২০০৭ সালে ওয়ে-ক্লিঙ্গার নবীন গবেষক পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক ইকবাল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

অধ্যাপক শেখ ইকবাল আহমেদ, দেশপ্রেম ও মমত্ববোধ

দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেও দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ এতটুকুও কমেনি। বাংলাদেশের ছাত্রদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার বাসনা থেকে দেশের প্রতি তার ভালোবাসার মাত্রাটুকু অনুমান করা যায়।

মোহাম্মদ কায়কোবাদ
অধ্যাপক, সিএসই বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৩৭ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৪১
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৩৭ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৩:৪১


২০০৭ সালে ওয়ে-ক্লিঙ্গার নবীন গবেষক পুরস্কার পেয়েছেন অধ্যাপক ইকবাল আহমেদ। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় চাকরিস্থল হওয়াটাই আমার জন্য বিশাল সৌভাগ্যের বিষয়। শুরুতে যখন আমাদের শিক্ষক স্বল্পতা ছিল, পাঠ্যপুস্তকের অভাব ছিল, অভাব ছিল ল্যাবরেটরি ও জায়গার, ওই দিনগুলোতে এইচএসসি পাশ করা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধার কথা জেনেও আমাদের বিভাগে ভর্তি হয়েছে। কেবল শেখার অদম্য আগ্রহকে পুঁজি করে এই নতুন প্রযুক্তির জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেছে। যদিও শুরুতে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের চাকরির জন্য তাদের পরিবর্তে অন্য অনেক বিষয়ের স্নাতকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছিল। তারপরও আমাদের স্নাতকেরা হতাশ হয়নি এবং নিজেদের যোগ্যতা উন্নত দেশসমূহে প্রমাণ করেছে। সবাই নানা পাবলিক পরীক্ষার মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে প্রমাণ করেছে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের ধারাবাহিকতা। এখন অবশ্য আমাদের ছেলেমেয়েদের আর এ রকম শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার সুযোগ নেই। কারণ মেধা তালিকাই এখন আর করা হয় না, পরে অসংখ্য ছেলেমেয়েরা অসন্তুষ্ট হয়। যদিও অন্য সকল প্রতিযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডেই অর্জনের জন্য প্রণোদনা, পুরস্কার ও প্রচারের ব্যবস্থা রয়েছে।

মনে পড়ে দ্বিতীয় বর্ষের দুজন ছাত্র অনু (এখন ইন্টেলে কর্মরত) এবং ইকবাল একদিন সিদ্ধান্ত নিলো, আমার যোগাড় করা যত গবেষণা পেপার আছে তা তারা সাজিয়ে রাখবে, যাতে পেতে সুবিধা হয়। প্রায় প্রতি টার্মে স্বতস্ফূর্তভাবে তারা এই কাজটি করত। অবশ্য বলাই বাহুল্য এই প্রাক-স্নাতক ছাত্ররা ওই গবেষণা পেপারগুলো পড়তও। যদিও পরীক্ষার ফলাফলে সে পড়ার অবদান থাকার কোনো সম্ভাবনা ছিল না। দ্বিতীয় ব্যাচের অতি মেধাবী ও নানা গুণে গুণান্বিত মঞ্জুর মোর্শেদের উপস্থিতিতে মেধার চর্চায় নব্য প্রতিষ্ঠিত বিভাগটি শুরু থেকেই নতুন মাত্রা যোগ করেছিল। মঞ্জুর মোর্শেদ বিদেশে অবস্থান করেও তার দেশের প্রতি সমাজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশে উদাহরণ তৈরি করেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাপ্ত গ্রেড মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমতুল্য গ্রেড হিসেবে গণ্য করার প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করেছে। যার ফলে শুধু আমাদের বিভাগের ছাত্ররাই নয়, দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সহজে মোনাশে ভর্তি হয়েছে, শ্রেয়তর মূল্যবোধ, অনুকরণীয় ব্যবহার ও মানবিকতা দিয়ে বাংলাদেশকে উঁচু আসনে বসিয়েছে। এতে আমাদের জাতীয় দিবসগুলোও অস্ট্রেলীয়দের অংশগ্রহণে প্রাণবন্ত হচ্ছে। মঞ্জুর মোর্শেদের সুবাদে মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গীপ্সল্যান্ড ক্যাম্পাসে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। দোতলায় বসানো অনার বোর্ডে সকল ছবিই বাংলাদেশিদের দেখে অবিভূত হয়েছিলাম।

