ফাইল ছবি

আওয়ামী লীগ-বিএনপির শরিকরা জোটের প্রতি অখুশী

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা বঞ্চণার অভিযোগ তুলছেন তাদের জোটের বিরুদ্ধে।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৮ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৮
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৮ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:০৮


ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) নতুন সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের পর থেকে ১৪-দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগ শরিকদের বিরোধী দলের ভূমিকায় দেখতে চাইলেও তাতে রাজি হচ্ছে না তারা। তবে ৩০ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর বিষয়গুলোর সমাধান হয়ে যাবে বলে আশা করছেন জোটের নেতারা। পক্ষান্তরে বিএনপি নেতৃত্বধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকরাও সন্তুষ্ট নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে প্রাধান্য দেওয়া এবং নানা বঞ্চনার দায়ভার বিএনপির উপরে দিচ্ছে শরিকরা। পুরোনো ভুলভ্রান্তি শুধরে জোটকে নিয়ে নতুন আঙ্গিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ শরিক দল। তবে বেশির ভাগই এই সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাওয়ার বিপক্ষে।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোট গ​ঠিত হয় ২০০৪ সালে। এরপর তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ আন্দোলন এবং পরপর গত তিনটি নির্বাচন একসঙ্গে করেছে। এর মধ্যে প্রথম দুই সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিক দলগুলোর একাধিক নেতাকে মন্ত্রী করা হলেও এবারের মন্ত্রিসভায় শরিকদের কাউকে রাখা হয়নি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের দূরত্বের সূত্রপাত সেখান থেকেই।

নতুন মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি শরিকদের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের। সর্বশেষ ১৯ জানুয়ারি, শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশেও বিদায়ী মন্ত্রিসভার দুই সদস্য ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ শরিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের দেখা যায়নি। যদিও ওই সমাবেশে যথাযথভাবে দাওয়াত পাননি বলে জানিয়েছেন শরিক দলের কয়েকজন নেতা।

১৯৯৯ সালের ৬ জানুয়ারি জাতীয় পার্টি, জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ঐক্যজোটকে সঙ্গে নিয়ে ‘চারদলীয় জোট’ গঠন করেছিল বিএনপি। পরে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বেরিয়ে গেলে যুক্ত হয় নাজিউর রহমান মঞ্জুর বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। পরবর্তীতে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে থাকা চারদলীয় জোট কলেবরে বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ দলীয় জোটে। এরপর জোটের পরিধি দাঁড়ায় ২০ দলে। তবে ২০ দলীয় জোট থেকে ইসলামী ঐক্যজোট, এনপিপি, ন্যাপ ও এনডিপির একাংশ জোট ছেড়ে যায়। বর্তমানে ২০ দলীয় জোটে ২৩টি দল রয়েছে। দলগুলো হলো—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), ইসলামী ঐক্যজোট, লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (বাংলাদেশ ন্যাপ), জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এনডিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ভাসানী, ডেমোক্রেটিক লীগ, পিপলস লীগ, জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর), বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি অব বাংলাদেশ, জাতীয় দল ও মাইনোরেটি পার্টি।

বিএনপির প্রতি শরিকদের অবহেলার অভিযোগ থাকলেও জোট ছাড়ার বিপক্ষে তারা। জোটের নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়ার হাত ধরে এই জোট গঠিত হয়েছে। এখন খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তারা জোট ছাড়বেন না। তবে কেউ কেউ জোটে থাকা নিয়ে দ্বিধায় আছেন।

জোটের নেতাদের অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, বিএনপি সারাক্ষণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নিয়ে মেতে আছে। অথচ ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন নতুন করে আবারও জামায়াত ইস্যু আলোচনায় এনে বিএনপিকে যেমন চাপে ফেলেছে, তেমনি সরকারকেও একটি আলোচনার খোরাক তুলে দিয়েছে।

২০ দলীয় জোটের নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন হওয়ার পর থেকে বিএনপির সব মনোযোগ ও কার্যক্রম ঐক্যফ্রন্টকে ঘিরে। কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বা পরে পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের কাছে। ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা করা হয় না। ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের একদিন পরে ২০ দলীয় জোটের বৈঠক হয়। এরপর জোটের কোনো বৈঠক বা কোনো কর্মসূচি ছিল না। অথচ বিএনপির নেতারা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগর দুটি জেলা সফরেও গিয়েছেন। এই সফরগুলোতে ২০ দলীয় জোটের নেতাদের ডাকা হয়নি।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট নতুন কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। বিরোধী দলের ভূমিকায় একাধিক দলকে সক্রিয় রেখে বিএনপিকে আরও চাপে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। সংসদে আসার বিষয়ে বিএনপির সিদ্ধান্ত এবং দলটির পরবর্তী কর্মসূচি বুঝেই ১৪ দলের পরিকল্পনা ঠিক করা হবে। তবে এ কৌশলে পুরোপুরি ভরসা পাচ্ছেন না শরিকদের অনেকে। তারা মনে করছেন, একচেটিয়া বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ নিজেই শরিকদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করছে। বিএনপিকে নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনার কিছু নেই। বিএনপি যে পরিস্থিতিতে পড়েছে, তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতেই তাদের হিমশিম খেতে হবে। তাই সরকার কার্যকর সংসদ দেখাতে মহাজোটের অংশীদার জাতীয় পার্টির পাশাপাশি ১৪ দলের শরিকদে​রও বিরোধী দলের ভূমিকায় রাখতে চায়।

১৪ দলের একাধিক নেতা জানান, শরিকদের কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পাওয়ার আশা এখনো ছাড়েননি। তাই তারা চুপচাপ আছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে দূরত্বের বিষয়ে গণমাধ্যমে কথাবার্তা বলে সরকারের বিরাগভাজন হতে চাইছেন না। বরং আগামী মার্চ থেকে শুরু হওয়া উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে ইতিমধ্যে দল গোছানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন শরিকেরা।

বিএনপির শরিকদল খেলাফত মজলিসের আমির অধ্যক্ষ মাওলানা ইসহাক বলেন, ‘জোটের ভবিষ্যত কী হবে তা এই মুহূর্তে বলতে পারছি না। জোটের আবার মিটিং হলে তখন বলা যাবে। তাছাড়া দেশে তো একনায়কতন্ত্র চলছে, কোনো কর্মসূচি পালন করা যাচ্ছে না। আর উপজেলা নির্বাচন নিয়ে এখনও জোটগত বা দলগত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’

এর আগে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শরিকদের বিরোধী দলের ভূমিকায় রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত শনিবার রাজধানীর বনানীতে জাপার কার্যালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান বলেন, ১৪ দলের সংসদ সদস্যরা জাতীয় পার্টির সঙ্গে বিরোধী দলের ভূমিকায় এলে সংসদ আরও প্রাণবন্ত হবে। সম্মিলিতভাবে দেশ ও দেশের মানুষের পক্ষে কথা বলে সংসদকে কার্যকর রাখা যাবে।

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নূরুল আম্বিয়া বলেন, নির্বাচনের আগের ও পরের পরিস্থিতিতে অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।

জোটের আরেক শরিক সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া বলেন, রাজনৈতিক কারণেই জোটের প্রাসঙ্গিকতা টিকে আছে। তাই সংকট কেটে যাবে। জোটের প্রধান নেতা শেখ হাসিনার প্রতি তাদের পূর্ণ আস্থা আছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দলীয় কৌশল ঠিক করতে গতকাল রবিবার ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্যরা বৈঠক করেছেন। আগামী ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে জাসদের (আম্বিয়া) একাংশ। দলগুলো এসব সভা থেকে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি ঠিক করবে।

এ দিকে রবিবার রাশেদ খান মেননের সভাপতিত্বে ওয়ার্কার্স পার্টির পলিটব্যুরোর বৈঠক শেষে দলটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে এক বিবৃতি পাঠানো হয়। তাতে বলা হয়, সম্প্রতি ১৪ দলের প্রাসঙ্গিকতা ও অবস্থান নিয়ে কিছু বিভ্রা‌ন্তিমূলক বক্তব্য এসেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি স্পষ্টভাবে মনে করে, ২০০৪ সালে যেসব ভিত্তিতে ১৪ দল গঠিত হয়েছিল, তার মূল বিষয়গুলো এখনো প্রাসঙ্গিক। এই অবস্থায় জাতীয় নির্বাচনের বিজয় সুরক্ষায় ১৪ দলের ঐক্যবদ্ধতা ও এ যাবৎকালের অবস্থান ও আচরণ সুর‌ক্ষিত করা প্রয়োজন।

২০ দলীয় জোটে থাকা ডেমোক্রেটিক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইফুদ্দিন আহমেদ মনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, ২০ দলীয় জোট আর বিএনপির রাজনীতি একই ধারার। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতির কোনো মিল নেই। কারণ আমরা জিয়াউর রহমানের আদর্শের রাজনীতি করি। আর ঐক্যফ্রন্ট শেখ মজিবুর রহমানকে তাদের আদর্শ মনে করেন। এখন বিএনপি কাকে প্রাধান্য দেবে তাদের তা ঠিক করতে হবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের একটি দলের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘২০ দলীয় জোট নিয়ে বিএনপির কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। তাদের মনোভাব এখন এমন যে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টই সবকিছু। জোট না থাকলেও চলবে। জোটের কোনো কর্মসূচি না থাকলেও বিএনপি তো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে বিভিন্ন জেলা সফরে যাচ্ছে। প্রতিদিন তাদের নিয়ে মিডিয়াতেও আসছে।’

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...