নীলফামারীর চৌরঙ্গী মোড়ে উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

১৩ ডিসেম্বর বিজয়ের পতাকা উড়েছিল নীলফামারী ও বগুড়ায়

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ভোরে নীলফামারী এবং বিকেলে বগুড়া শত্রুমুক্ত হয়।

আয়েশা সিদ্দিকা শিরিন
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২০ আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২০
প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২০ আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:২০


নীলফামারীর চৌরঙ্গী মোড়ে উত্তোলিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) আজ ১৩ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল নীলফামারী ও বগুড়া। এই দুই জেলায় উড়েছিল বিজয়ের পতাকা।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ফজলুল হক জানান, বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালে ছাত্র-জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তির সংগ্রামে। মিটিং-মিছিল আর সভা-সমাবেশের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দেশ মাতৃকা রক্ষার আন্দোলন। মহকুমা শহরের অস্ত্রাগারে রক্ষিত অস্ত্র ছিনিয়ে এনে নীলফামারীর বড় মাঠে শুরু হয় অস্ত্র হাতে নেওয়ার প্রশিক্ষণ।

এরপর ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ছয় নম্বর সেক্টরের অধীনে অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। ৯ মাসের গেরিলা আক্রমণ আর সম্মুখ যুদ্ধে জেলার ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা, কিশোরগঞ্জ উপজেলা মুক্ত করে তারা এগিয়ে আসেন নীলফামারী শহরের দিকে। ১৩ ডিসেম্বর ভোরে হানাদার মুক্ত হয় নীলফামারী।

নীলফামারীর চৌরঙ্গী মোড়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন

১২ ডিসেম্বর রাতে নীলফামারী শহরের চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল আক্রমণ করে। হানাদার বাহিনী পরাজিত হয়ে শহর ছেড়ে আশ্রয় নেয় সৈয়দপুর সেনানিবাসে। ১৩ ডিসেম্বর ভোরে জেলা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে উত্তোলন করেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। সে সময় বীর যোদ্ধাদের ‘জয় বাংলা’ শ্লোগানে রাস্তায় নেমে আসেন মুক্তিকামী সকল শ্রেণি পেশার জনতা। বিজয়ের উল্লাস আর শ্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন সে সময়ের মহকুমা শহর।

দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের উদ্যোগে গ্রহণ করা হয়েছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে রয়েছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্সের সামনে জাতীয় ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পতাকা উত্তোলন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ এবং বিজয় শোভাযাত্রা।

এ ছাড়া জেলা সম্মেলন কক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচিতে অংশ নিবেন মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান, জেলা প্রশাসনসহ সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

বগুড়ার বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার।
বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে নির্মিত হয় বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার। ছবি: সংগৃহীত

বগুড়ায় মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাক সেনারা

নভেম্বরের শেষ দিকে সারিয়াকান্দি থানা প্রথম হানাদার বাহিনী মুক্ত হওয়ার পর একে একে বগুড়ার সোনাতলা, গাবতলী, শিবগঞ্জ, ধনুট, শেরপুর। ১২ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয় আদমদিঘী। এর পর ১৩ ডিসেম্বর একসঙ্গে বগুড়া সদর, কাহালু, নন্দীগ্রাম, দুপচাঁচিয়া থানায় হানাদারদের পতন ঘটে।

সেই দিনের সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেওয়া মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ভোর থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা বগুড়াকে শত্রু মুক্ত করার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এ জন্য তারা শহর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তরে নওদাপাড়া, চাঁদপুর ও ঠেঙ্গামারা এলাকায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেন।

পরে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর ৬৪ মাউন্টেন্ট রেজিমেন্টের বিগ্রেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার প্রেম সিংহের নেতৃত্বে ট্যাংক নিয়ে তারা শহরের দিকে অগ্রসর হন। ওই সব এলাকার অসংখ্য যুবকও সেদিন তাদের সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।

১৯৭১ সালের ১৩ ডিসেম্বর এইদিন বগুড়ায় তখন বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা। ১৩ ডিসেম্বরের আগে ১০ ডিসেম্বর থেকে হানাদার বাহিনির সাথে মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী কাধে কাধ মিলিয়ে মরণ কামড় দিয়েছিল। আকাশে মিত্র বাহিনীর বোমারু বিমান, মাটিতে মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর অভিযানে দিশেহারা পাক হানাদার বাহিনীর কোনঠাসা হয়ে পড়ে।

অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ ডিসেম্বর শহরের ফুলবাড়ী ও পৌর পার্ক এলাকায় পাক বাহিনীকে পরাস্ত এবং আত্মসমর্পণে বাধ্য করার মধ্য দিয়ে বগুড়াকে হানাদার মুক্ত করে।

সবুর সওদাগরের দলের মুক্তিযোদ্ধা সদস্য বদরুল আলম মুন্নু জানান,  মাগরিবের নামাজের পর ফটকি ব্রীজের কাছে মিত্র বাহিনী তাদেরকে পাক হানাদার বাহিনীর নিহতদের লাশ ও আহতদের পৃথক করতে বলে। সেখানে পাক বাহিনীর ৩৭ জনের মৃতদেহ এবং ১৩৭ জনকে আহত অবস্থায় পাওয়া যায়।

মুন্নু আরও জানান, ১৩ ডিসেম্বর বিকালে বগুড়া শহর হানাদার মুক্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে পাক হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে বলে সংবাদ পাওয়া গেলে বগুড়াবাসী সহ মিত্র বাহিনীর শিবিরে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।১৪ ডিসেম্বর সকালে তারা জনশূন্য শহর দেখতে পান।

১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে শহরের বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে বাবুরপুকুর নামক স্থানে ধরে নিয়ে গিয়ে ১৪ জনকে গুলি করে হত্যা করেছিল হানাদার বাহিনী। সেই সব শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেখানে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। ফুলবাড়ীতে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয়ের স্মরণে ২০০৫ সালে ‘মুক্তির ফুলবাড়ী’ নামে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।

শহরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত হয়েছে বীরশ্রেষ্ঠ স্কয়ার। প্রাচীন সভ্যতার ঐতিহাসিক নগরী মহাস্থানগড় খ্যাত বগুড়া মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও অনেকটা স্থান জুড়ে রয়েছে। আগামী প্রজন্মকে সেই ইতিহাস সঠিকভাবে জানাতে প্রয়োজন একটি সমৃদ্ধশালী সংগ্রহশালা বা মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘর প্রতিষ্ঠা। এমনটাই দাবি এ অঞ্চলের মানুষের।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...