২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। ফাইল ছবি

১৩ লাখ মানুষের জন্য ৯২ কোটি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার অর্থায়নের চাহিদা

এক বছর আগে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সৈকতে।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০০ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০০
প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০০ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৪:০০


২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকেই বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় ‘জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান (জেআরপি) ২০১৯’ তৈরি করেছে জাতিসংঘ। চলতি বছরের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিভিন্ন খাতে সংকট মোকাবেলা পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠী উখিয়া ও টেকনাফের প্রায় ১৩ লাখ মানুষের জন্য ৯২ কোটি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের অর্থায়নের চাহিদা প্রাক্কলন করা হয়েছে। সবগুলো খাতে যে অর্থ ব্যয় এবং সেবা দেওয়া হবে, তাতে শুধু সাময়িক নয়, দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া যাবে।

জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান ২০১৯ থেকে জানা যায়, ১২টি খাতে ভাগ করে অর্থায়নের প্রাক্কলন করেছে জাতিসংঘ। গতবারের মতো এবারও খাদ্য নিরাপত্তায় চাহিদা সবচেয়ে বেশি দেওয়া হয়েছে।

উখিয়া ও টেকনাফের তিন লাখ ৩৫ হাজার ৯৩০ জন স্থানীয় ও ৯ লাখ ৬ হাজার ৫১২ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ মোট ১২ লাখ ৪২ হাজার ৪৪২ জনকে খাদ্য নিরাপত্তার আওতায় আনতে প্রয়োজন পড়বে ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এরপরই ডব্লিউএএসএইচ (ওয়াশ) প্রকল্পে ১২ লাখ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রয়োজন পড়বে ১৩ কোটি ৬৭ লাখ ডলার।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রবেশের পর থেকে প্রতিবছরই জেআরপি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। জেআরপি ২০১৯-তে গত বছরের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে সমানভাবে সুরক্ষাসেবা পৌঁছে দিতে না পারা, বর্ষায় বৃদ্ধ ও প্রতিবন্ধীদের প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা, সুরক্ষা ও লিঙ্গবৈষম্যকে এখনো মূলধারায় নিয়ে আসতে না পারা, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা রোধে পুরুষদের সম্পৃক্ত করা, নারী ও শিশুদের জন্য বিশেষায়িত সেবার অভাব, এলজিবিটিআই, প্রতিবন্ধী ও বৃদ্ধদের জন্য অপ্রতুল অভিগমন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা এবং অন্যান্য ফাঁক-ফোকরগুলো তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বের সবেচেয়ে দ্রুতবর্ধমান শরণার্থী সংকট হিসেবে রোহিঙ্গা সংকটকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে। এতে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে রোহিঙ্গারা শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে এসেছে। এ বিশাল সংখ্যক শরণার্থীকে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় দুই হাজার একর জমির উপর থাকার জায়গা দিয়েছে বাংলাদেশ। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবির। এতে করে সেখানকার অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসেবা ও পানি সরবরাহ, পরিবেশ, বিশেষ করে বনসম্পদের ওপর ব্যপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকট শুরুতেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারে স্থাপিত রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এমনকি বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছেন, বৈঠক অব্যাহত রেখেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্বকে এই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

এদিকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ চলতি বছরের ১৮ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কসবার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের কাজিয়াতলী সীমান্তের ২০২৯ নম্বর পিলারের কাছে কাঁটাতারের মাঝখানের একটি পকেট গেট দিয়ে ১৭ শিশুসহ ৩১ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঢোকানোর চেষ্টা করে। ওই সময় বিজিবি বাধা দিলে তারা শূন্য রেখায় অবস্থান নিতে বাধ্য হয়। সেই থেকে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যে তারা সেখানে অবস্থান করছে।

সম্প্রতি ১৩০০ রোহিঙ্গা সীমান্তের বিভিন্ন এলাকা দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারত থেকে জোর করে মিয়ানমার পাঠিয়ে দেওয়ার ভয়ে থাকা এসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট

