বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের একটি ফাইল ছবি

বিএনপি এখন কী করবে?

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনের আগে কৌশল নির্ধারণ নিয়ে যদি ভুল সিদ্ধান্তও নিয়ে থাকে তা হলেও সবকিছুই নতুন করে শুরু করতে হবে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে পুনর্গঠন করতে ঢেলে সাজাতে হবে।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৯ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৫৪
প্রকাশিত: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৪৯ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৯:৫৪


বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের একটি ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) রাজনৈতিক আশ্রয়ে লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে বিএনপি। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দিয়ে সংসদের বাইরে থাকা বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়। সেই নির্বাচনে ব্যর্থ হয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করতে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা পরামর্শ আসার আগ পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে আপাতত বিরত থাকছে দলটি সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। তবে সংশ্লিষ্টদের বেশিরভাগ সদস্য মনে করছেন, নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট না করা, নির্বাচনের বিষয়ে খালেদা জিয়ার আশাবাদ এবং হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্টদের মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়গুলো নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। ফলে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত আসার আগে কেউ-ই স্বউদ্যোগে সিদ্ধান্ত নিতে চান না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘বড় সমস্যা খালেদা জিয়া জেলে। তারেক রহমান আছেন, কিন্তু দূরে থাকেন। টেলিফোনে যোগাযোগ কতদূর হয়, মাঝে-মাঝে মিস আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে সমস্যা হয়। বিএনপি নেতাদের বড় কাজ হলো, গ্রামাঞ্চল থেকে শুরু করে সমর্থকদের কাছে ফিরে যেতে হবে। তাদের কাছে কাহিনিটা বলতে হবে। হেরে গেলাম কেন, সেটা জানাতে হবে। এই অবস্থা থেকে উঠে আসতে হলে কী করণীয়, সেটা তাদের জানাতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য স্থায়ী কমিটির সদস্যদের শুধু নয়, এটা করতে পারবে লাখ লাখ ভোটার, লাখ লাখ সমর্থক। তাদেরই এসব মোকাবিলায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। বিএনপিকে একাই দাঁড়াতে হবে। দলটার গঠন কারও ওপর নির্ভর করে হয়নি। নিজেরা সংগঠিত হওয়ার আগে পর্যন্ত সামনে আগানো ঠিক হবে না।’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিএনপিতে মূলত তিনটি ভাগ রয়েছে। একটি তৃণমূল, দ্বিতীয়টি সাংগঠনিক নেতৃত্ব, যেটি পুরোপুরি তারেক রহমানের নিয়ন্ত্রণে। তৃতীয়টি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যেটিতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এই কমিটির পাঁচটি পদ শূন্য অবস্থায় রয়েছে। তবে বাংলাদেশে সুশীল সমাজের একটি অংশের কাছে স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্যের গ্রহণযোগ্যতা থাকায় শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান তাদের ওপরই ভরসা করবেন, এমনটা মনে করেন একাধিক নেতা।

গত ৩১ ডিসেম্বর স্থায়ী কমিটির বৈঠক শেষে একজন সদস্য জোর দিয়েই বলেছিলেন, ‘এখন তারেক রহমানের কাজ হবে দলটি আমাদের ওপর ছেড়ে দেওয়া। আমরা নিজেরা আলোচনা করে সামনের দিকে এগিয়ে নেবো। তার নির্দেশনা এলে আমাদের কাজ করার সুযোগ কম থাকে। বিশেষ করে যেকোনো বিষয়ে তারেক রহমানের একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা আগ বাড়িয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। নির্বাচনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিজয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, এ বিষয়টির কোনো সুরাহা তিনি দিতে পারেননি।’ তিনি আরও জানান, ঐক্যফ্রন্টের বড় শরিক হিসেবে বিএনপির কোনো সিদ্ধান্ত না পেয়ে ড. কামাল হোসেনও ছিলেন দায়সারা। এ ছাড়াও হাওয়া ভবন সংশ্লিষ্ট ঘনিষ্ঠ দুইজনকে মনোনয়ন দিয়ে নতুন করে সিনিয়র নেতাদের দুশ্চিন্তায় ফেলেন তারেক রহমান। বিএনপির দায়িত্বশীল একটি সূত্র মনে করে, এসব কারণে বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে পরাজিত করা সহজ হয়েছে।

একটি অসমর্থিত সূত্রের দাবি, খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সরকারের নমনীয় আচরণের ওপর নির্ভর করছে বিএনপি সংসদে যাবে কিনা। একই সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে ইতিবাচক হলেও দলীয় প্রতীকে করা হবে কিনা, এ নিয়ে এখনো ফয়সালা হয়নি।

বিএনপি হাইকমান্ডের ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তি জানান, জেলে থাকা খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে ইতিবাচক ছিলেন তারেক রহমানসহ তার চারপাশের লোকজন। এই ধারণা যে ভুল ছিল, তা দিনে-দিনে প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষ করে হাইকোর্টের দ্বিধাবিভক্ত রায়ের কারণে তারেক রহমান উৎসাহী হলেও আদতে তা স্যাবোটাজ হিসেবে কাজ করেছে। যাকে তারেক রহমানের রাজনৈতিক অদূরদর্শিতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীদের ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার বিষয়টিকেও হাইকমান্ডের দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই হয়তো আগামী কয়েক মাস খুব নিবিড়ভাবে তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও আচরণে খেয়াল রাখবেন তারা। এরপরই নিজেদের ভাবনা ও মত তুলে ধরবেন তার কাছে। এর আগে তারেক রহমান কী চাইছেন, তাই মুখ্য তাদের কাছে।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘বিএনপির এই মুহূর্তে করণীয় হবে, নির্বাচনের আগে-পরে দলের যেসব নেতাকর্মী জেল গেছেন তাদের মুক্ত করতে হবে। যারা হামলা-মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের সহায়তা করতে হবে। এখন বিএনপির কাজ হচ্ছে আহত-নিহত নেতাকর্মীদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো। এই মুহূর্তে আমাদের মূল লক্ষ্য খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা এবং প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলা।’

