মাশরাফি বিন মুর্তজার নির্বাচনি প্রচারণার কিছু খণ্ডচিত্র। ছবি: প্রিয়.কম

মাশরাফিকে দেওয়া সমর্থন এখন ‘উন্মাদনা’

শুধু নড়াইলের লোকজনই নন, ক্রিকেট দিয়ে ১৬ কোটি মানুষের ভালোবাসা কুড়ানো মাশরাফির সমর্থনে কক্সবাজার, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকা থেকে অনেকেই নির্বাচনি প্রচারণায় নড়াইলে এসেছেন।

শান্ত মাহমুদ
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:২৮ আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:২৮
প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:২৮ আপডেট: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৫:২৮


মাশরাফি বিন মুর্তজার নির্বাচনি প্রচারণার কিছু খণ্ডচিত্র। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম, নড়াইল থেকে) সবুজ জমিনের বুকে মাটির প্রলেপ সদৃশ ২২ গজের সঙ্গে তার সবচেয়ে বড় সখ্য। হাজারো বাধা আর হাঁটুতে সাতটি অস্ত্রোপচার থাকা সত্ত্বেও বারবার ছুটে গেছেন ওই ২২ গজে। বল হাতে তুলেছেন ঝড়, ভেঙে দিয়েছেন প্রতিপক্ষের দুর্গ। মাশরাফি বিন মুর্তজা, বাংলাদেশের ক্রিকেটের আরেক নামও বলা যায়।

লাল-সুবজ জার্সি গায়ে চাপিয়ে ১৮ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলে আসা সেই মাশরাফি এবার পা ফেলেছেন রাজনীতিতে। এ এক নতুন মাঠ। ক্রিকেট মাঠের সঙ্গে এই মাঠের কোনো মিল নেই। লড়াইটা ব্যাট-বলের নয়, ভোটের। লড়াই এবার নির্বাচিত জনপ্রতিনধি হতে সাধারণ মানুষের সমর্থন নিজের পক্ষে আনার।

মাঠের নায়ককে রাজনীতির মাঠে পাওয়ায় নড়াইলের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনার কমতি নেই। রাজনীতিতে নামার ঘোষণা দেওয়ার পরই হাজারো তরুণ পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মাশরাফির সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়ে উঠেছেন নড়াইল বদলে দেওয়ার গান।

রাজনীতিতে নামার শুরু থেকেই নড়াইলের একটা বড় জনগোষ্ঠীর সমর্থন ছিল বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়কের জন্য। সেটা ক্রমেই বেড়েছে। আর নির্বাচন ঘনিয়ে আসতে সেই সমর্থন যেন রূপ নিয়েছে উন্মাদনায়। নড়াইলে ঢুঁ মারলে সেটা মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যে কারো কাছে।

মাশরাফিকে রাজনীতির মাঠে পেয়ে উচ্ছ্বসিত অনেকে। ছবি: প্রিয়.কম

প্রিয় খেলোয়াড়কে রাজনীতির মাঠে স্বাগত জানাতে স্থানীয়দের চেষ্টার শেষ নেই। ঘরের ছেলেকে সমর্থন দিতে নড়াইলের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছেন স্থানীয়রা। এসব মানুষের এমন পদচারণায় নড়াইলের সবখানেই এখন উৎসবের আমেজ।

যাকে নিয়ে এত আয়োজন, হইচই আর উচ্ছ্বাস ছুঁয়ে যাওয়া অনুভূতি, সেই মাশরাফি সেভাবে আঁটসাট বেঁধে অবশ্য ভোটযুদ্ধে নামতে পারেননি। ক্রিকেটকে জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ বানিয়ে ফেলা মাশরাফি উইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ শেষ করেছেন ১৪ ডিসেম্বর। নড়াইলে এসেছেন ২২ ডিসেম্বর।

মাদরাসা ছাত্রদের ভালোবাসায় সিক্ত মাশরাফি। ছবি: প্রিয়.কম

নির্বাচনের মাত্র সাত দিন আগে কেন আসা? এই সময়ের মাঝে নির্বাচনি প্রচারণা কতটাই বা চালানো সম্ভব? এ নিয়ে অবশ্য মাশরাফির ব্যাখ্যা খুবই সোজা, ‘এই নড়াইলেই জন্ম আমার। আমার ছেলেবেলা, কৈশোর, সব এখানেই। এরপর ক্রিকেটের মাঠে পেরিয়ে দেওয়া আমার ১৮ বছর সম্পর্কেও এখানকার মানুষ জানে। নিজেকে নতুন করে চেনানোর কী-ই বা আছে আর? আমি যেমন এখানকার সব চিনি-জানি, তেমনি এখানকার সবাই আমাকে সেভাবেই জানে।’

তবুও রাজনৈতিক কিছু দায়বদ্ধতা থাকে। এ কারণে ২৩ ডিসেম্বর থেকে পথসভা করে যাচ্ছেন মাশরাফি। সেটারই অংশ হিসেবে ২৪, ২৫ ও ২৬ ডিসেম্বর পথসভায় অংশ নিয়েছেন তিনি। ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নড়াইলের প্রায় ৪৫টি স্পটে পথসভা করেছেন নড়াইল-২ আসনের এই সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী। ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৫৯৮ ভোটার সংখ্যার নড়াইলের এসব প্রতিটি জায়গায় মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন তিনি।

ভাই মোরসালিন বিন মুর্তজার বাইকে নির্বাচনি এলাকা ঘুরছেন মাশরাফি। ছবি: প্রিয়.কম

নড়াইলে এখন উৎসব। এ উৎসব ভোটের, এ উৎসব মাশরাফিকে জিতিয়ে সংসদে পাঠানোর। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নড়াইলে এমন উৎসব সাজ এবারই প্রথম। এরআগে কখনও নির্বাচনকে ঘিরে এমন উৎসব নেমে আসেনি নড়াইলে। ৬০ বছর বয়সী একজন বললেন, ‘যা দেখছেন এটা আমাদের মাশরাফির জন্যই। নড়াইলে আগে এমন কখনই হয়নি।’

