হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি

অসুস্থ এরশাদ, সরব রাজনীতি অঙ্গন

নির্বাচিত হলেও অসুস্থতার কারণে এক দিনও প্রচারণায় যেতে পারেননি। গত ৫ জানুয়ারি হুইলচেয়ারে করে সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে এমপি হিসেবে শপথ নেন জাপা চেয়ারম্যান এরশাদ।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৫ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:১০
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৫ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ১০:১০


হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) অসুস্থতায় বরাবরই বাংলাদেশে রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচিত ব্যক্তি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। গত ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তাকে (এরশাদ) সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরে দলটির নেতৃবৃন্দ এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেও সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে স্বেচ্ছায় তিনি সেবার হাসপাতালে যাননি।

গত কয়েক দিনে সাবেক এই জেনারেলের অসুস্থতার খবর নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। কেননা তিনি মূলত ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল সিএমএইচে চিকিৎসা নেন, তবে তার চিকিৎসার বিস্তারিত প্রায় কখনোই প্রকাশ করা হয় না। ১৯৩০ সালে জন্ম নেওয়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১ ফেব্রুয়ারি ৯০ বছরে পা দেবেন।

সাম্প্রতিক সময়ে সাবেক এই সামরিক শাসকের শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়েছে বলে তার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এবং মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে তিনি দ্বিতীয় দফায় চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যান। এর ঠিক আগে তিনি ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন এবং একাদশ সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর দিন অর্থাৎ ডিসেম্বরের ১০ তারিখ তিনি সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন।

ওই সময়ে রক্তে হিমোগ্লোবিনের সমস্যা নিয়ে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন এরশাদ। তখন ১৬ দিন চিকিৎসা শেষে নির্বাচনের আগে ২৬ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তিনি। তার আগে অবশ্য নভেম্বরের মাঝামাঝি প্রায় দুই সপ্তাহ তিনি সিএমএইচে চিকিৎসা নেন। রংপুর-৩ আসন থেকে এবারও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও অসুস্থতার কারণে এক দিনও প্রচারণায় যেতে পারেননি। গত ৫ জানুয়ারি হুইলচেয়ারে করে সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে এমপি হিসেবে শপথ নেন।

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান এবং জেনারেল এরশাদের ভাই জিএম কাদের গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তার ভাই বেশ কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছেন। সর্বশেষ তিনি খুবই দুর্বলতায় ভুগছিলেন। তিনি আস্তে আস্তে দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়ে যাচ্ছিলেন। এখানকার চিকিৎসকরা চেষ্টা করছিলেন সেটা কাটাতে, কিন্তু সেটার প্রগ্রেস তাদের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি, সে জন্যই সিঙ্গাপুরে ডাক্তারদের সাথে যোগাযোগ করে সাবেক রাষ্ট্রপতিকে সেখানে আরো একবার পাঠানো হয়েছে।

কিছুদিন আগে জেনারেল এরশাদের হার্টের ভালভে একটি অপারেশন হয়েছিল। এ ছাড়া তিনি লিভারের সমস্যায় ভুগছিলেন, যে কারণে তার হজমেও সমস্যা হচ্ছিল। এর বাইরে তার রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদনে সমস্যা রয়েছে। জেনারেল এরশাদের সঙ্গে সিঙ্গাপুরে গেছেন তার ছোট ভাই হুসেইন মোর্শেদ এবং তার স্ত্রী। এ ছাড়া সঙ্গে আছেন তার ব্যক্তিগত সহকারী।

এদিকে গত কয়েক দিন ধরে এরশাদের অসুস্থতা নিয়ে গণমাধ্যম এবং সামাজিকমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। কোনো কোনো খবরে সাবেক রাষ্ট্রপতি বাকশক্তি এবং চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন বলেও জানানো হয়েছে। অন্য সময়ে বিদেশ যাওয়ার আগে তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে কিছু বলে যান, কিন্তু এবার তেমনটা হয়নি।

নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে এইচএম এরশাদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়ানোর পরিপ্রেক্ষিতে ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান অসুস্থ এবং তাকে বিদেশে পাঠানো হতে পারে। ২৭ নভেম্বর, মঙ্গলবার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে নিজের মনোনয়নপত্র দাখিলের পর ফেনীতে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক।

ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এরশাদ রাজনৈতিকভাবে অসুস্থ নয়, সত্যিকারভাবেই তিনি অসুস্থ। তাকে দুই-এক দিনের মধ্যে সিঙ্গাপুর হাসপাতালে নেওয়া হতে পারে।’

এদিকে এরশাদের অবর্তমানে বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিদেশে থাকাকালীন জাপার কো-চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। ১৮ জানুয়ারি জাপার পক্ষ থেকে এরশাদ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য জানানো হয়। অবশ্য ‘সাংগঠনিক নির্দেশনা’ শিরোনামে লেখা ওই চিঠিতে এরশাদ স্বাক্ষর করেছেন গত বুধবার।

তখন জিএম কাদের গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘এরশাদ সাহেবের অবর্তমানে কিংবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে থাকাকালে কে দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন—তা নিয়ে যেন কোনো অস্পষ্টতা না থাকে, সে কারণেই তিনি বিষয়টা একদম স্পষ্ট করে দিয়েছেন। অসুস্থ হলেও তার মানসিক অবস্থা ঠিক আছে। সেই কারণে বিদেশে যাওয়ার আগে তিনি সবকিছু ঠিকঠাক করে যাচ্ছেন।’

এর আগে এরশাদ গত ১ জানুয়ারি এক চিঠিতে তার অবর্তমানে জাপার চেয়ারম্যান পদে জি এম কাদেরের নাম ঘোষণা করেছিলেন। ‘অবর্তমান’ শব্দটি স্পষ্ট না হওয়ায় দলের ভেতরে এ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়। এই ধোঁয়াশা দূর করতেই এরশাদ নতুন করে নির্দেশনা দেন।

১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা আন্দোলনের সূচনা করেছিল। সেদিন ঢাকায় শিক্ষা ভবন অভিমুখে ছাত্রদের মিছিলে পুলিশের গুলিতে বেশ কয়েকজন নিহত হন। সেই আন্দোলন কালক্রমে গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল এবং জেনারেল এরশাদের শাসনের পতন হয়েছিল নব্বইয়ের শেষে। কিন্তু গণ-আন্দোলনের মুখে পতন হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছেন জেনারেল এরশাদ।

বিশ্লেষকদের অনেকে এ জন্য আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি—প্রধান দুই দলের ক্ষমতার রাজনীতিকে দায়ী করেন। নব্বইয়ের শেষে জেনারেল এরশাদের পতনের সাথে সাথেই ঢাকার রাস্তায় হাজার হাজার মানুষ নেমে এসেছিল। মানুষের উচ্ছ্বাস-আনন্দে সে সময় নগরীর রাস্তাগুলো ভিন্ন চেহারা ধারণ করেছিল। সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে এখনো অনেকে বিস্মিত হন রাজনীতিতে জেনারেল এরশাদের অবস্থান দেখে।

ওই সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দল এবং বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল এবং এর বাইরে অন্যান্য দল যুগপৎ আন্দোলনে নেমেছিল। অবশ্য আন্দোলন মাঝেমধ্যে থমকে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সব দলের ঐক্যবদ্ধ গণ-আন্দোলনের মুখে জেনারেল এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। তখন তাকে জেলে নেওয়া হলেও পরে রাজনীতিতে ভূমিকা রাখার মতো তার একটা অবস্থান তৈরি হয়।

সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের একপর্যায়ে ১৯৮৬ সালে নির্বাচনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ জেনারেল এরশাদকে একধরনের বৈধতা দিয়েছিল বলে দলটির বিরুদ্ধে সমালোচনা রয়েছে। পরে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ জাতীয় পার্টির সমর্থন নিয়েছিল।