বিএনপির খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘গতানুগতিক রাজনীতি করলে বিএনপির সংকট দূর হবে না। নির্বাচনে বিএনপি যে সংকটের মধ্যে পড়েছে, তা কীভাবে কাটিয়ে উঠা যায় এই নিয়ে আমাদের সব চিন্তাভাবনা। সামনে কীভাবে বিএনপি রাজনীতি করবে সেটা ঠিক করতে হবে। মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা এলাকা ছাড়া, অনেকে জেলে আছেন, তাদের মুক্ত করা হচ্ছে আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।’

খুলনা জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা বলেন, ‘এই মুহূর্তে বিএনপির করণীয় হবে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত দলকে পুনর্গঠন করা। আর দল পুনর্গঠিত হলে যেকোনো সংকট মোকাবিলা, আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া যাবে। কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া মুক্তি না পেলেও কাউন্সিল করে ফেলা উচিত। আর কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে শক্তিশালী করা গেলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি আন্দোলনের মাধ্যমে তাকে মুক্ত করা সম্ভব।’

এদিকে তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘বিএনপি নির্বাচনে হেরে গিয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন। নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই তারা এ সব কথাবার্তা বলছেন। তারা জানতেন নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হবে। এটা জেনেই তারা ৩০০ আসনে ৮০০ প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছেন।  এটি তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। তারা নির্বাচনে প্রচারণায় নামেনি, তাদের লক্ষ্য ছিল অংশগ্রহণ করে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ।’

সোমবার ২১ জানুয়ারি নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তথ্যমন্ত্রী এসব বলেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আওয়ামী লীগের বিজয় সমাবেশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে ইঙ্গিত করে দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে হাছান মাহমুদ এসব বলেন।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেছেন, ‘নির্বাচনের নামে একটি তামাশা হয়েছে দেশে। এটাকে নির্বাচন বলা যায় না। কোনো সুষ্ঠু স্বাধীন গণতান্ত্রিক জাতি এবং এ দেশের মানুষও এটাকে মেনে নেয়নি।’

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, কারাবন্দী দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টিকে এখন সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতারা। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মুক্তির বিপরীতে প্রয়োজনে রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে যেতেও সম্মত আছেন তারা। অর্থাৎ ‘ছাড়’ দিয়ে হলেও দলীয় চেয়ারপারসনের মুক্তি চায় বিএনপি। বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে পর্দার অন্তরালে আলোচনা করতে আগ্রহী বিএনপির হাইকমান্ড।

এদিকে সংসদে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে এখনো অনড় বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগ এনে তা প্রত্যাখ্যান করে দলটি। এরই ধারাবাহিকতায় দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন না এবং সংসদে যাবেন বলে সিদ্ধান্তে নেয়।

গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে বিএনপিকে শপথ গ্রহণ করে সংসদে আসার শর্ত দেওয়া হতে পারে। এতে রাজি হলে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলতে পারে! তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পর্দার অন্তরালে সরকারের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে কূটনীতিকদের মধ্যস্থতায় যোগাযোগ করতে চায় বিএনপি।

নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল, আন্দোলনের অংশ হিসেবে দলটি নির্বাচনে যাচ্ছে। ভোট বিপ্লব ঘটিয়ে আওয়ামী লীগকে পরাজিত করে খালেদা জিয়ার মুক্তি নিশ্চিত করা হবে। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দলটি নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোটের ফল প্রত্যাখ্যান করে এবং পুনর্নির্বাচনের দাবি জানায়। কিন্তু যে ইস্যুকে মূল প্রতিপাদ্য ঘোষণা দিয়ে বিএনপি নির্বাচনে এসেছিল, নির্বাচনের পর সেই ইস্যুর বিষয়ে অর্থাৎ কারাবন্দী খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি বা উদ্যোগ দেখা যায়নি। যদিও ভোটের পর বিএনপি স্থায়ী কমিটির নেতারা দুই দফায় বৈঠক করেছেন, যেখানে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি।

বিদ্যমান বাস্তবতায় খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার সম্ভাব্য পথ নিয়ে ভাবছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা। এসব হচ্ছে রাজপথে আন্দোলন, সরকারের সঙ্গে সংলাপ, বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়ে কূটনৈতিক পর্যায় থেকে চাপ সৃষ্টি ইত্যাদি।

গত বৃহস্পতিবার দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮৪তম জন্মদিনের আলোচনা সভায় ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপিকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। ২০০৮ সালে এমনিভাবে ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছিলাম। তার পর কিন্তু আমরা দলের কাউন্সিল করে ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। একটি কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে পুনর্গঠন করতে হবে। তুলনামূলকভাবে ত্যাগী এই নির্বাচনে যারা পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের নেতৃত্বে আনতে হবে। আমরা যারা ব্যর্থ বলে পরিচিত হয়েছি, তরুণদের জন্য তাদের পদ ছেড়ে দিতে হবে।’

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...