নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

এবারের নির্বাচনে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার আগ্রহ নেই ইসির

কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এবার বৈধ অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতেছি।’

প্রদীপ দাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:৫৬
আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৪:০৪


নির্বাচনে বৈধ অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটের আগে ও পরে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নেই বলে জানিয়েছেন এক কমিশনার। সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি বলছে, জমা না নিলেও এর অপব্যবহার রোধে এই সময় বৈধ অস্ত্র বহন ও প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈধ অস্ত্র জমা না নিলে সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ইসির অতিরিক্ত সচিব মো. মোখলেছুর রহমান ৬ ডিসেম্বর, বৃহস্পতিবার রাতে অতিরিক্ত সচিব প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ভোটের আগে ও পরবর্তী সময়ে বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া হবে কি না—সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত ইসির কাছ থেকে কোনো নির্দেশনা নেই।’

একই রাতে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরবর্তী সময়ে কেউ বৈধ অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহার করতে পারবেন না। বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহার হলে পুলিশ সুপার (এসপি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রয়োজনবোধে অস্ত্র জমা নিয়ে নিতে পারবেন। আমরা এবার বৈধ অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ করতেছি; কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া কারো কাছ থেকে বৈধ অস্ত্র থানায় জমা নেওয়ার কোনো বিষয় আমরা বলিনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি অস্ত্র নিয়ে কাউকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে কিংবা এসপি বা ওসি যদি মনে করেন তাদের নিজেদের নিরাপত্তা, এলাকার নিরাপত্তা বা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়া দরকার; পুলিশ অ্যাক্ট অনুযায়ী তারা সেটা করতে পারবেন।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এটা তো একটা রেওয়াজ। ভোটের আগে আগে বৈধ অস্ত্র নিয়ে নেওয়া হয়। যাতে করে এসব বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়-ভীতি দেখাতে না পারে। সেদিক থেকে এটা নিয়ে নেওয়া যুক্তি।’

দিলীপ কুমার আরও বলেন, ‘এবার কী কারণে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসছে ইসি, সেটা বোধগম্য নয়। ইসি বৈধ অস্ত্র জমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে সেটা নির্বাচনে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। আর তা না হলে বৈধ অস্ত্রের অন্য রকম ব্যবহার হতে পারে, যা নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। এ উপলক্ষে ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বরের মধ্যে স্থানীয় বা কাছাকাছি থানা অথবা বৈধ ডিলারের কাছে লাইসেন্স করা অস্ত্র জমা দেওয়ার আদেশ জারি করা হয়। ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ জমা রাখা হবে বলে জানানো হয়। তবে পরে ২৬ ডিসেম্বর আদেশটি স্থগিত করা হয়।

এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনের কথা আমি বলতে পারব না। কিন্তু ২০০৮ সালের নির্বাচনে আমি ছিলাম, জানি; তখন আমরা বৈধ অস্ত্র জমা নিইনি।’

তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে দুই দফায় বৈধ অস্ত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৮ সালের ২০ নভেম্বর থেকে ৩ ডিসেম্বর ছিল অস্ত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সবাই অস্ত্র জমা না দেওয়ায় ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এক লাখ ২৩ হাজার ৫৯২টি আগ্নেয়াস্ত্র জমা পড়ে। তখন দেশে লাইসেন্স করা অস্ত্রের সংখ্যা ছিল এক লাখ ৭৬ হাজার ৩৮০টি।

২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন ডিএমপির পুলিশ কমিশনার নাঈম আহমেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, জমা না পড়া এ সব অস্ত্র এখন অবৈধ। তৎকালীন পুলিশের আইজি নূর মোহাম্মদও একই কথা বলেছিলেন। এ সব অস্ত্র উদ্ধার ও মালিকদের গ্রেফতারে অভিযান চালানোর কথা থাকলেও পরবর্তী সময়ে আর হয়ে ওঠেনি।

এ ছাড়া এর আগের জাতীয় নির্বাচনের আগে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র জমা নেওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত ছিল।

বৈধ অস্ত্র নিয়ে নানা অভিযোগ

বৈধ অস্ত্র নিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নানা অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রতিবেদনও প্রকাশ পায়। দৈনিক মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাই বৈধ অস্ত্র নিয়েছেন।

দৈনিক মানবজমিনে ২০১৫ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঢাকা-১৮ আসনেই মহাজোট সরকার প্রায় সাড়ে ছয় বছরে নেতাকর্মীদের তিন হাজার অস্ত্রের লাইসেন্স দেয়। এ আসনের বৈধ অস্ত্রধারীদের বেশির ভাগ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মী এবং তাদের স্বজনরা। দলীয় পরিচয়ে এ আসনটির ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতাকর্মীরা পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্স পান। অনেক নেতাকর্মী শর্ট ব্যারেল (এনপিবি পিস্তল/রিভলবার) এবং লং ব্যারেল (শটগান বা রাইফেল) অস্ত্রের লাইসেন্স নেন। অস্ত্রের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংরক্ষণ না হওয়ায় অনেকে দুই বা এর অধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স পান। ঢাকা মহানগরীর খিলক্ষেত, উত্তরা (পূর্ব), উত্তরা (পশ্চিম), তুরাগ থানা, উত্তর খান ও দক্ষিণ খান থানা নিয়ে গঠিত এ সংসদীয় আসনের ইউনিয়ন পর্যায়ে ওয়ার্ড নেতাদেরও ছিল বৈধ অস্ত্র।

২০১৭ সালের এপ্রিলে অনলাইন নিউজ পোর্টাল পরিবর্তন.কমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বেড়েছিল আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার। সেই সাথে বেড়েছিল আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সে নেওয়ার প্রবণতাও। ওই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান মেয়াদের (দশম নির্বাচনের সময়) তিন বছরে ও গত মেয়াদের (নবম নির্বাচনের সময়) পাঁচ বছরে শটগান এবং পিস্তলসহ চার ধরনের ক্যাটাগরিতে শুধু ঢাকা শহর ও ঢাকা জেলাতে তিন হাজার সাতশ তিনটি আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন
স্পন্সরড কনটেন্ট
রুয়েটের নতুন ভিসি ড. মো. রফিকুল ইসলাম শেখ
রুয়েটের নতুন ভিসি ড. মো. রফিকুল ইসলাম শেখ
বাংলা ট্রিবিউন - ৪ মাস, ৩ সপ্তাহ আগে

loading ...