ইউনিসেফ সূত্রে জানা গেছে, এক বছর আগে মিয়ানমারে সহিংসতার মুখে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে আসা লাখ লাখ ভয়ার্ত রোহিঙ্গার ঢল নেমেছিল বাংলাদেশের দক্ষিণ উপকূলের সৈকতে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল শিশু। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা জানিয়েছিলেন রাখাইনে বীভৎস আক্রমণের কথা; আত্মীয়স্বজন, ঘরবাড়ি ও প্রতিবেশীদের হারানোর কথা।

মিয়ানমারের সীমানার অদূরে, বাংলাদেশের কক্সবাজারের পাহাড়গুলোতে গাদাগাদি করে বাস করে ৯,১৯,০০০ রোহিঙ্গা। পাহাড়ি বনভূমি উন্মুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই আশ্রয় শিবির। পার্শ্ববর্তী টেকনাফ ও উখিয়াতেও গড়ে উঠেছে বেশ কিছু ক্যাম্প।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বেশীরভাগ, প্রায় ৭,০০,০০০ জন এসেছেন ২০১৭ সালের আগস্টের শেষের দিকে রাখাইনে বড় মাপের সহিংসতা শুরু হবার পর। বাকিরা পাড়ি দিয়েছিলেন আগেই, বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন এড়াতে।

রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে মানবাধিকার কর্মীদের কাজের পরিধি বেড়ে এখন অনেক বড় আকার ধারণ করেছে। কিন্তু পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনের তুলনায় আমাদের সাহায্য করার ক্ষমতা এখনও অনেক কম।  

ইউনিসেফ বলছে, সঙ্কটের প্রথম দিনগুলোর চরম বিশৃঙ্খলা পার করে অনেক দূর এগিয়ে এসেছি আমরা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশিদের জীবনে নেমে এসেছে এক ধরনের স্বাভাবিকতা। কিন্তু এই স্বাভাবিক অবস্থা সবসময় টিকবার নয়। রাখাইনে বীভৎস হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের স্মৃতি, ঘরবাড়ি হারানোর যন্ত্রণা রয়ে গেছে লাখ লাখ মানুষের মনে। 

কঠিন পরিবেশকে শিশুদের জন্য নিরাপদ করে তুলতে হবে

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো আগের তুলনায় এখন অনেক গোছানো। এক বছর আগে, রোহিঙ্গা শরণার্থীরা ত্রানে পাওয়া প্লাস্টিকের চাদর ও বাঁশ দিয়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোনো রকমে আশ্রয় তৈরি করেছিল। সেই সময়কার কাদাভরা রাস্তাগুলো এখন ইট দিয়ে স্থায়ী করা হয়েছে। বালির ব্যাগ এবং বাঁশের সেতু ব্যবহার করে খাড়া পাহাড়গুলোতে চলাফেরা সহজ করা হয়েছে। রাস্তায় আলো দেওয়ার জন্য বসানো হয়েছে আরো অনেক সোলার বাতি। শরণার্থী পরিবারগুলোর জন্য বিপদ একটু হলেও কমিয়ে আনা হয়েছে।

ঘিঞ্জি এই আশ্রয়গুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের খেলাধুলা ও বিকাশের জন্য ১৩৬টি শিশুবান্ধব কেন্দ্র চালায় ইউনিসেফ। সহিংসতার শিকার এই শিশুদের অনেকেরই প্রয়োজন মানসিক সাহায্য। তাদের মানসিক অবস্থা স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনার জরুরি কাজটি করে যাচ্ছে শিশুবান্ধব কেন্দ্রের চিকিৎসক, সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকরা।

কক্সবাজারে ইউনিসেফের চাইল্ড প্রোটেকশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার উইলিয়াম কলি বলেন, ‘এই কেন্দ্রগুলো ক্যাম্পের সকল শিশুদের জন্য উন্মুক্ত। তারা এখানে তাদের মতো করে খেলতে, ছবি আঁকতে ও পড়তে পারে। শিশুরা এখানে ব্যাস্ত থাকলে তাদের বাবা-মা নিশ্চিন্তে তাদের কাজ করতে পারে।’

