আনিসুর রহমান মিলন। ছবি: প্রিয়.কম

‘সোকল্ড হিরোইজমের চর্চা কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে’

তথাকথিত হিরোইজমের চর্চা বৈচিত্র্যময় গল্পে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৯ আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৯
প্রকাশিত: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৯ আপডেট: ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৩:৫৯


আনিসুর রহমান মিলন। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) তথাকথিত হিরোইজমের চর্চা বৈচিত্র্যময় গল্পে কাজ করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে বলে মন্তব্য করেছেন টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেতা আনিসুর রহমান মিলন

রাজধানীর কলাবাগানের বাসায় সম্প্রতি প্রিয়.কমের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপে মিলন এই মন্তব্য করেন।

ছোট ও বড় পর্দার নিয়মিত এই অভিনেতা মনে করেন, পর্দায় অভিনেতা, অভিনেত্রীদের চরিত্রে বৈচিত্র্য থাকবে। নির্দিষ্ট ঘরানা থেকে বের হতে হবে।

তার ভাষ্য, ‘আমাদের সোকল্ড হিরোইজমের চর্চা ভ্যারাইটিস ধরনের গল্পে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেছে। আমার কথা হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রিতে ১০টা হিরো ও ১০টা হিরোইন মিনিমাম থাকবে। দর্শক টেস্ট অনুযায়ী ছবি দেখতে যাবে। এখন যদি পুরনো কথা বুলির মতো বলেই যাই, শাকিব ছাড়া সিনেমা চলে না! তখন আরেক হিরোর ছবি কীভাবে চলবে? আমাদের সিনেমা নিয়ে অনেক বড় ঝামেলা আছে।’

‘ভালো ছবি নির্মাণ করার পরও বিভিন্ন কারণে দর্শকদের কাছে পৌঁছায় না। সিনেমায় রাজনীতির কারণে অনেক সময় দেখা গেছে ভালো ছবিও দর্শক মিস করে গেছে। এ রকম একটি সিনেমা দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে দেওয়া হয়নি। এ জায়গাগুলোতে নজর না দিলে কখনো জটিলতা নিরসন হবে না। মেরিট-ডিমেরিট নির্ধারণ করে দিবে দর্শক। কিন্তু সেটা নির্ধারণ করছি আমরাই!’

চলচ্চিত্র বা নাটকে চরিত্র বণ্টনের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী যে বিষয়গুলো মানা হয়, সেটি বাংলাদেশে অনুসরণ করা হয় না বলে মত মিলনের। তিনি বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী ক্যারেক্টারকে ডিস্ট্রিবিউশন হয় গল্পের চরিত্রের ওপর নির্ভর করে, যেটা বাংলাদেশে হয় না। আমাদের এখানে হয় একবার আমি যদি একটি সিনেমাতে হিরো চরিত্রে অভিনয় করি তারপর থেকে চিন্তা করা হয় সে সবসময় হিরো চরিত্রেই কাজ করবে।’

‘আমি ইতোমধ্যে হিরো, অ্যান্টি হিরো, ক্যারেকটার হিরো। সব ধরনের চরিত্রই চলচ্চিত্রে অভিনয় করে আসছি। কারণ কেউ যখন সিনেমা নির্মাণ নিয়ে চিন্তা করবে, যাতে সে আর্টিস্ট কে দেখতে পায়, যাতে এই ক্যারেকটার ডেভলপ করার সময়ই ভিজুয়্যালি আমাকে দেখতে পায়।’

চলচ্চিত্রে চরিত্র নিয়ে নিজের ভাবনার কথা জানিয়ে মিলন বলেন, ‘এখন আমার সাদামাটা হিরো চরিত্রগুলো করার কোনো ইচ্ছা নাই। আমার সবসময় মনে হয় অনেক চ্যালেঞ্জিং, অনেক ডাইমেনশন নিয়ে যে চরিত্রগুলো সেগুলো হচ্ছে অ্যান্টি হিরো। সেগুলো করার ইচ্ছে আছে।’