রাস্তার মোড়ে মোড়ে গণজোয়ার দেখা গেছে। মাশরাফির আসার খবরে আগেই রাস্তার পাশে ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। কেউ কেউ বলছেন, ‘মাশরাফিকে এত দিন টিভিতে দেখেছি। এবার সামনে থেকে দেখার সুযোগ পেলাম। আমাদের হিরার টুকরাকে দেখে প্রাণ জুড়ালাম। আর সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মাশরাফিকে নয়, আমরা দেখলাম আমাদের কৌশিককে।’ মাশরাফিকে মালা পরিয়ে এক তরুণীর সে কি উচ্ছ্বাস। দৌড়ে মায়ের কাছে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা তার।

নির্বাচনি পথসভা করছেন মাশরাফি। ছবি: প্রিয়.কম

মাশরাফির স্ত্রী সুমনা হক সুমির বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়ায়। এখানকার মানুষদের কাছে ‘জামাই আদর’ পাচ্ছেন মাশরাফি। লোহাগড়ার পথসভায় মাশরাফির সঙ্গে হাজির হয়েছিলেন তার স্ত্রী। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতাও দিয়েছেন। যেখানে তিনি বলেন, ‘মাশরাফির জন্য এখানে আমাকে ভোট চাইতে আসতে হবে, সেটা আমি কখনও ভাবিনি। তবে এখনো ভোট চাচ্ছি না। ও (মাশরাফি) আপনাদের জামাই। ভোট দিয়ে ওকে জেতানোর দায়িত্ব আপনাদের।’

মাশরাফির আসার খবরে রাস্তার পাশে ফুলের মালা নিয়ে দাঁড়িয়ে যান বিভিন্ন অনেকে। ছবি: প্রিয়.কম

ভোটাররা মাশরাফির চোখ দিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। তাদের দাবি, অবহেলিত নড়াইলে এবার উন্নয়ের ছোঁয়া লাগবে মাশরাফির হাত ধরে। ভিক্টোরিয়া কলেজের অনার্স পড়ুয়া  হায়দার আলী বলেন, ‘মাশরাফির সংসদ সদস্য হওয়া মানে নড়াইলের উন্নয়ন নিশ্চিত। এবার নড়াইল আর অবহেলিত থাকবে না। আমাদের সুদিন আসতে যাচ্ছে।’

পথসভায় মাশরাফি। ছবি: প্রিয়.কম

নড়াইলের বাইরে কক্সবাজার, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, ঢাকা থেকে মানুষ এসেছে প্রিয় তারকার নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে। এদের মধ্যে একজন সাখাওয়াত হোসেন। বগুড়ার সরকারি আজিজুল হক কলেজের অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্র বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই আমি মাশরাফি ভাইয়ের ভক্ত। উনি নতুন লড়াইয়ে নাম লিখিয়েছেন। এই লড়াইয়েও আমি উনার পাশে আছি। মাশরাফি ভাইয়ের জন্য দূরত্ব কোনো ব্যাপারই না।’

মাশরাফি সমর্থন জানাতে বগুড়া থেকে নড়াইল ছুটে আসা সাখাওয়াত হোসেন। ছবি: প্রিয়.কম

চন্ডীবরপুর গ্রামে গিয়ে পাওয়া গেল মাশরাফির আরেক ভক্তের। রাহাত নামের এক কলেজ ছাত্র মাশরাফিকে সমর্থন দিতে শরীরের অর্ধেকজুড়ে রঙ করেছেন। তাতে ইংরেজিতে লেখা ‘ভোট ফর মাশরাফি।’ শরীরের পেছনে নৌকা আঁকা। মাশরাফিকে নিয়ে রাহাতের ভালোলাগাটা এমন, ‘ক্রিকেট বলতে আমি মাশরাফিকে বুঝি। সে এবার ভোটে দাঁড়িয়েছে। এখানেও থাকব তার পাশে।’

মাশরাফিকে সমর্থন দিচ্ছেন চন্ডীবরপুর গ্রামের রাহাত। ছবি: প্রিয়.কম

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদের এই এলাকায় এসে দেখা হয়ে গেল মাশরাফির বিশেষ এক ভক্তের সঙ্গে। তিনি এসেছেন কক্সবাজার থেকে। ২০১৬ সালে মিরপুরে বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচের কথা মনে থাকলে, চেনা সম্ভব এই ভক্তকে। ম্যাচ চলাকালীন সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে মাঠে ঢুকে মাশরাফিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন মেহেদী হাসান নামের এই ভক্ত। তার ভাষায়, ‘মাশরাফি ভাই যেখানে, আমিও সেখানে। দল বা প্রতীক আমার কাছে কিছুই না। ওনার পাশে থাকতে পারলেই শান্তি।’

৩০ ডিসেম্বর ভোটের আগে এমন অনেক ভক্ত-অনুরাগীকে পাশে পাচ্ছেন একাদশ সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অভিষেক হতে যাওয়া মাশরাফি। মাশরাফিও এই ভালোবাসার সম্মান জানাতে চান অবহেলিত নড়াইলের জন্য নিজের মেধা-শ্রম-কষ্ট ব্যয় করে। তবে নড়াইলবাসীকে সেবার করার সুযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়ার জন্য তাকে অপেক্ষা করতে হবে আগামী ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

প্রিয় খেলা/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

‘আমরা জয়ী হবই’

প্রিয় ৬ ঘণ্টা, ৫৭ মিনিট আগে

loading ...