রোহিঙ্গা পরিবারগুলো তাদের আচার অনুযায়ী কিশোরী মেয়েদের ঘর থেকে বের হতে মানা করে। রাখাইনে সেই সীমানা ছিল তাদের গ্রামের বাড়ির উঠান। এখন রোহিঙ্গা কিশোরীদের দিন কাটে ছাপড়া ঘরের চার দেওয়ালের মাঝে। কাজের মধ্যে আছে শুধু রান্না ও ঘর পরিষ্কার রাখা। যৌন হামলা ও পাচারেরও ভয়ে থাকে তারা।

ওদের কথা মাথায় রেখে ইউনিসেফের সাহায্যে ক্যাম্পের সমাজকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে ক্লাব তৈরি করেছে। ওয়ার্ড ভিত্তিক এই ক্লাবগুলোর সদস্য ৬০,০০০ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী। ক্লাবগুলোর মাধ্যমে তারা জীবনে চলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং শিশু অধিকার বিষয়ক জ্ঞান পেয়ে থাকেন। বাল্যবিয়ে, শিশু শ্রম ও প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা হয়। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়েও অনেক সাহায্য দেওয়া হয় ক্লাবগুলোর মাধ্যমে।

রোহিঙ্গা শিশু ও তাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশি শিশুদের মধ্যে সৌহার্দ্য তৈরি করাও ইউনিসেফের একটি লক্ষ্য। ‘এই বিপর্যয়ে রোহিঙ্গাদের সাহায্যে সবার আগে এগিয়ে এসেছিল এখানকার স্থানীয়রা। এর জন্য অনেক কষ্টও পোহাতে হয়েছে তাদের’, বলেন জিন মেটেনিয়ের, ইউনিসেফের কক্সবাজার ফিল্ড অফিসের প্রধান।

প্রজন্মের হারিয়ে যাওয়া রোধ

রাখাইনে ২০১৭ সালের বিপর্যয়ের পর বাংলাদেশে পালিয়ে আসা নতুন শরণার্থীদের মধ্যে ৩ লাখ ৮১ হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জরুরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা ছিল একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। ১৪ বছরের ছোট শিশুদের অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করে ইউনিসেফ এবং সহযোগী সংস্থ্যাগুলো। ২০১৮ সালের জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশুকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ৩০ হাজার এরও বেশি শিক্ষককে, যাদের মধ্যে আছে বাংলাদেশি ও মিয়ানমারের নাগরিক। অনেককাল শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এই জনগোষ্ঠীর পড়ালেখার প্রতি আকাঙ্খা নজর কাড়ার মতো। প্রতিদিন রোহিঙ্গা শিশুদের ঢল নামে ইউনিসেফের শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে।

‘এখানের স্কুলগুলোতে ছোট বাচ্চারা যায়। কিন্তু আমার বয়সের ছেলেদের জন্য ওখানে কিছু নেই। স্কুলে না পড়তে পেরে আমার মনে খুব কষ্ট হয়,’ বলেন মোহামেদ নামের একজন রোহিঙ্গা কিশোর।

রাখাইন থেকে পালিয়ে আসার সময় একটি হাত হারায় মোহামেদ

রাখাইনের সহিংসতা থেকে পালিয়ে আসার সময় একটি হাতে আঘাত পায় সে। পরে তা কেটে ফেলতে হয়। ‘নকল হাতের চাইতে পড়ালেখা জানা জরুরি’, বলেন মোহামেদ।

‘আমরা খুব দ্রুততার সাথে এবং প্রচুর সংখ্যায় শিক্ষা কেন্দ্র তৈরি করেছি,’ বলেন বিবেক শর্মা পউদ্যাল, ইউনিসেফে শিক্ষা কার্যক্রমের ভারপ্রাপ্ত প্রধান। ‘এখন আমাদের সেখানকার পড়ালেখার মান বাড়াতে হবে এবং কিশোর-কিশোরীদের অন্তর্ভূক্ত করতে হবে।’

রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা নিয়ে নতুন একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রত্যেকটি শিশুর দৈনিক শিক্ষার সময় এখন দুই ঘণ্টা, সেটা বাড়িয়ে চার ঘণ্টা করা হবে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখার ব্যবস্থা করা হবে। পড়ানো হবে ইংরেজি, বার্মিজ এবং রোহিঙ্গাদের স্থানীয় ভাষায়।

এই পরিকল্পনায় অনেক উচ্চকাঙ্খী ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এদওয়ার্ড বেগবেদার। তিনি বলেন, ‘কিন্তু এই সময়টিতে শিক্ষায় বিনিয়োগ না করলে, এই প্রজন্মের শিশুরা আমাদের কাছ থেকে হারিয়ে যাবে। জীবনে এবং এই বিশেষ পরিস্থিতিতে চলার মতো জ্ঞান তাদের থাকবে না। মিয়ানমারে ফিরে গেলেও তারা সামাজিক কর্মাকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।’

ফাইল ছবি

শরণার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি

‘ক্যাম্প শরণার্থীদের এবং তাদের বাংলাদেশি প্রতিবেশীদের পানি পান, রান্নাবাড়া আর জিনিসপত্র ধোওয়ার জন্য প্রায় দৈনিক ১.৬ কোটি লিটার পানি প্রয়োজন হয়’, বলেন রাফিদ সালিহ, যিনি ইউনিসেফের ‘পানি, পয়নিষ্কাশন ও হাইজিন’ বিশেষজ্ঞ।

‘সবার কাছে পানি পৌঁছে দেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তার ওপর আমাদের প্রায় ৫০,০০০ ল্যাট্রিন বানিয়ে সেগুলোর রক্ষনাবেক্ষন করতে হবে।’

দুর্গম পাহাড়ে গড়ে ওঠা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ৮,০০০ এর বেশি পানি তোলার পয়েন্ট রয়েছে, কিন্তু ৮০ শতাংশ বাদে অন্যগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিপর্যয়ের শুরুর দিকে স্থাপিত অনেক টিউবওয়েল, যেগুলোর জায়গা নির্ধারণে ভুল ছিল, দূষিত হয়ে গেছে অথবা পানি শুকিয়ে গেছে, সেগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৮,০০০ ল্যাট্রিন বন্ধ করে দিয়ে, সেগুলো অন্য জায়গায় সরিয়ে, আরো ভালো মানের ল্যাট্রিন তৈরি করার কাজ করছে ইউনিসেফ। আধুনিক উপায়ে ল্যাট্রিন থেকে বর্জ্য সরিয়ে নেওয়ার কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যদিও বড় পরিসরে স্থাপনার জন্য ক্যাম্পে জায়গা পাওয়া একটা বড় চ্যালেঞ্জ।

চাকমাপুরে টয়লেটের বর্জ্য অপসাণের কাজ

উনচিপ্রাং আশ্রয় ক্যাম্পে টিউবওয়েল ব্যবহার করা যায় না। এই পাহাড়গুলোতে ভূতলে জমে থাকা পানির উৎস খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই সেখানে ইউনিসেফের সাহায্যে এবং অক্সফামের পরিচালনায় দুইটি পানি শোধনাগার তৈরি করা হয়েছে। সেখানে পাহাড়ি ছড়ার পানি দুষণমুক্ত করা হয়। সে পানি ফোটানো ছাড়াই সরাসরি পানের যোগ্য।

‘একটি শোধনাগার প্রত্যেকদিন ৩০০,০০০ লিটার পানি সরবরাহ করে। এই পানি গিয়ে পৌঁছায় অনেকগুলো পানি তোলার পয়েন্টে, যেখান থেকে উঞ্চিপ্রাং-এর রোহিঙ্গা আর চাকমারা ও রইকুম পাড়ার বাংলাদেশিরা পানি সংগ্রহ করে’, বলেন অক্সফামের প্রোগ্রাম অফিসার কাজল বর্ধন।