‘আবার আমাদের দেশের সো কল্ড ভিলেন যে চরিত্র বলছি, সেটা আবার আমার পছন্দ না। গল্পের চরিত্রটি যদি হয়, যে গল্পের প্রয়োজনে চরিত্রটিকে খারাপ চরিত্রে অভিনয় করতে হয়, সে চরিত্রটিকে আমি খারাপ চরিত্র বলছি। তবে এ রকম চরিত্র পাওয়াও কঠিন, এটাও ঠিক।’

বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতাদের চরিত্র নির্ধারণে আরও সচেতন হওয়া উচিত বলে মনে করেন মিলন। তার মতে, তারারই এ ক্ষেত্রে কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারেন।

তিনি বলেন, ‘এই জেনারেশনের মেকাররা এই জিনিসগুলো নিয়ে ভাবতে পারে। কারণ ওরা ওয়ার্ল্ড ফিল্ম দেখে। আমরা করি কি আমাদের গণ্ডির মধ্যেই থাকার চেষ্টা করি? তার চেয়ে বাইরে না গেলে ভিন্ন কিছু করা যাবে না।’

‘সে রকম একটা ভাবনা থেকে যখন সিনেমাগুলো হবে, তখন সিনেমাগুলো ডিফরেন্ট মুডে হবে। যখন এ ধরনের কাজগুলো রেগুলার হবে, তখন তারা এর যে আলাদা টেস্ট আছে, সেটা বুঝতে পারবে। এভাবেই সামনে এগুলোই আমি আমার সাকসেসের জায়গায় যেতে পারব।’

চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে এই অভিনেতা বলেন, ‘সিনেমার একটা সংকটকাল অতিক্রম করে ২০১৩ সাল থেকে একটা গুড মোমেন্ট তৈরি হচ্ছে। এখন ২০১৮। সব মিলিয়ে দর্শককে ভালো কাজ দেওয়ার চেষ্টা করছি।’

‘চলচ্চিত্রে ২০১৩ থেকে মিক্সড দর্শক ঢুকতে শুরু করেছে। তারা এখনো সেট হয়নি, যার কারণে মেকাররাও বুঝতে পারছে না কোন ছবি তারা আসলে দর্শকদের জন্য করছে। এই যে বোঝা ও না বোঝার কারণেই আজ এ অবস্থা।’

আলাপের এক পর্যায়ে মিলনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, তিনি সঠিক সময়ে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেছিলেন কি না। জবাবে তিনি তার অভিষেকের সময়টাকে সঠিক বলে চিহ্নিত করেন।

‘আমি সঠিক সময়েই ফিল্মে প্রবেশ করেছি। এর আগে ১০ বছর আমাকে দিয়ে সিনেমাতে কিছু হতো না। কারণ সিনেমা তখন নষ্ট জায়গায় ছিল। ‘‘দেহরক্ষী’’ দিয়েই কিন্তু এক ধরনের টার্নিং শুরু হইল।’

‘ঘটনা হলো, আমি স্টার্ট করেছি কোর সিনেমার মেকারদের মধ্য দিয়ে; মানে এফডিসি ওরিয়েন্টেড সিনেমার মধ্য দিয়ে। এখন কিন্তু তাদের হাতে সিনেমা কম, অথবা তারা প্রযোজককে বিশ্বাস করাতে পারছে না সিনেমায় টাকা লগ্নি করলে সেটা আবার ব্যাক করবে’, বলেন মিলন।

চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি অংশ কীভাবে কাজ করছেন তার একটা ব্যাখ্যা দেন মিলন। তাদের সঙ্গে কাজ করা ও এ সংক্রান্ত অভিজ্ঞাত জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর মধ্যে একদল সেট করে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছে, আরেকটা দল করছে না। আমি হইলাম এই যে সেট এবং না সেট দুই দলের মাঝখানে আমি। এখনো আমার হাতে চার-পাঁচটা সিনেমা আছে।’

‘তাদের হচ্ছে কী গল্পটা পাওয়ার পর মনে হচ্ছে, এটা মিলন ভাইকে নিয়ে করি। ভুল কোথাও হয়নি। এখন টাইমটাকে শিফট করানোর টাইমের জন্য ওয়েট করছি। টাইমটা যখন শিফট হতে থাকবে, নানা ধরনের গল্পের মাঝে আমার চরিত্রগুলো চলে আসবে।’

