আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ছবি: সংগৃহীত

‘খুব কি তাড়া ছিল যাবার? ধুর, এসব ভাল্লাগে না আর’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রিয়জন, সহ-শিল্পী, ভক্ত-অনুরাগীরা স্মরণ করে স্ট্যাটাস, পোস্ট দিয়েছেন।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিয়.কম
প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:১৭ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:১৯
প্রকাশিত: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:১৭ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:১৯


আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বরেণ্য সুরকার, গীতিকার, সংগীত পরিচালক, মুক্তিযোদ্ধা আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে আফতাব নগরের নিজ বাসায় সুরের মায়া কাটিয়ে পৃথিবী ত্যাগ করেছেন। এরপর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই শিল্পীকে তার প্রিয়জন, সহ-শিল্পী, ভক্ত-অনুরাগীরা স্মরণ করে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে কয়েকজনের স্ট্যাটাস তুলে ধরা হলো— 

অভিনেতা মাসুম আজিজ লিখেছেন,

আরও ক’টা দিন থেকে গেলে হতো না? আরও কিছু কথা বলে গেলে হতো না? সুর ও বাণী আরও কিছু রেখে যেতে পারতে, খুব কি তাড়া ছিল যাবার? ধুর, এসব ভাল্লাগে না আর।

অভিনেতা রিয়াজ আহমেদ লিখেছেন,

বীর মুক্তিযোদ্ধা, আলোকিত দেশপ্রেমিক, সংগীত পরিচালক, গীতিকার ও সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই কৃতজ্ঞতা ও বিনম্র শ্রদ্ধা আপনার বিদেহী আত্মার প্রতি। আজকের রিয়াজ হয়ে ওঠার পেছনে আপনার অবদান অনেক। যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে জীবনে অমর হয়ে রয়, সেই প্রেম আপনাকে দিলাম, হৃদয়ের মণিকোঠায় আপনার ছবি রেখে দিলাম।

অভিনেতা নিরব হোসেন লিখেছেন, 

আমার সৌভাগ্য যে উনার সাথে একটা মুভিতে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। আমি এই সব্যসাচী সংগীতজ্ঞের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের জন্য সমবেদনা জানাচ্ছি। আল্লাহ উনাকে ওপারে শান্তি দিন। আমীন।

সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, গীতিকার, ও সঙ্গীতশিল্পী শওকত আলী ইমন লিখেছেন,

একে একে সবাই তো চলে যাচ্ছেন। তবুও আপনার কী এতই তাড়া ছিল! আমাকে প্রায়ই বলতেন- ইমন তোর সাথে আমার অনেক কথা আছে, কই কথাগুলো তো বলে গেলেন না বুলবুল ভাই। আপনি ছিলেন আমার গুরু, আমার শিক্ষক, আমার সব ভালো কাজের উৎসাহ প্রেরণকারী বটবৃক্ষ। আপনি এ দেশের জন্য যা দিয়ে গেছেন, যতদিন এ জাতি বেঁচে থাকবে, আপনার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে সবার হৃদয়ে বুলবুল ভাই। অনেক পেয়েছি-শিখেছি আমিও আপনার কাছ থেকে। কত শত দিন-রাত পার করেছি স্টুডিওতে আপনার সাথে, নিজের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন আজীবন, সবই এখন স্মৃতি। আল্লাহ আপনাকে বেহেশতের শ্রেষ্ঠতম স্থানে অভিষিক্ত করুন। 

কণ্ঠশিল্পী দিনাত জাহান মুন্নী লিখেছেন,

আমাদের আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই আর নেই । ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহি রাজেউন।

অভিনেত্রী বিজরী বরকতুল্লাহ লিখেছেন,

সব কটা জানালা খুলে দাও না…আপনার চার দেয়ালের মাঝে বন্দী হয়ে থাকার আজ অবসান হলো বুলবুল ভাই। অনন্তলোকে শান্তিতে থাকবেন হে বীর যোদ্ধা। বিনম্র শ্রদ্ধা।

গীতিকার, সুরকার ও সংগীতশিল্পী শফিক তুহিন লিখেছেন,

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই সবকটা জানালা খুলে দাও না...

কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা লিখেছেন,

বাংলার বুলবুল, যেখানেই যান, ভালো থাকেন যেন।

আমাদের আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আসলে বাংলার বুলবুল। একাধারে তিনি ছিলেন শক্তিমান লেখক, সুরস্রষ্টা, এবং মিউজিক কম্পোজার। গানের জগতে তিনি ছিলেন সব্যসাচী। সারা জীবন তিনি গান নিয়ে গবেষণা করেছেন। আঞ্চলিক সুর থেকে শুরু করে আরব্য পারস্য ভারতীয় স্পেনীয় সুর নিয়ে নাড়াচাড়া করে তার সাথে নিজের ভালবাসা মিশিয়ে সুরের আবহ তৈরি করেছেন। তার গানে প্রেম, বিরহ, কটাক্ষ, অনুরাগ, দেশপ্রেম, শিশুর সারল্য, সামাজিক নাটকীয়তা, বিদ্রোহ, চাহিবামাত্রই পাওয়া যেত।