২০০৮ সালের নির্বাচনে তারা মহাজোট করেছিল। ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনেও অনেক নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টিকে সাথে রাখতে সক্ষম হয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু জেনারেল এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বিএনপিই ক্ষমতায় এসেছিল। তখন এরশাদের বিরুদ্ধে হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১০টির বেশি মামলা হয়েছিল। মাত্র একটি মামলায় সে সময় বিচার শেষ হয়েছিল।

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি জেনারেল এরশাদকে নিয়ে চারদলীয় জোটও গঠন করেছিল। এ ছাড়াও বিএনপি বিভিন্ন সময় জেনারেল এরশাদকে সাথে রাখার চেষ্টা করেছে। তবে জাতীয় পার্টির নেতারা অবশ্য মনে করেন, ক্ষমতা ছাড়ার পর জেলে থেকেই ’৯১-এর সংসদ নির্বাচনে জেনারেল এরশাদ নিজে পাঁচটিসহ তাদের দল ৩৫ আসন পেয়েছিল। সেটাকে ভিত্তি করে তাদের নেতা কৌশলে রাজনীতিতে তাদের অবস্থান তৈরি করেছেন।

বিবিসি বাংলা সূত্রে জানা যায়, রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান মনে করেন, আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি—প্রধান দুই দলের কাছে ভোটের রাজনীতি প্রাধান্য পায়। সেই সুযোগে জেনারেল এরশাদ এবং তার দল জাতীয় পার্টি রাজনীতিতে বৈধতা পেয়েছে।

রওনক জাহান বলেন, ‘নির্বাচনে গণতন্ত্র যখন ফেরত এলো, ১৯৯১ সালের পর থেকে আমরা যে ক’টা নির্বাচন দেখেছি, ওদের পপুলার ভোটের শেয়ার যে অনেক আছে, তা নয়। কিন্তু কয়েকটা আঞ্চলিক জায়গায় এরশাদ নিজে এবং তার দলের কিছু লোক নির্বাচিত হয়ে আসতে পারছেন।’

রাজনীতিবিষয়ক গ্রন্থের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ বিশ্লেষণ করছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতির যে বিভাজন, দুই পরাশক্তি বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ—এদের একজনের বিরুদ্ধে আরেকজনকে খেলিয়ে অনেক সময় এরশাদ এর সুবিধা নিতে পেরেছেন।’

মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, ‘আমরা তো সুদূর অতীতটা ভুলে যাই, নিকট অতীত মনে রাখি। এরশাদের যত খারাপ কাজ আছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করা, সংবিধানকে বিকৃত করা, এগুলো অনেক কিছু করেছে। কিন্তু ওই যে গণতন্ত্রের কথা বলেন যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি—তারা তাকে ব্যবহার করতে চেয়েছে। তাকে শাস্তি দিতে চায়নি এবং শাস্তি যদি দিতেও চেয়ে থাকে, সেটাও হচ্ছে, শাস্তির ভয় দেখিয়ে ব্যবহার করার জন্যে। এ জন্যেই কিন্তু এরশাদ টিকে গেছেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাশে বটতলায় জড়ো হয়ে সেখান থেকেই ছাত্ররা জেনারেল এরশাদের বিরুদ্ধে প্রথম মিছিল বের করেছিলেন। তাদের মতো এখন নতুন প্রজন্মও রাজনীতিতে এরশাদের অবস্থানকে মেনে নিতে পারেন না। তারাও মনে করেন, এমন পরিস্থিতির জন্য প্রধান দুই দলেরই দায় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শারমিন জাহান বলেন, ‘এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা এবং দেউলিয়াপনার কারণে এরশাদের মতো স্বৈরশাসক এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে রয়েছে।’

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

জেলার যখন নিজেই জেলে...

প্রিয় ৮ ঘণ্টা, ১৯ মিনিট আগে

loading ...