অভিনেত্রী মৌসুমী। ছবি: শামছুল হক রিপন

রাজনীতির মৌসুমে যেমন মৌসুমী

একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন মৌসুমী।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:১৩ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:১৫
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:১৩ আপডেট: ১৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০১:১৫


অভিনেত্রী মৌসুমী। ছবি: শামছুল হক রিপন

(প্রিয়.কম) নায়িকা, গায়িকা, পরিচালক—সব পরিচয়েই সুনাম কুড়িয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রিয়দর্শিনী খ্যাত নায়িকা আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী। নতুন খবর হলো তিনি একাদশ জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হওয়ার জন্য মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

গতকাল (১৬ জানুয়ারি) দুপুরে ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

মনোনয়ন ফরম কেনার পরদিন (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসার কারণ ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন মৌসুমী।

তিনি জানান, রাজনীতিবিদ ও অভিনয়শিল্পীদের জীবনযাপন একইরকম। যদি সুযোগ পান অতীতের অভিজ্ঞতাগুলো রাজনীতিতে কাজে লাগানোর মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে সহযোগিতা করবেন।

এরপর বলেন, ‘রাজনীতিকে কখনোই আমি আলাদা করে দেখি নাই। আমাদের চলচ্চিত্রের শিল্পীদের লাইফস্টাইল আর রাজনীতিবিদদের লাইফস্টাইল একইরকম। শিল্পীদের জনগণ ও দর্শকদের পালস (হৃদয়) বুঝে চলতে হয়, জীবনযাপন করতে হয়্।’

‘রাজনীতিবিদদের ক্ষেত্রেও তাই। আমার ইচ্ছা ছিল যদি কোনোদিন বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি হয় তাহলে আমি নিজেকে যুক্ত করব। যেখানে বর্ষীয়ান নেতাদের পাশাপাশি যারা নতুন, তারাও কাজ করার সুযোগ পাবে।’

বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন এমন একটা সময় যারা কখনো রাজনীতি করেনি কিন্তু জনগণের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে জনগণের ভালোবাসা, কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তারা ইচ্ছে করলেই এখন জনগণের সেবা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা সেই পরিবেশটাও তৈরি হয়েছে।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাট্যাঙ্গনের বহু তারকা সরব ছিলেন। তবে সে সময় মৌসুমীকে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এত অল্প সময়ে একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থীতার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা আমার নিজের কাছেও মাঝেমধ্যে বিশ্বাস হয় না। তাই হয়তো অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে আমি হঠাৎ করেই কেন রাজনীতিতে এলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই প্রশ্নগুলো কেন? শিল্পী হিসেবে আমার বিচরণ সব জায়গাতেই থাকবে।’

‘আমি তো কাউকে কখনো বলিনি আমি কোন দল পছন্দ করি, কোন নেতাকে পছন্দ করি। কোন দলের হয়ে কাজ করতে চাই। আমি কখনোই এ বিষয়ে আমার অনুভূতি প্রকাশ করিনি। তাহলে এ প্রশ্ন কেন আসছে? আমি কোন দল করেছি, কোন দল করছি, কোন দল করব না। এটা তো আমার সিদ্ধান্ত।’

মৌসুমীর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যোগদানের খবর প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ রাজনৈতিক অঙ্গণের অনেক নেতাকর্মীদের উৎসুক তৈরি হয়। অনেককে ফেসবুকে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতেও দেখা গেছে।

রাজনীতিতে আসা এবং সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করার প্রসঙ্গে মৌসুমী বলেন, ‘আমার সিদ্ধান্ত আমি নেবো। সে অধিকার আমার আছে। কিন্তু অনেকেই বিষয়টা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। আমি বিনয়ের সাথেই বলতে চাই, প্রশ্ন তুলে আমার উৎসাহকে বাধাগ্রস্ত করবেন না। আমি ২০-২৫ বছর সততার সাথে ফিল্মে কাজ করছি। দর্শকদের ভালোলাগা-ভালোবাসাকেই প্রাধান্য দিয়েছি।’

‘যদি আমি প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে সংসদে যেতে পারি নিশ্চয়ই যে সেক্টরে কাজ করার সুযোগ আছে, সে রকম একটা জায়গায় কাজ করার দায়িত্ব পাব। সেটা ঠিকঠাকভাবে পালন করতেও পারব।’

রাজনীতিতে যোগদানের বিষয়ে তিনি তার দর্শক-ভক্তদের ভুল না বুঝতে আহ্বান জানিয়ে মৌসুমী বলেন, ‘আমার রাজনীতিতে আসার খবরে আমি মনে করি আমার ভক্ত-দর্শকদের ভুল বোঝার কোনো কারণ নেই। আমি দেশের জন্য কাজ করতে চাই।’

‘আমাদের দেশে এমনও নজির আছে, যারা কখনো রাজনীতি করেননি কিন্তু তারা রাজনীতিতে গিয়ে পরে অনেক ভালো করেছেন। যাদের মধ্যে সৎ চিন্তা আছে তারা চেষ্টা করলে যে কোনো জায়গায় ভালো করতে পারেন।’

