ফাইল ছবি

নির্বাচনি অনিয়মের তথ্য-প্রমাণ দিয়ে বই প্রকাশের উদ্যোগ বিএনপির

বিএনপি আগামীতে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:২১ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:২১
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:২১ আপডেট: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৭:২১


ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয় ঘটেছে। দলটি যেমন ভোট বিপ্লব ঘটাতে পারেনি তেমনি তাদের ভাষায় নির্বাচনে কারচুপির বিরুদ্ধেও বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। তবে ক্ষমতায় না যেতে পারলেও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অর্জন একেবারে নেই তা মানতে নারাজ বিএনপি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এককভাবে ২৫৭টি আসন পেয়েছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি পেয়েছে ২২টি আসন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র আটটি আসন পেলেও এখনো শপথ নেয়নি।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জোট শরিকদের সরকারে রাখা হয়নি। বলা হচ্ছে, তারা বিরোধী দলে থাকবে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জাতীয় পার্টি সরকারে না বিরোধী দলে থাকবে, বেশ কয়েক দিন সিদ্ধান্তহীন থাকার পর জানা গেল তারা বিরোধী দল।

এদিকে রাজনীতির আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দল কে হবে, সেটিও ঠিক করে দিচ্ছে সরকারি দল। 

বিএনপির নীতি নির্ধারকদের ভাষ্য, দলীয় সরকারের অধীনে একটি নির্বাচন বয়কট এবং একটিতে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে বিএনপির যে অর্জনটি হয়েছে তাতে আগামী দিনে পথ চলতে তাদের আর অসুবিধা হবে না। বরং ভবিষ্যৎ লড়াইয়ে তারা অবশ্যই জয়ী হবে। যদিও সেই লড়াইটা কী ধরনের হবে তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিএনপি আগামীতে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চিন্তা আপাতত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেছে। এমনকি স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নয়। সরকার হটানোর জন্য ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করবে তারা। তবে তার আগে বিদেশিরা কী করে সেটিও দেখতে চায় দলটি। তারই অংশ হিসেবে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আসনভিত্তিক অনিয়মের বিরুদ্ধে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করছে বিএনপি।

বিএনপি নেতাদের ভাষ্য, বিদ্যমান বাস্তবতায় ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না, সিনিয়র আইনজীবীদের এমন মতামত আমলে নিয়েই একযোগে সব প্রার্থী মামলা করার বদলে অতিমাত্রায় অনিয়ম হওয়া কয়েকটি আসনের বিষয়ে মামলা করার চিন্তা করছে। তাই অনিয়মের সব তথ্য জাতিকে জানাতে তথ্য-প্রমাণসহ একটি বই প্রকাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ভিডিও ফুটেজের সিডিও প্রস্তুত করা হচ্ছে। এমনকি কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে বিএনপির বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে পুরনো কমিটি।

এদিকে কাউন্সিল করে ঘুরে দাঁড়ানোর যে পরিকল্পনা চলছে, তা বাস্তবায়ন করতে খালেদা জিয়ার প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিএনপির সিনিয়র নেতারা। তারা বলছেন, বেগম জিয়া মুক্তি না পেলে কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করা সম্ভব হবে না। কারণ নির্বাচনে ভরাডুবির পর দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মাঝে নতুন করে হতাশা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তেমনি সরকার কারচুপি করে একচেটিয়া জয় পেয়েছে বলে তারা বিশ্বাসও করেন না।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের ভাষ্য, এক যুগ ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে রয়েছে। এই পুরো সময়টায় দলটিকে বিপর্যয়ের মধ্যে থেকে চলতে হয়েছে। সর্বশেষ খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার বিষয়টি দলটিকে বড় সংকটে ফেলেছিল। তারপরও আশা ছিল এই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসুক আর না আসুক, অন্তত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে থাকবে এবং গণতান্ত্রিকভাবে রাজনীতি করা যাবে। যদিও এবারের নির্বাচনে বিএনপি একেবারে অগোছালো ছিল। নির্বাচনে যাবে কি না—নেতাকর্মীরা সেটা জানতেন না, অন্ধকারে ছিলেন। পাশাপাশি কর্মীদের তৈরি করে মাঠে নামানো—সে ধরনেরও কোনো কিছু ছিল না। তবে সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপির দীর্ঘদিনের দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া হবে না—এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসাটা ঠিক ছিল না। তাই এখন নেতাকর্মীরা এলাকায় টিকে থাকতে পারবেন কি না—এমন প্রশ্ন উঁকি দিয়েছে। আসলেই কি সামনে এগিয়ে যাবে বিএনপি?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনের পরে সব ক’টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীর সঙ্গে বৈঠক করেন বিএনপি নেতারা। সব প্রার্থীই মামলার ব্যাপারে একমত হন। এ জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার কথাও বলা হয় প্রার্থীদের। মামলা করার জন্য সব প্রার্থীর কাছে অনিয়মের দালিলিক প্রমাণ চাওয়া হয়। এর মধ্যে অনেক প্রার্থী বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত জমা দিয়েছেন। নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি, এজেন্ট ও নেতাকর্মীদের গ্রেফতার, নির্বাচনি সহিংসতায় হতাহতদের তালিকা, প্রতিটি কেন্দ্রের অস্বাভাবিক ভোটের হিসাবসহ আটটি বিষয়ে তথ্য-প্রমাণসহকারে প্রতিবেদন দেন প্রার্থীরা।

এ ছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে ফল প্রকাশ পর্যন্ত কী ধরনের প্রতিবন্ধকতার মধ্যে পড়তে হয়েছে—এসব বিষয়ের ভিডিও ফুটেজও দেন অনেক প্রার্থী। অনিয়মের পর্যাপ্ত দালিলিক প্রমাণ পাওয়ার পরে মামলার জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন বিষয়ে আইনজীবীসহ অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নেওয়া হয়। কিন্তু তাদের অনেকেই বাস্তব অবস্থা বিবেচনা করে মামলার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেন।

সূত্রের ভাষ্য, মামলা করার জন্য সব ধরনের দালিলিক প্রমাণ তারা হাতে পেয়েছেন। প্রার্থীদের নিজস্ব প্রমাণ ছাড়াও দেশি ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও নির্বাচনে অনিয়মের অনেক প্রমাণ তাদের কাছে আছে। এই অবস্থায় ট্রাইব্যুনালে মামলা করাই উচিত ছিল। কিন্তু আদালতের ওপর বিএনপি আর আস্থা রাখতে পারছে না। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করার বিষয়ে আইনজীবী বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হচ্ছে, আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাওয়া যাবে না, বরং আইনিভাবে ৩০ ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে। তাদের পরামর্শ এবং নানা বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালে মামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে বিএনপি।

প্রসঙ্গত, নির্বাচনি ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টের নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হয়। ২ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৮ আসনের ফলের গেজেট জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে পাঠানো হয়। আর ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এ হিসাবে এ মাসের বাকি সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে মামলা করতে হবে।

বিএনপি কেন এমন নির্বাচনে গেল—এ প্রশ্নটি দলের ভেতরে-বাইরে অনেকেই করছেন। এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়, এটা প্রমাণের প্রয়োজন ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আমরা যাইনি, এ জন্য দলের ভেতরেও অনেকে প্রশ্ন করত। নির্বাচনে গেলে জয়ী হওয়া যেত—এমন ধারণা অনেকের মধ্যে রয়েছে। সেই ভুল এবার ভাঙল।’

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী