা তো ভূত নই, ‘ডিজিটাল’ জামানার মানুষ। কেন অতীতের কথা মনে করিয়ে লজ্জা দেওয়ার চেষ্টা, ভূতের মতো ভেংচি কাটার কোশেস। আসলে গণমাধ্যমে ভূতে ভর করেছে। অবশ্য ভূত তাড়ানোর মন্ত্র আগেই তৈরি করা আছে। ওইটা না থাকলে তো ‘খেইল খতম, বেইল নাই’ অবস্থা হয়ে যেত।

চার.

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলছেন, ‘কালো নয়, স্বচ্ছ নির্বাচন করতে চাই’। বেচারি শ্যামবর্ণের মানুষ, কেন যে গৌরবর্ণের নির্বাচন নিয়ে তার এত আহাজারি। ভগবানের অবতার ছিলেন কৃষ্ণ, তিনিও শ্যাম বর্ণের। তার ছিল অসীম ক্ষমতা, কিন্তু মাহবুব তালুকদার তো কৃষ্ণ নন, তার ক্ষমতা সীমিত।

তিনি নিজেই বলেছেন, পাঁচ জনের মধ্যে তিনি সংখ্যালঘু। অন্যরাও তো আছেন, সংখ্যাগুরুদের চাওয়াটাও তো দেখতে হবে। তারা যদি চান ‘শ্যাম’ আর ‘গৌরি’র মতন মিলেমিশে একটি প্রেম ও আনন্দময় নির্বাচন করতে, তাহলেও হয়তো পারবেন। আর যদি ঝাঁকের কই ঝাঁকে মিশে যেতে চান, তা-ও পারবেন।

এখন তারা কোনটা চান সেটাই বড় প্রশ্ন। তবে ফাঁসের জামানায় পরীক্ষার আগেই প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়, উত্তরটা জানা হয়ে যায় সকলের, মুশকিলটা ওইখানেই।

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


স্পন্সরড কনটেন্ট

loading ...