কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক। ছবি: প্রিয়.কম

কারা ফটকে স্বজনদের আকুতি

সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন থানায় ‘নাশকতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে’ গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে গ্রেফতারকৃতদের সঙ্গে দেখা করতে অবস্থান নেওয়া স্বজনরা জানিয়েছেন তাদের কথা।

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৪০ আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৪০
প্রকাশিত: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৪০ আপডেট: ২৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৪০


কেরানীগঞ্জে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটক। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) ‘আমার স্বামী তো ভ্যান চালাইতো। আর কিছু করত না। তাকে একদিন পুলিশ বাসা থাইক্যা ধইরা নিয়া গেল। পরে শুনি, ওরে নাকি মামলা দিয়া চালান দিছে। কিচ্ছু পায় নাই, উল্টা বড়ি ঢুকায় দিয়া কইছে, হেয় নাকি মাদকের ব্যবসা করে।’—কথাগুলো বলছিলেন মাদকের মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা লিটন মিয়ার (৩০) স্ত্রী মুক্তা বেগম। 

লিটনের স্ত্রী মুক্তার অভিযোগ, তার স্বামীর কোনো দোষ নেই, থানায় কোনো মামলাও নেই। তারপরও তাকে পুলিশ ধরে থানায় নিয়ে যায় এবং মাদকের মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠায়।

২৫ ডিসেম্বর, মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে গেলে লিটনের স্ত্রী, তার মা ও স্বজনরা অপেক্ষা করছিলেন লিটনকে দেখার জন্য।

মুক্তা বেগম জানান, লিটন মিয়া কুমিল্লার হোমনা উপজেলার তুলাতুলি শিবনগর গ্রামের সুরুজ আলীর ছেলে। এক মেয়ে ও স্ত্রী মুক্তাকে নিয়ে ঢাকার শ্যামবাজারে থাকেন এবং সেই এলাকায় ভ্যান চালাতেন। ৫ নভেম্বর লিটনকে আটক করে পুলিশ। এরপর তাকে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠালে তার ঠিকানা হয় কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার। তবে এখন পর্যন্ত তার মামলায় লড়ার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো আইনজীবী নিয়োগ করা হয়নি। এ কারণে কবে এবং কখন তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পাবেন, তা জানেন না তার স্ত্রী ও পরিবারেরর সদস্যরা।

ভ্যান চালিয়ে যা আয় হতো তার কিছুটা লিটন গ্রামে বাবা-মাকে পাঠাতেন বলে জানান তার মা পশরা বেগম। তিনি বলেন, ‘এখনো উকিল ধরি নাই। যাওয়া-আসাতেই অনেক টাকা খরচ হইল। বাবা আমার পোলাটার কি দোষ আছিল কন তো!’

শুধু লিটন নয়, লিটনের মতো আরও অনেকের ঠিকানা এখন কেন্দ্রীয় কারাগার। তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, রাজনীতি না করলেও বা কোনো অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকলেও পুলিশ বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার দেখিয়েছে। আর স্বজনরা তাদের প্রিয় মুখখানি দেখা অথবা তাকে একটু খাবার দেওয়ার জন্য। কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকের সামনে কথা হয় এমন ভুক্তভোগী কয়েকজনের সঙ্গে।

ওয়ারী এলাকা থেকে আসা এক ২৫ বছর বয়সী এক নারী নাম প্রকাশ না করা শর্তে অভিযোগ করেন, তার স্বামী জাকির হোসেন ঝালাইয়ের কাজ করতেন। ৯ ডিসেম্বর তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে তাকে একটি মামলা দিয়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। সেদিনের পর থেকে জাকিরের ঠিকানা কারাগার। স্বামীকে একনজর দেখতে এসেছেন তিনি। এ সময় তার সঙ্গে ছিল ছোট মেয়ে লাবিবা ও জাকিরের শাশুড়ি। সকাল থেকে দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর দুপুরের দিকে টিকেট কেটে অনুমতি পান স্বামীর সঙ্গে দেখার করার।

ওই নারী জানান, তার স্বামী জাকিরকে কেন আটক করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তবে জানতে পেরেছেন, জাকিরকে সন্দেহজনক কারণে আটক করা হয়েছে। স্বামী কবে ছাড়া পাবেন, আর কবে থেকে তার সংসারে আয়ের চাকা সচল হবে তাও অজানা তার।

দরিদ্র হওয়ার কারণে তিনি উকিলও ধরতে পারেনি তিনি। বেশ আক্ষেপ নিয়েই বলেন, ‌‘দেখি কত দিনে বের হয়। তার তো কোনো দোষ নাই। পুলিশ হুদাই ধইরা মামলা দিছে। আগে তার নামে কোনো মামলাও আছিল না।’

রাজীব সরকার (২২) মিরপুর বাঙলা কলেজের স্নাতকের ছাত্র এবং গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ সদরে। ১২ নভেম্বর তাকে আটক করে রুপনগর থানা পুলিশ। তার কোনো মামলা ছিল না দাবি করেন তার বড় ভাই ফারুক হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আটকের পর অন্য একটি পুরনো রাজনৈতিক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়।

ফারুকের দাবি, তার ভাই রাজীব কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। এমনকি বাঙলা কলেজে পড়াশোনা করলেও রাজীব টিউশনি ও পড়াশোনা নিয়েই ব্যস্ত থাকত।