তাই ছবির গানের ফরমায়েশি জগতে তার কদর ছিল আলাদা। তার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল নিজেই গান লিখতেন, তাই সুর আরও সুন্দর করে বসে যেত। মনে হতো এই গানের সুর ও কথা একসাথেই জমজ হয়ে জন্ম নিয়েছে! তিনি আসলে একজন স্বভাবকবি ছিলেন। মুখে মুখে গান বানানোর অসম্ভব দক্ষতা তার ছিল। একই সাথে নিজের সৃষ্টিকে অবহেলা করার দারুণ স্পর্ধা ও ছিল।

গান রেকর্ড হয়ে গেলে সে লেখা তিনি ছিঁড়ে ফেলতেন। আমরা আপত্তি জানালে বলতেন, আমার গান আমি কেন সংগ্রহ করব। গান ভালো হলে কালের প্রবাহেই তা জমা থাকবে।

ব্যক্তিগত জীবনে বোহেমিয়ান টাইপ মানুষটা নিজের জন্য কিছুই করেন নাই। গান গান গান করেই জীবন পার করলেন। জীবনের প্রথম দিকে বেহালা গিটার বাজাতেন, মাঝ বয়সে এসে সেগুলোকেই আবার নতুন করে শেখার জন্য কি প্রচেষ্টাই না ছিল তার! কিন্তু নিজেকে আরও জ্ঞানের গভীরে নিতে নিজেই নিজের শিক্ষক ছিলেন।

অসম্ভব সাহসী মুক্তিযোদ্ধা সারা জীবন তার গানেও অপার দেশপ্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ তুলে ধরেছেন। ছবির গানেও তিনি নিজে বায়না করে দেশের গান ঢোকাতেন। ভালো কন্ঠের জন্য তিনি শিল্পী খুঁজে বেড়াতেন আজীবন। আমাকে তিনিই নিজে খুঁজে বের করেছিলেন। ৯২ সালের কথা, একটা অনুষ্ঠানে কণ্ঠশিল্পী শাকিলা আপা বললেন কনক, বুলবুল ভাই তোকে খুঁজছেন, তাড়াতাড়ি যোগাযোগ কর। এর পর উনিই আবার ফোন দিলেন। পয়লা গান ছিল ‘সাদা কাগজ এই মনটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম’ মিলু ভাইয়ের সাথে ডুয়েট।

সেদিনই বুলবুল ভাই বললেন ভাবী, ইনশাআল্লাহ অনেক গান হবে, আপনাকে এমন জায়গায় নিয়ে যাব যে কখনো পিছনে তাকাতে হবে না! সত্যিই সেদিন থেকেই আমার আর অবসর ছিল না। বুলবুল ভাই মাসে গড়ে প্রায় দশটা ছবি হাতে নিতেন এবং তার বেশির ভাগ গান আমাকে দিয়েই গাওয়াতেন। নিজে অনেক গবেষণা করতেন কিন্তু গানের কণ্ঠের ব্যাপারে নির্ভরশীল হতে চাইতেন। এর পর আসলেই আমাকে পেছনে তাকাতে হয়নি। প্রায় প্রতিটি গানই মাইলফলক হয়ে যাচ্ছিল। তার গানেই প্রায় সব পুরস্কার পাওয়া আমার! তার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।

কদিন আগে তিনি যখন অসুস্থ হলেন খোঁজ নিতে ফোন দিলাম, তখন গানপাগল মানুষটা সব কথা বাদ দিয়ে বললেন, ভাবী অনেক সাধনার পরে গানটি ধরেন তো! আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেতেই আমার হাজবেন্ড বললেন, গাও। আমি আরও বিপদে পড়তেই বুলবুল ভাই গানটি নিজেই শুরু করলেন। আমি তার সাথে গলা মিলিয়ে পুরো মুখটি গাইলাম! হঠাৎ উনি আমাকে অনেক দোয়া করলেন! আমি হচকচিয়ে গেলাম। এটাই আমার ওনার সাথে শেষ কথা। পরিচয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওনার দোয়া পেয়ে গেলাম, সাথে পেলাম অসংখ্য অনবদ্য গান, যা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। কি দিয়ে আমি তার ঋণ শোধ করি আমি আসলেই জানি না!

আমি বিশ্বাস করি আমরা পুরো জাতিই ধন্য যে আমাদের একজন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল আছে। আর একটি কথা আমি উচ্চ কণ্ঠে বলতে চাই, ‘সব কটা জানালা খুলে দাও না’ এই গানটি ছাড়া আর যদি কোনো গানই সুর না করতেন, তাহলেও বাংলাদেশ তার কাছে সমান কৃতজ্ঞ থাকত।

২২ জানুয়ারি, মঙ্গলবার ভোর সোয়া ৪টার দিকে আফতাব নগরের নিজ বাসায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান বুলবুল। গত প্রায় এক বছর ধরে নানা অসুস্থতায় ভোগা এই সুরকারের বয়স হয়েছিল ৬২ বছর।

প্রিয় বিনোদন/মিঠু/রিমন

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...