নারী উবার চালক শাহনাজ। ছবি: প্রিয়.কম

‘আগে বাইকটা হাতে পাইয়া লই, তারপর ভালো থাকা’

শাহনাজ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এখনো ভালো নাই স্যার, আগে বাইকটা হাতে পাইয়া লই।’

জনি রায়হান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪২ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪৩
প্রকাশিত: ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪২ আপডেট: ১৬ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪৩


নারী উবার চালক শাহনাজ। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) উবারে বাইক চালিয়ে দুই সন্তানসহ জীবিকা নির্বাহ করা নারী বাইকচালক শাহনাজ আক্তারের চুরি হওয়া স্কুটি মোটরবাইকটি উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দিনগত রাতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে স্কুটি মোটরবাইকটি উদ্ধার করা হয়।

বাইক উদ্ধারের পর খবরটি প্রিয়.কমকে জানিয়েছেন শাহনাজ আক্তার। তিনি বলেন, ‘স্যার, আমার বাইকটা পুলিশে উদ্ধার করছে। আমারে থানা থেকে ফোন করে ডেকেছে।’

হারানো বাইক ফেরত পাচ্ছেন, কেমন লাগছে জানতে চাইলে শাহনাজ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এখনো ভালো নাই স্যার, আগে বাইকটা হাতে পাইয়া লই’।

অপরদিকে শাহনাজ আক্তারের বাইক চুরির ঘটনাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছিলেন তেজগাঁও বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন।

বাইক উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি প্রিয়.কমকে বলেন, গত রাতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকা থেকে স্কুটি মোটরবাইকটি উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় প্রতারক জনিকেও আটক করা হয়েছে। এই বিষয়ে দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত জানানো হবে।’

নারী বাইকচালক শাহনাজের পরিচয়

সমাজে নানা ধরনের পেশা থাকতেও জীবিকা হিসেবে অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং বেছে নিয়েছিলেন রাজধানীর মিরপুর নিবাসী শাহনাজ আক্তার পুতুল। দিনে-রাতে অনায়াসে যাত্রী পরিবহন করতেন জীবন সংগ্রামী এই নারী। প্রায় দুই মাস ধরে স্মার্টফোনের অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মোটরবাইক চালাচ্ছেন শাহনাজ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে তিনি এরই মধ্যে পরিচিত হয়ে উঠেছেন।

রাজধানীর মিরপুরেই জন্ম শাহনাজের। বাবা নেই, মা আর বোনেরা আছেন। ২০০০ সালে প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন শাহনাজ। কিন্তু দাম্পত্য জীবন সুখের হয়নি, ছাড়াছাড়িও হয়নি। এ নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলতে চাননি। দুই মেয়েকে নিয়ে মা-বোনদের সহায়তায় দিন যাচ্ছিল তার। এক মেয়ে নবম ও এক মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। খুবই কষ্টে দিন যাচ্ছিল। অগত্যা বাইক নিয়ে পথে নেমে পড়েছেন জীবন সংগ্রামে। কিন্তু প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে গতকাল ১৫ জানুয়ারি (মঙ্গলবার) নিজের সেই একমাত্র উপার্জনের বাইকটি হারিয়েছিলেন তিনি।

যেভাবে চুরি হয়েছিল শাহনাজের বাইক

বাইক চুরির ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শাহনাজ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘গত পাঁচ দিন আগে জনি নামে একজনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি নাকি বাইকের পার্মানেন্ট ট্রিপ মারেন। উনি আমাকে বলতেছিলেন যে আপা আপনি পার্মানেন্ট ট্রিপ মারতে পারেন না? আমি বললাম, খুঁজি তো, আমি এগুলা পাই না ভাই। আপনার কাছে আছে নাকি? উনি বললেন, আমি তো পার্মানেন্ট মারি। জিজ্ঞেস করলাম, ভাই এটার সিস্টেম কী? উনি বলেন, উনি কয়েকজন ড্রাইভার ঠিক করে রাখেন। যখন স্যার-ম্যাডামদের সিরিয়াস দরকার হয় তখন তাদের ট্রিপ দেন। আমি বললাম, টাকা-পয়সা দেয় কীভাবে? বলে, ধরেন খামারবাড়ি থেকে উত্তরা এয়ারপোর্ট যাবেন আবার নিয়ে আসবেন। আসার পর আপনার ডিউটি শেষ। আপনাকে তেলের খরচসহ ১২০০ টাকা দিয়ে দেবে। বললাম, এ রকম হইলে তো ভালোই হয়। দুই ঘণ্টা সময় দিয়ে যদি আমার এক হাজার টাকা আয় হয় তবে আমার তো ভালো।’