সাম্প্রতিক সময়ে আটকের বাইরেও কয়েকজনকে পাওয়া যায়, যারা গ্রেফতার হয়েছেন বছরেরও বেশি সময় আগে। এমনই একজন কেরানীগঞ্জের ধলেশ্বর এলাকার আসলাম (৩০)। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা আসলামের স্ত্রী সুমী বেগম অভিযোগ করেন, তার স্বামী পেশায় ঝালাইম্যান ছিলেন। দােকানে কাজ করার সময় তাকে ধরে নিয়ে যায় কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পুলিশ। পরে ইয়াবার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি তার স্বামীকে দেখতে আসেন।

সুমী জানান, সন্তান যখন তার পেটে তখনই গ্রেফতার হন আসলাম। তার ছেলে আয়ানের এখন বয়স দুই বছরের কাছাকাছি।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের রনি মিয়া (২২) স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, রনি এলাকায় ব্যবসা করতেন। ১৯ নভেম্বর তাকে চুনকুটিয়া এলাকা থেকে আটক করে কেরানীগঞ্জ মডেল পুলিশ। আয়েশা অভিযোগ করেন, রনির নামে থানায় কোনো মামলা ছিল না। পরে তাকে কি মামলা দেওয়া হয়েছে, তাও জানতে পারেননি তিনি।

বাগেরহাটের ফকিরাহাটের আবু তালেব রাজধানী ঢাকায় বাসের হেলপারি করতেন। ২৯ নভেম্বর বাসে থাকা দুজন যাত্রীর কাছ থেকে মাদক উদ্ধার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। সেদিন তাদের সঙ্গে তালেবকেও আটক করা হয় বলে অভিযোগ করেন তার বোন হিরা আক্তার।

তালেবের দুলাভাই সুমন জানান, তালেব পরিবারের সঙ্গে রাগ ঢাকায় এসেছিলেন। বাসে হেলপারি করতেন। তার কাছে কোনো মাদক না পাওয়া গেলেও তাকে সন্দেহজনকভাবে ধরে পুলিশ চালান করে দেয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাভারের অ্যাম্বুলেন্সচালক সোহেল রানার (৩০) স্ত্রী আছিয়া বেগম জানান, ১৬ ডিসেম্বর সাভারের একটি ক্লিনিক থেকে রোগীকে বাসায় পৌঁছে দেন। রোগীর দুই স্বজন তাদের কেরানীগঞ্জ পৌঁছে দিতে বলেন ভাড়ার বিনিময়ে। কেরানীগঞ্জ যাওয়ার পথে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সদস্যরা গাড়ি তল্লাশি করে দুই যাত্রীর ব্যাগে ফেনসিডিল পায়। ওই সময় দুই যাত্রীসহ চালক সোহেলকেও আটক করা হয়।

আছিয়া বেগম অভিযোগ করেন, সোহেলকে আটকের পর নেওয়া হয় কদমতলী ডিবি কার্যালয়ে। সেখান থেকে তার শাশুড়ির ফোনে প্রথমে একজন ফোন করেন এবং তাকে ছাড়িয়ে নিতে দেড় লাখ টাকা দিতে হবে বলে জানান। পরে তিনি ও তার শাশুড়ি অনেক কষ্ট করে ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন। কিন্তু ১৫ হাজার টাকায় সোহেলকে ছেড়ে দিতে রাজি হননি টাকা দাবি করা ব্যক্তি। এরপর তাকে মাদক মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ করেন আছিয়া।

আছিয়া বলেন, ‘তাকে (সোহেল) ধরার কয়েকদিন আগে আমার অপারেশন হয়েছে। সেই অবস্থা নিয়াই দৌড়াচ্ছি।’

সার্বিক বিষয়ে পুলিশের সদর দফতরের মিডিয়া বিভাগের পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘পুলিশের কাছে যদি কোনো সুনির্দিষ্ট বা সুনিশ্চিত অভিযোগ আসে, তাহলে পুলিশ সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য। এখন সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাদের আটক করা হয়েছিল কি না এবং কোনো প্রকার অভিযোগ ছাড়াই যদি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে তবে সেটি একটি বিষয়।’

‘এমন একটি বিষয়ে সুষ্পষ্ট অভিযোগ আসলে অবশ্যই আমরা সেটি গুরুত্ব সহকারে দেখব। যারা বলেছেন, তারা নির্দোষ এবং পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। আমরাও বলি, নির্দোষ কারো বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই এবং সেটাকে কোনোভাবে আমরাও উৎসাহিত করি না। সেই সুযোগও নেই। সুস্পষ্ট কোনো তথ্য প্রমাণ যদি আমরা পাই, তবে যারা (যে পুলিশ সদস্যরা) মামলা করেছেন তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’

যাদের গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে, তাদের অনেকেরই আইনি লড়াইয়ের সামর্থ নেই—বিষয়টি জানালে সোহেল রানা বলেন, ‘এমন কাজ কোনো পুলিশ সদস্যের করার কথা না। যিনি অভিযোগ করেছেন, তার অভিযোগ করার অধিকার আছে। তার কাছ থেকে সুস্পষ্ট তথ্যাদি পেলে ওই কেস ধরে আমরা একটা সমাধান দিতে পারি। যারা অভিযোগ করেছেন তাদের তথ্যগুলো আমাদের দরকার।’

২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত কতজন আটক বা গ্রেফতার হয়েছেন এবং কতটি মামলা হয়েছে—এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতর কোনো ধরনের তথ্য দিতে পারেনি। জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা ব্যস্ততায় থাকায় সমন্বিত তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান সোহেল রানা।

পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মাসুদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় কারাগারের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসহ সারা দেশের কারাগারে মোট বন্দীর ধারণ ক্ষমতা ৩৬ হাজার ৬১৪ জন। কিন্তু তার বিপরীতে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত রয়েছে ৯১ হাজার ৪৭৬ জন কারাবন্দী।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...