‘সিনেমার বাজার চেঞ্জ করার জন্য শুধু, ভালো সিনেমা, ভালো অভিনয়-এগুলা ম্যাকানিজম না। বহু কিছু দিয়ে ম্যাকানিজম কইরা সিনেমা চালাইতে হবে। একদম ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর মতো প্রোডাক্ট সেল করার মতো সিনেমা করতে হবে।’

বাংলাদেশে গুণী অভিনেতার সংকট রয়েছে বলে মনে করেন ছোট ও বড় পর্দায় সমানতারে কাজ করা মিলন। তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশে এখন হুমায়ুন ফরীদি নাই। কিন্তু হুমায়ুন ফরীদি তৈরি করতে হবে। যেখানে সিনেমা দেখতে যাওয়া হইত ফরীদির নামে, সেটা দরকার আসলে।’

‘কারণ আমি সিনেমাটা দেখতে যাওয়ার আগে বুঝতেই পারতেছি না, ফরীদি কী ধরনের চরিত্রে অভিনয় করবে। ওই জায়গাটা তৈরি করতে হলে গল্প তৈরি করতে হবে। আর সে জায়গাটা পারফরমারদের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। তারপর ভালো ছবি তৈরি হবে।’

চলচ্চিত্রে পেশাদারিত্ব অভাব আছে বলে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করেছেন শিল্পী, কলাকুশলী ও সংশ্লিষ্টরা। তাদের সঙ্গে দ্বিমত নেই মিলনের।

তার মতে, ‘সিনেমাতে ওই অবস্থান তৈরি হয়নি বলেই আমি এখনো টিভি নাটকে নিয়মিত অভিনয় করে যাচ্ছি। আমি যেভাবে চেয়েছি, মানে লাগাতার আমার কাছে সিনেমা থাকবে। আমি দর্শককে একের পর এক ভালো সিনেমা করে যাব। আমি সারভাইভ করে যাব। সেই জায়গাটাতে আমি পৌঁছাতে পারিনি। সেটা অনেক ধরনের কারণে, যার কারণে আমি নাটকের পাশাপাশি সিনেমাও করছি।’

‘দুটো মাধ্যম দিয়ে আমাকে ফিন্যান্সিয়ালি সারভাইভ করতে হবে। সিনেমাটাকে ছাড়ার কোনো অপশন নাই। কারণ সিনেমা তো আমাকে অনেক কিছু দিয়ে ফেলেছে, যার কারণে আমি সেখান থেকে বের হতেও পারছি না। না হয় আমি শুধু নাটক করতাম, যেটা সিনেমার চাইতে ফাইন্যান্সিয়ালি অনেক সাউন্ড জায়গা।’

চলচ্চিত্রের সাময়িক সংকট কেটে যাবে বলে মনে করেন এই অভিনেতা। তিনি বলেন, ‘তারপরও আমি সিনেমার জন্য স্যাকরিফাইস করেই যাচ্ছি। দেখি সিনেমার জায়গা আগের মত ফাইন্যান্সিয়ালি সাউন্ড হয় কি না। আর এতে করে যদি আমার দর্শক কমে যায়, এটা একদম তাদের পয়েন্ট অব ভিউ। আমি ভাবছি এমন একটা সময়ে ওইরকম একটা গল্প আসবে, যেটা ইন্ডাস্ট্রির পরিবর্তনের জায়গা তৈরি করবে। আর সেই গল্পটাতেই আমি অভিনয় করব।’

এদিকে আনিসুর রহমান মিলন অভিনীত ‘রাত্রির যাত্রী’ ছবিটি ১৪ ডিসেম্বর দেশজুড়ে মুক্তি পাচ্ছে। এটি নির্মাণ করেছেন হাবিবুল ইসলাম হাবিব। এ ছাড়া সম্প্রতি তিনি ‘ইন্দুবালা’ ও ‘ডনগিরি’ ছবির কাজ শেষ করেছেন। আর ‘লীলাবতী’ নামে আরেকটি ছবির শুটিং চলছে।

প্রিয় বিনোদন/গোরা 

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

মন ভালো নেই ববিতার

প্রিয় ২২ ঘণ্টা, ৩০ মিনিট আগে

loading ...