প্রায় ২০০,০০০ বাংলাদেশি ও ১৫০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীরা নিরাপদ পানি ও পয়নিষ্কাশনের ব্যবস্থা ব্যাবহার করতে পারবেন ২০১৮ সালের মধ্যেই। এজন্য জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাথে একযোগে খনন করা হচ্ছে চারটি গভীর নলকুপ।

ড. কাজী ইসলাম, কুতুপালং ক্যাম্পের একটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রের নেতৃত্বে আছেন এই স্বাস্থ্যকর্মী। ইটের তৈরি নীল রঙের স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে ভিড় লেগে থাকে সকাল থেকেই। কেন্দ্রটি আগে বাঁশের তৈরি ছিল, কিন্তু এখন ইট সিমেন্ট দিয়ে পাকা করা হয়েছে।

শরণার্থী ও স্বাগতিক জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য সেবা

‘এই বছরে এ পর্যন্ত আমরা ১,৭০০ নবজাতককে চিকিৎসা দিয়েছি’, জানান ইউনিসেফ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হেলেন চাকমা। তিনি বলেন, ‘রেফেরাল গুলো স্থানীয়দের থেকেও আসে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো থেকেও। এই ইউনিটটি সবাইকে সাহায্য করে।’

‘এখানে প্রত্যেকটি দিন আমরা নতুন কিছুর সম্মুখীন হই। কিন্তু বেশীরভাগ রোগী পাই ডাইরিয়ার অথবা ঠাণ্ডা-কাশির’, বললেন ডা. ইসলাম। তিনি সকাল থেকে অনেকজন রোগী দেখে ফেলেছেন। যক্ষ্মার এক রোগীকে কাছের একটি ক্লিনিকে পাঠিয়েছেন। এক নারী এসেছিলেন তার ছোট শিশুকে দেখাতে, যে হয়ত বা প্রতিবন্ধী। ক্যাম্পে আসা যাওয়ার ব্যাস্ত রাস্তাগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনা হয়। এরকম একটি দুর্ঘটনায় আহত হয়ে একটি ছোট মেয়ে সকালে এসেছিল চিকিৎসা নিতে।

ডা. ইসলামের এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির চাইতে বড় আরো ছয়টি প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রয়েছে রোহিঙ্গা আশ্রয় ক্যাম্পগুলোতে। এসব কেন্দ্রগুলোর চিকিৎসক, কর্মী ও সেচ্ছাসেবীদের অক্লান্ত কাজের কারণে অসুস্থ পরিবেশে গাদাগাদি করে থাকা রোহিঙ্গাদের মধ্যে অসুখ ছড়ানোর বড় ধরনের সম্ভাবনা বারবার মোকাবেলা করা সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে পালিয়ে আসার আগে রাখাইনের রোহিঙ্গাদের টিকা নিয়ে কোনো ধারণা ছিল না। টিকা নিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা গুজবে বিশ্বাস করতেন এই শরণার্থীরা। সেসব ভুল বিশ্বাস থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে এনে, তাদের শিশুদের জরুরি টিকা দেওয়ার কাজটি ছিল খুব কঠিন।

নবজাতকের জীবন বাঁচাতে বিশেষ যত্ন

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভয় ছিল যে ক্যাম্পগুলোতে যেকোনো অসুখ মহামারীর আকার ধারণ করতে পারে। কিন্তু পরপর অনেকগুলো টিকাদান কর্মসূচি, ১০ মাসে নয়টি–স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাজ অনেক এগিয়ে নিয়েছে। তারপরও ভয় তৈরি হয় যখন হাম ও ডিপথিরিয়ার মতো অসুখে আক্রান্ত হয় ক্যাম্পের অনেকে।

সমস্যা হলো নতুন করে টিকা দেওয়ার সময় আসলে রোহিঙ্গাদের আবার বুঝিয়ে, তাতে উৎসাহী করাটা আমাদের জন্য এখনও কঠিন।

‘পালিয়ে আসা এই মানুষদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ছিল খুব নাজুক। তাদের আগে কখনো টিকা দেওয়া হয়নি। আমরা যেরকম আশঙ্কা করেছিলাম তার চাইতে অনেক কম সমস্যা মোকাবেলা করতে হয়েছে আমাদের’, বলেন ইউনিসেফ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ইউলিয়া উইদিয়াতি।