গত কয়েকদিন আগে মৌসুমী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি ইন্টারভিউ (সাক্ষাৎকার) দেখেছেন। সেখানে তিনি বলেছেন, সংরক্ষিত ৫০টি আসনের সিলেকশন (মনোনীত) তিনি নিজে করবেন এবং সে মনোনয়ন প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ হবে। প্রধানমন্ত্রীর সে বক্তব্যই মৌসুমীকে রাজনীতিতে আসতে উৎসাহিত ও সাহসী করেছে।

প্রায় দুই শতাধিক বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই নায়িকা বলেন, ‘আমার মনে হয়েছে প্রধানমন্ত্রী যেহেতু এই প্রেক্ষাপটটি উন্মুক্ত করেছেন, তাই আমি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারি। তিনি যদি আমাকে যোগ্য মনে করেন, তাহলে আমাকে কাজে লাগাবেন। আমার তো ইচ্ছে আছে আমি একদিন সংসদ সদস্য হব।’

সুযোগ পেলে বাংলাদেশের নারীদের অধিকার ও তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কাজ করার কথা উল্লেখ করে মৌসুমী বলেন, ‘বাংলাদেশের নারীরা এখনো তাদের অধিকার বঞ্চিত। আমাকে যদি এই জায়গাটাতে কাজ করতে দেওয়া হয়। তাহলে আমি স্বাচ্ছন্ধ্যবোধ করব। কারণ আমি এ নিয়ে এর আগেও কাজ করেছি।’

বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই অভিনেত্রী বলেন, ‘অভিনয় থেকে পাওয়ার আর কিছু নেই। তারপরও আমি দর্শকদের মাঝে বেঁচে থাকার জন্য ভালো ভালো কাজ করার চেষ্টা করি।’

‘আমি জনগণের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি সেটা ধারণ করার ক্ষমতা আমার নেই। তারপরও যদি প্রতিদান দিতে হয়, তাহলে বিকল্প হিসেবে রাজনীতিই বেছে নিতে হবে।’

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস)-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে মৌসুমীর বিরুদ্ধে।

এ বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মৌসুমী বলেন, ‘আমি কখনোই কোনো দল করিনি। এটা নিয়ে কেউ যদি মাতামাতি করে, এটা তাদের সমস্যা। এটা কেয়ার করি না। আমার কিছু আসে, যায় না।’

‘আমার বয়স যখন ২৫-২৬ বছর তখন থেকেই আমি সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। যে দল জনগণের জন্য কাজ করছে। দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখছে সে রকম একটা দলের সঙ্গে আমি কাজ করার সুযোগ পেলে। কেন সে সুযোগ গ্রহণ করব না। আমি আমার জায়গা থেকে দর্শকদের ভালোবাসা, চলচ্চিত্রের সাপোর্ট পেয়ে আজকের মৌসুমী হয়েছি।’

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী প্রচারণায় কেন যাননি? এমন প্রশ্নে জবাবে মৌসুমী বলেন, ‘আমি এটুকু জানি আমি সব সময় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিয়েছি, তারা ডাকলে আমি তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। তবে আমি প্রচারণারটা ওভাবে বুঝি না। কারণ আমি কখনো দলের কর্মী হিসেবে কাজ করিনি।’

আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলীয় সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে গত ১৫ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু হয়। তা চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত। প্রতিটি মনোনয়নপত্রের জন্য নেওয়া হচ্ছে ৩০ হাজার টাকা।

নিয়ম অনুযায়ী একাদশ সংসদে আনুপাতিক হারে এবার আওয়ামী লীগ ৪৩টি, জাতীয় পার্টি চারটি, বিএনপি একটি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জোটভুক্ত হয়ে একটি আসন পাবে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ১৫ ও ১৬ জানুয়ারি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয় হতে সংরক্ষিত নারী আসনে এক হাজার ৫৭টি মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে।

এ ছাড়া চলচ্চিত্র অঙ্গণের আরও যারা মনোনয়ন ফরম কিনেছেন তাদের মধ্যে রয়েছে, অরুণা বিশ্বাস, রোকেয়া প্রাচী, অভিনেত্রী তারিন, সারাহ বেগম কবরী, সুজাতা, সুবর্ণা মুস্তাফা, অঞ্জনা, দিলারা, শমী কায়সার, শাহনূর, অপু বিশ্বাস ও জ্যোতিকা জ্যোতিসহ বেশ কয়েকজন।

আইন অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গেজেট প্রকাশের ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সে হিসাবে ১ এপ্রিলের মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

মৌসুমী অভিনীত প্রথম চলচ্চিত্র ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। চলচ্চিত্রের পাশাপাশি নাটক-বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেছেন। ২০০৩ সালের ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি তিনবার বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বোচ্চ সম্মাননা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।

প্রিয় বিনোদন/গোরা

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...