সচিবালয়। ফাইল ছবি

দুর্নীতির বিরুদ্ধে মন্ত্রীদের সতর্ক বার্তা

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা এতো বেশি বৃদ্ধি করে দিয়েছি, সে ক্ষেত্রে দুর্নীতি করার প্রয়োজন তো দেখি না।’

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:২৮ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:২৮
প্রকাশিত: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:২৮ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:২৮


সচিবালয়। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) একাদশ জাতীয় সংসদে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য হিসেবে শপথের পর মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীরা নিজ নিজ দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নব নির্বাচিত মন্ত্রীরা জঙ্গি-সন্ত্রাস, মাদক নির্মূলের পাশাপাশি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণের কথা বলেছেন। 

বিপুল সংখ্যাগরিষ্টতা পেয়ে হ্যাট্রিক বিজয়ের পর সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদের প্রায় সকল সদস্যই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার আওয়াজ তুলেছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের পাশাপাশি সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও মাদক নির্মূলের দৃঢ় অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

গত ১৮ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলের ইশতেহারে ঘোষণাকালে বলেছিলেন- জঙ্গিবাদ, মাদক এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অভিযান অব্যাহত থাকবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা হবে। আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তি চালুর মাধ্যমে দুর্নীতির পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে।

নির্বাচনের জয়লাভের পর ১৭ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দুর্নীতি রোধে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রয়োজন অনুসারে বাড়ানো হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা যে হারে বেতন বাড়িয়েছি। এমন উদাহরণ মনে হয় পৃথিবীর কোনো দেশে নাই।’

তিনি বলেন, ‘যে লক্ষ্য আমরা নিয়েছি তা পূরণ করার জন্য সুশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা দরকার। আমরা বেতন-ভাতা, সুযোগ-সুবিধা এতো বেশি বৃদ্ধি করে দিয়েছি, সে ক্ষেত্রে দুর্নীতি করার প্রয়োজন তো দেখি না।’

শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়েছি। তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধেও আমি জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা দিয়েছি।’

দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের যা বললেন

শপথ নেওয়ার পরপরেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করা হবে বলে প্রায় সকল নতুন মন্ত্রীই কড়া বার্তা দিয়েছেন। নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় থেকে সংবর্ধনা সর্ব জায়গায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দুর্নীতির বিষয়ে অভিন্ন বক্তব্য দিতে দেখা গেছে।

নিজ মন্ত্রণালয়ে প্রথম কর্মদিবসেই কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দিয়েছেন নতুন শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিভিন্ন দফতর ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সতর্ক করে শিল্পমন্ত্রী বলেন, ‘আগামী দিনে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কর্মকাণ্ডে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যাবে। কোনো অবস্থায়ই দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়া হবে না। প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একইসঙ্গে বিগত ১০ বছরে মন্ত্রণালয়ের সূচিত উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে হবে।’

‘দুর্নীতি দমন করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অন্যতম অঙ্গীকার। ইতোমধ্যে তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছেন। এবার আমরাও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সেই নীতির বাস্তবায়ন চাচ্ছি। সে ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের ভিত মজবুত করতে হলে দুর্নীতি দমনের কোনো বিকল্প নেই।’

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রশাসনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। আমার ধারণা, একাদশ জাতীয় সংসদ এ ব্যাপারে ভালো পদক্ষেপ নেবে। ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন অত্যন্ত শক্তিশালী হয়েছে, আগামীতে আরও শক্তিশালী হবে। সে ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ব্যবস্থা নিতে পারবে। আমাদের কাজে যদি কোনো অন্তরায় বা বাধা বা ত্রুটি থাকে তাহলে প্রথমে সেগুলো দূর করা হবে।’

সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মো. আশরাফ আলী খান বলেছেন, ‘আগে যা ছিল তা ভুলে যান। এখন নিজেদের শুধরে নিন। গতি ফিরিয়ে আনুন। দুর্নীতিতে সরকার এখন জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের ডেকে নিয়ে বসে প্রথম দিনেই বলেছেন “সন্ত্রাস-মাদক ও দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। গ্রাম ও শহরের বৈষম্য দূর করতে হবে। না হলে তোমাদের যেভাবে তৃণমূল থেকে তুলে এনেছি সেইভাবেই নিক্ষেপ করা হবে।” তাই এই বিষয়ে কোনো আপস চলবে না।’

বৃহস্পতিবার (১৭ জানুয়ারি) দুপুরে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রতিমন্ত্রী একথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘আমার ও আমার পরিবারের লোকজনের কাছ থেকে কোনো রকম তদবির বা অনৈতিক প্রস্তাব পাবেন না। আমার জীবনে আর চাওয়া–পাওয়ার কিছু নেই। যা না চেয়েছি, তার চেয়েও বেশি পেয়েছি। সে জন্য আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ায় তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। মানুষ ভালোবেসে আমাকে ভোট দিয়ে সাংসদ নির্বাচিত করায় তাদের প্রতি আমি ঋণী।’

যেই দুর্নীতি করুক তাকে ছাড় দেয়া হবে না বলে হুশিয়ারি দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। বুধবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের চলমান প্রকল্প নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।

রেজাউল করিম বলেন, ‘বাসস্থান জনগণের প্রতি দয়া নয়, তাদের অধিকার। সেই অধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করা যাবে না। আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতির বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে।’

সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করছে উল্লেখ করে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, ‘ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা ও কর্মচারী যদি দুর্নীতি করে থাকে, তাহলে তাদের বিচার ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদি আমিও দুর্নীতি করি, আমারো বিচার হবে।’

১৫ জানুয়ারি সাভারের খাগান এলাকায় একটি ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলনে যোগ দিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী আরও বলেন, ‘আমার মন্ত্রণালয় স্বচ্ছ থাকবে। কেউ দুর্নীতি করতে পারবে না। এমনকি আমিও যদি দুর্নীতি করে থাকি আমারও বিচার হবে। আমি মন্ত্রী হওয়ার পরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। তাই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের কাছ থেকে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সম্পদের হিসাব চেয়েছি।’

সাভার ও আশুলিয়াসহ সারা দেশে যারা নদী-নালা ও খালবিল দখল করেছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে সরকারি সম্পত্তি উদ্ধার করা হবে এবং ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান।

রেলে দুর্নীতির ঘটনা ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন। গত সোমবার (১৪ জানুয়ারি) রেলভবনে লোকোমোটিভ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি একথা বলেন।

রেলমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে, সে অনুযায়ী রেলকেও দুর্নীতিমুক্ত করা হবে।

শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সহযোগিতায় পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস রোধ সম্ভব বলে মনে করেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি। ১০ জানুয়ারি চাঁদপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি শিক্ষায় আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবার সহযোগিতা চান।

চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের পরিচিতি অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে। যাতে আগামীতে কেউ প্রশ্নফাঁসের মতো অপতৎপরতায় লিপ্ত হতে সাহস না পায়। এ ছাড়া প্রশ্নফাঁস রোধে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

গত ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ৬ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণ মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং তিনজন উপমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হয়। এর পরের দিন ৭ জানুয়ারি নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যগণ শপথ নেন।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...