কক্সবাজারে রয়েছে আরেকটি চিত্র। ছোট এই জেলা শহরটিতে শরণার্থীদের ঢল নামবার পর স্থানীয় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপ এখন অনেক বেড়েছে। ইউনিসেফের সাহায্যে পরিচালিত অসুস্থ বা সময়ের আগেই জন্মেছে এমন নবজাতকদের জন্য বিশেষ ইউনিট রয়েছে কক্সবাজার জেলা হাসপাতালে। এখানে স্থানীয় নবজাতকদের পাশাপাশি অসুস্থ রোহিঙ্গা নবজাতকদেরও চিকিৎসা করা হয়।

লুকিয়ে আছে ঘাতক

রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য মারাত্মক চরম অপুষ্টি একটি বিরাট স্বাস্থ্য ঝুঁকি। বালুখালি ক্যাম্পে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করেন ১৮ বছর বয়সের আমিনা আক্তার। এই ক্যাম্পের ২৫০ জন কমিউনিটি সেচ্ছাসেবকদের মধ্যে তিনি একজন। বিশাল এই আশ্রয়ক্যাম্প টহল দেন তারা। খুঁজে বের করেন অপুষ্ট আর খুব কম ওজনের শিশু যাদের বয়স পাঁচ বছরের নিচে।

আমিনা তার কাজে যোগ দেওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে জমজ বোন আসিয়া ও রোবিনাকে খুঁজে পান। মারাত্মক চরম অপুষ্টি বা সিভিয়ার একিউট ম্যালনিউট্রিশনের (স্যাম) কারণে খুব অসুস্থ্য হয়ে গিয়েছিল। শরণার্থী সমস্যার শুরু থেকেই, রোহিঙ্গা শিশুদের জন্য চরম অপুষ্টি একটা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি।

‘এক বছর জরুরি ভিত্তিতে কাজ করার পর এখন একটা ব্যবস্থা দাঁডিয়ে গেছে। আমরা কমিউনিটির লোকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় পরিবারদের এখনকার এবং ভবিষ্যতের পুষ্টি প্রয়োজন পূরনের কাজ করছি’, বলেন ইউনিসেফ পুষ্টি দলের প্রধান সায়রা খান।

অপুষ্টির কারণগুলো আছে ক্যাম্পের পরিবেশেই। পরিষ্কার পানির স্বল্পতা, মায়ের দুধ খাওয়ানোর জন্য সঠিক পরিবেশ না থাকা এবং বিভিন্ন ধরনের পুষ্টিকর খাবারের স্বল্পতা যা বাড়ন্ত কিশোর-কিশোরী, মা ও ছোট শিশুর সুস্বাস্থ্যর জন্য অত্যন্ত জরুরি।

স্যাম বা মারাত্মক চরম অপুষ্টির ঝুঁকি এখনও একটা বড় সমস্যা: ইউনিসেফের গণনা মতে ৫০ হাজারেরও বেশি ৫ বছরের ছোট শিশুদের এই অসুখের চিকিৎসা দরকার হবে ২০১৮ সালে।

গুজব মোকাবেলা

ক্যাম্পের দ্রুত পরিবর্তনশীল অবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে শরণার্থীদের সাহায্য করছে মডেল মায়েরা। প্রায় ১০ লাখ মানুষের আশ্রয়ক্যাম্পের অলিগলিতে চলতে থাকে অনেক গুজব। অল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকা শরণার্থীদের ঘরে ঘরে খুব দ্রুত ছড়িয়ে যায় খবর।

টেলিভিশন, রেডিও বা অন্য কোনো মিডিয়া থেকে তথ্য পাওয়ার অবকাশ নেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে। এখানে মুখের কথাই সব হোক সেটা ক্যাম্পের কোনো গল্প, অথবা স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেবা সংক্রান্ত গুজব।