সেই একই রকম অভিজ্ঞতা হলো এবার মার্কিন মুলুকে। উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের মিলওয়াকি শহরে যেখানে মার্কেট বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত। মার্কেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ অধ্যাপক ইকবাল আহমেদ আমাদের বিভাগের তৃতীয় ব্যাচের ছাত্র। কাডেহি হলের তিন তলায় ইউবিকম্প ল্যাব, যার পরিচালক ইকবাল। বেশির ভাগ ছাত্র বাংলাদেশের এবং তারা ভালোও করছে। আমেরিকাতে অধ্যাপকদের ফান্ডিংয়ের জন্য লড়তে হয়। গোটা দশেক প্রকল্প জমা দিলে একটিতে সাফল্য আসতে পারে। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে অধ্যাপক আহমেদ ফান্ড পান, যা অন্য সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্যও প্রযোজ্য। আর সেই ফান্ডের সুবাদেই আমাদের দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা মার্কেটে পড়ে। শুধু তাই নয় তার গবেষণার বিষয়বস্তুও বাংলাদেশের জন্য উপযোগী। যেমন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে কীভাবে স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া যায়। তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য ছাত্রদের অনেক সময়ই দেশে পাঠান তিনি। এতে রথও দেখা হলো, আবার কলাও বেচা গেল। তার ল্যাবের বাইরে দেয়ালে দেখলাম টিএ আর এদের অনার বোর্ড। বেশির ভাগ বাংলাদেশিদের ছবি ও নাম দেখে বুক গর্বে ভরে উঠল।

ইকবাল আমেরিকাতে এসেছে প্রায় সিকি শতাব্দী হয়ে গেল। তার সুবাদে মার্কিন মুলুকের মধ্যভাগে বাংলাদেশের একটি দ্বীপ হয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণালব্ধ কাজ দিয়ে পোস্টার করা হয়েছে, যাতে অতিথি ও ছাত্ররা চলমান গবেষণা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। সেগুলোতেও বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের আধিক্য দেখে মন ভালো হয়ে গেল। বেশির ভাগ সময়েই স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করে, যাতে করে তাদের পড়ালেখার জন্য বিভিন্ন স্থানে থাকার বিড়ম্বনা পোহাতে না হয়। কম্পস্যাক নামের নামকরা কনফারেন্সের তিনি কনফারেন্স চেয়ার। ২০০৭ সালে ওয়ে-ক্লিঙ্গার নবীন গবেষক পুরস্কার পেয়েছেন। শ’ দেড়েক প্রকাশনা ও দশের বেশি শ্রেষ্ঠ পেপারের পুরস্কারও পেয়েছেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে স্বাস্থ্যব্যবস্থায় অবদান রাখার জন্য সাতটি প্রকল্পের পরিচালক তিনি। এই বিষয়ের উপর ১৩টি পিএইচডি থিসিস এবং ৪৫টি মাস্টার্স থিসিস তত্বাবধান করেছেন, যার বেশির ভাগই বাংলাদেশের ছাত্রের। মার্কেট বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত, পরিসংখ্যান এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগটি দুভাগ করা হয়েছে। কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগটির প্রধান হিসাবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন।

এই বাংলাদেশি মেধাবীর ছেলেবেলাটা কী রকম কেটেছে, একটু পিছনে ফিরে তাকাই। তার বাড়ি খুলনা বিভাগের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানায়। তাদের বাড়ির কাছাকাছি কোনো স্কুল ছিল না, তাই তৃতীয় শ্রেণির আগে তার স্কুলে যাওয়ার সুযোগই হয়নি। তার বাবা থানা শিক্ষা অফিসার শেখ আব্দুল মালেক এবং মা মাজেদা বেগম বাসায় তাকে পড়াতেন। ছেলের শ্রেয়তর ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের জন্য এই বাবা-মার প্রয়াস ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। শ্যামনগর থানার নাকিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে তার পড়ালেখা শুরু। সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির পড়ালেখা হয় ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজে, যেখান থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় সম্মিলিত মেধা তালিকায় যথাক্রমে তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অধিকার করেন। এসএসসি পরীক্ষায় দুই গণিতে ২০০ নম্বর পেয়ে রেকর্ড করেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করে পাশ করেন।

দীর্ঘদিন বিদেশে থেকেও দেশের প্রতি তার মমত্ববোধ এতটুকুও কমেনি। বাংলাদেশের ছাত্রদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়ার বাসনা থেকে দেশের প্রতি তার ভালোবাসার মাত্রাটুকু অনুমান করা যায়। যে দেশের জনঘনত্ব পৃথিবীর গড় জনঘনত্বের ২৪ গুণ বেশি, তার যোগ্য সন্তানেরা অধ্যাপক ইকবাল আহমেদের মতো হবে, এটাই আমরা কামনা করি।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল না-ও থাকতে পারে।]