শাহনাজ বলেন, ‘পরের দিনে উনি আমাকে ফোন দিয়ে বললেন আপনার গাড়ির কাগজের একটা কপি নিয়ে এসে আমার সাথে দেখা করেন। এরপর দুই দিন আগে আমি তার সাথে দেখা করে গাড়ির কাগজপত্র দিয়ে দেই।’

গতকালের ঘটনায় তিনি বলেন, ‘গতকাল সকালে আমি আমার বড় মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করাতে গিয়েছিলাম দুপুরে। এ সময় জনি (যিনি বাইকটি ছিনতাই করেছেন) আমাকে কয়েক বার ফোন দিয়েছে। আমি বললাম, ভাই কী হয়েছে। উনি বললেন, আপনার চাকরি হয়ে গেছে, আপনি দ্রুত বাইক নিয়ে খামারবাড়ি চলে আসেন। এরপর আমি খামারবাড়ি চলে আসি। তখন উনি অনেকটা রাগ করে আমাকে বলেন, আপনার আসতে এত দেরি হলো কেন? ম্যাডাম তো দেরি দেখে অন্য রাইডার নিয়ে চলে গেছেন। তবে উনি বললেন, যাক সমস্যা নাই, চাকরি হয়ে গেছে আপনার এই খামারবাড়িতে। তারপর উনি বললেন, আমাকে এখন অফিসের কাজে বিমানবন্দরে যেতে হবে। আপনি আমাকে নিয়ে চলেন। আপনার যে ভাড়া দৈনিক দেবার কথা সেটাই আপনি পাবেন।’

‘এরপর তিনি আমার বাইকে চড়ে বিমানবন্দরে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি তার ল্যাপটপের ব্যাগ আমার কাছে রেখে একটা অফিসে ঢুকে কী যেন কাজ করে আবার বের হয়ে এলেন। এসেই আমাকে বললেন চলেন এখানকার কাজ শেষ। এরপর আসার সময় তিনি আরও অন্য একটা অফিসে ঢুকে ১০ মিনিট কাজ করে বের হয়ে এলেন। বেলা ৩টার দিকে আবারও আমার বাইকে চড়ে খামারবাড়ি মোড়ে এলেন। এরপর তিনি অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে কাকে যেন ফোন করে বললেন দ্রুত আজকের বাইকের বিলের কাগজটা নিয়ে আসো তো।’

সেই বাইকে বসে শাহনাজ। ছবি: প্রিয়.কম 

‘ফোন রেখে দিয়ে তিনি আমাকে বললেন, চলেন চা খাই। আমরা সংসদ ভবনের সামনের টিঅ্যান্ডটি মাঠের পাশের একটা চায়ের দোকানে চা খাই। তারপর উনি আমাকে বললেন, চলেন কাওরান বাজারে যাব, একটা কাজ আছে। আপনি ভাড়া পাবেন। আমি বললাম, ভাই আমার গাড়িতে তো তেল নেই। উনি বললেন, সমস্যা নাই, আমি তেল কিনে দিচ্ছি। তখন আমি বাইকে চাবি দিয়ে চালাতে যাব, এমন সময় উনি বললেন, আপনাদের এই বাইক কীভাবে চালায় দেখি তো, বলে তিনি আমার বাইকে বসে ক্লাস চালু করলেন। আমি বললাম, আমার বাইকে এভাবে টানলে কাজ হবে না। এমন সময় উনি বাইকের ক্লাস টেনে জোরে একটা টান দিলেন। আর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফাঁকা রাস্তায় হাওয়া হয়ে গেলেন। আমি পাগলের মতো পিছনে দৌড়ালাম, কিন্তু তার আর দেখা পাই না। আমি দ্রুত তখন দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশকে বললাম। পুলিশ আমাকে থানায় পাঠাল। আমি থানায় গিয়ে একটা জিডি দায়ের করেছি।’

কাঁদতে কাঁদতে শাহনাজ আরও বলেন, ‘আমার দুইটা মেয়ের পড়ালেখা, আমার সংসার—সবকিছুই এই বাইকের উপার্জনের টাকায় চলে স্যার। আমার বাইকের টাকা এখনো শোধ করতে পারি নাই।’

যেভাবে উদ্ধার হলো চুরি হওয়া বাইকটি

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শাহনাজের বাইক চুরির ঘটনাটি জানার পর থেকেই বাইকটি উদ্ধারের জন্য সব ধরনের প্রযুক্তি ও কৌশলে কাজ শুরু করে পুলিশ।

শাহনাজের দেওয়া ঘটনার বর্ণনা অনুযায়ী ওই এলাকার বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পুলিশ। সেই সিসিটিভি ফুটেজে চোরের চেহারা দেখা গিয়েছিল। এরপর বাইকটি উদ্ধারের জন্য নানা দিকে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। সর্বশেষ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাতেই নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে বাইকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয় তারা। এ সময় বাইক চোর জনিকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...