টিকা বিষয়ে ছিল ভ্রান্ত ধারণা। একসময় তারা ধারণা করা শুরু করলেন যে মেয়েদের হামের টিকা দিলে তারা আর মা হতে পারবেন না। টিকা দিলে রোহিঙ্গা মুসলমানদের শিশুরা খ্রিস্টান হয়ে যাবে, এরকম একটা গুজবও ছিল এসময়।

এরকম বিপজ্জনক গুজবের প্রতিকার না করলে ক্যাম্পের সেবাগুলোর পেছনের ভালো উদ্দেশ্যগুলো শরণার্থীদের বোঝানো যাবে না। এজন্য ইউনিসেফের উদ্যোগে ২৪০ জন স্বেচ্ছাসেবীর দল তৈরি করা হয়েছে–যাদেরকে বলা হয় ‘মডেল মাদারস’ বা আদর্শ মা।

মডেল মাদারস্‌ বা আদর্শ মা

৫০ বছর বয়সী রোহিঙ্গা নারী নূর বেগম একজন ‘মডেল মাদার’। তিনি নিজে একজন মা এবং তার ঘরে নাতিরাও আছে। তার কাজ রোহিঙ্গাদের ঘরে ঘরে গিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া। সন্তানস্বম্ভবা মায়েদের বাড়িতেই তার যাওয়া হয় বেশি।

‘আমি এই মায়েদের বলি যে বাচ্চা হওয়ার ব্যথা উঠলে ধাত্রী কে ডাক দিবা। কারণ বাচ্চা হওয়ার সময় কোন সমস্যা হলে ধাত্রীই পারে সেগুলোর মোকাবেলা করতে’, জানান তিনি। ‘ছোট শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো যে কি জরুরী সেটাও তাদের জানাই, বিশেষ করে কমবয়সী মায়েদের।’

ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেক কথা বলেন ‘মডেল মায়েরা’। ‘এখানে যারা থাকে, তাদের অনেকেই পরিচ্ছন্নতা সম্বন্ধে কিছু জানে না। আমি তাদেরকে বলি যে ঘর পরিষ্কার রাখলে অসুখ-বিসুখ দূরে থাকে’, বলেন নূর বেগম।

‘আমাদের একটা বড় ঝামেলা হল ছোট মেয়েদের বিয়ে আটকানো। বাবা-মায়েরা খুব কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দিতে চান, এমনকি ১৩ বা ১৪ বছর বয়সের মেয়েদেরও। আমার কথা একটাই। ১৮ বছর হওয়ার আগে কোনো বিয়ে না’, বললেন নূর বেগম।

সহকর্মী সংস্থ্যা ব্র্যাকের মাধ্যমে আরও ৮০০ রোহিঙ্গা কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবকদের সাহায্য করে ইউনিসেফ। এর বাইরেও রোহিঙ্গাদের জন্য অনুষ্ঠান তৈরি করে ক্যাম্পে রেডিও সম্প্রচারের ব্যবস্থা করেছে ইউনিসেফ। রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে রেডিও লিসেনারস ক্লাবও তৈরি করা হয়েছে। এই ক্লাবগুলোর সদস্যরা রেডিওতে উপস্থাপিত রোহিঙ্গাদের পারিবারিক ও সামাজিক জীবন নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন।

‘গুজব ছড়ায় দাবানলের মতো। এর ফলে আমাদের কাজে অনেক বাধা তৈরি হয়, বিশেষ করে টিকাদানের ক্ষেত্রে’, বলেন অরুনিমা ভাটনাগার, ইউনিসেফের কমিউনিকেশন ফর ডেভলপমেন্ট অফিসার।   

‘কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক ছাড়াও আমরা মসজিদের ইমাম ও সমাজের অন্য নেতাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ এই কাজে নিয়ে থাকি।’

তা ছাড়াও ইউনিসেফের সাহায্যে ১২টি তথ্য ও প্রতিক্রিয়া জানার কেন্দ্র আছে ক্যাম্পগুলোতে। সেগুলোর মাধ্যমে সঠিক তথ্য প্রচার করা হয় এবং সেগুলোকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার আহবান করা হয়।

প্রিয় সংবাদ/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...