ছবি সংগৃহীত

যাযাবর পাখিদের পুণ্যভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর

পাখিরা একদিনের জন্য যে দেশে অবস্থান করে, তারা সেই দেশেরই।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৯ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪০
প্রকাশিত: ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ০৮:৪৯ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪০


ছবি সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) যে পাখি একদিন এদেশে দেখা যায়, সেটাও এদেশেরই পাখি৷ হউক সেটা দেশি কিংবা বিদেশি। তবে কিছু পাখি এ দেশে সারা বছর থাকে, কিছু পাখি নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে থাকে না৷ যদিও বলা হয়ে থাকে পাখি এরকমই হয়৷ কেননা পাখিদের খাবারও নাকি এক মহাদেশে সারা বছর থাকে না৷ কিছু পাখি গ্রীষ্মে বা শীতে খাবারের জন্য বিভিন্ন দেশে গমন করে। একই সঙ্গে প্রজননের জন্য পাখিদের আলাদা জায়গায় থাকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়৷ এইরকম আসা যাওয়া করা পাখিদের বলা হয় পরিযায়ী পাখি। বিস্ময় জাগে প্রকৃতপক্ষে কোন পাখি কোন দেশের?

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, পাখিরা একদিনের জন্য যে দেশে অবস্থান করে, তারা সেই দেশেরই৷ সেক্ষেত্রে এক পাখি বহু দেশের পাখি হিসেবে গণ্য হতে পারে৷ যেমন সুমচাও একটি পাখি যারা কিনা গ্রীষ্মে বাংলাদেশে জন্ম হলেও তাদের খাবার শীতকালে এই দেশে থাকে না। ফলে অনেকটাই বাধ্য হয় দেশ ছেড়ে চলে যেতে হয় তাদের। তারা চলে যায় দক্ষিণে, যেমন মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ায়৷ তারাই আবার গ্রীষ্মে এই দেশে ফিরে আসে৷ কথা উঠে তাহলে এই পাখি কোন দেশের? আসলে এটা যেমন বাংলাদেশেরও, তেমনি মালয়েশিয়ারও৷ ঠিক কিছু পাখি রয়েছে যারা শুধু শীতকালে বাংলাদেশে আসলেও প্রজননের জন্য হিমালয়ে চলে যায়, তিব্বতে চলে যায় বা তুন্দ্রা অঞ্চলে চলে যায়৷ অবশ্যই তারাও বাংলাদেশের পাখি৷ ওরা সাইবেরিয়ারও পাখি৷ সংশ্লিষ্টদের তথ্য মতে, বাংলাদেশে যে ৭০০ প্রজাতির পাখি রয়েছে, এর প্রায় সাড়ে ৩শ’ প্রজাতির পাখিই সারা বছর বাংলাদেশে থাকে না৷

দেশে পাখিদের সবচেয়ে পরিচিত বিচরণ ভূমি হলো টাঙ্গুয়ার হাওর। সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলায় টাঙ্গুয়ার হাওরের অবস্থান৷ শীত মৌসুমে সবচেয়ে বেশি যে পরিযায়ী পাখিরা টাঙ্গুয়ার হাওরে আসে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সাপ পাখি, বড় পানকৌরি, ছোট ডুবুরি, বড় খোপা ডুবুরি, ধুপনি বক, বেগুনি বক, মেটে রাজহাঁস, চখাচখি, ছোট সরালি, বড় সরালি, লেনজা হাঁস, খুনতে হাঁস, পাটারি হাঁস, ফুলুরি হাঁস, গিরিয়া হাঁস, সিঁথি হাঁস, পাতি হাঁস, বালি হাঁস, লাল ঝুটি ভুতি হাঁস, পাতি ভুতিহাঁস, পান্তা ঝিলি, মেটেবুক ঝিলি, জল মোরগ, লালবুক গুরগুরি, নেউ পিপি, কায়েম, দলপিপি, কুট, লাল ঢেঙ্গা, মেটেমাথা টিটি, তিলা লালপা, লালপা, সবুজপা, বিল বাটান, সোনালি বাটান, কালোমাথা গাঙচিল, খয়রামাথা গাঙচিল, কুরা, বড় চিত্রা ঈগল, তিলা নাগ ঈগল ইত্যাদি৷

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ হাওরে বসে পাখিদের মিলনমেলা৷ তবে সম্ভবত ফেব্রুয়ারি মাসে সবচেয়ে বেশি পাখির দেখা মেলে৷ সব মিলিয়ে প্রতি বছর প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখির সমাগম ঘটে৷ এ ছাড়া হাওরে বাস করে প্রায় ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১৫০ প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ, ৩৪ প্রজাতির সরিসৃপ ও ১১ প্রজাতির উভচর প্রাণী৷

ছোট-বড় মিলিয়ে ১২০টি বিল আছে টাঙ্গুয়ার হাওরে৷ পরিযায়ী পাখি আর মাছের অভয়ারণ্য বিস্তীর্ণ এ জলাশয় জুড়ে৷ বর্ষায় পুরোটাই পানিতে ডুবে থাকলেও শীতে পানি কমতে থাকে৷

আশঙ্কার কথা বাংলাদেশে পাখিদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে, কারণ, সারা বিশ্বেই কমে যাচ্ছে৷ গত ৩০ বছরের হিসাব অনুযায়ী সারা বিশ্বেই পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে৷ আর এশিয়া মহাদেশে এ অঞ্চল অনেক বেশি উন্নত হচ্ছে৷ উন্নত বলতে, এখানে রাস্তাঘাট হচ্ছে, দালানকোঠা হচ্ছে৷ ফলে পাখির বসবাসের জায়গা কমে যাচ্ছে৷ শুনতে কিছুটা অবাক লাগলেও এটাই সত্যি মানুষের যেমন বসবাসের জায়গা লাগে, তেমনি পাখিরও বসবাসের জায়গা লাগে৷ সেই সঙ্গে পরিবেশ দূষণ যে হারে হচ্ছে, তার কারণে অনেক পাখি মারা যাচ্ছে৷ মোট কথা, পাখি কমে যাচ্ছে তাদের জায়গা কমে যাচ্ছে৷ তাদেরও তো প্রজননের জায়গা লাগে, থাকার জায়গা লাগে।

আশার কথা হলো বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে পাখিদের সংরক্ষণে বেশকিছু শক্তিশালী পদক্ষেপ নিয়েছে। তাই কোথাও না দেখা গেলেও টাঙ্গুয়ার হাওর পাদদেশে কিছু পাখি টিকে রয়েছে৷ এর অন্যতম কারণ কিছু এলাকায় সরকার মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রিত করেছে৷ তারমধ্যে হাওরাঞ্চলের বেশকিছু এলাকা সংরক্ষিত করেছে৷ ফলে সেখানে কিছু পাখির বসবাস লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। যেমন সুন্দরবনকে সরকার সংরক্ষিত করেছে৷ কিছু কিছু যে নষ্ট হয়নি, তা নয়৷ 

প্রায় সাড়ে ৩শ' প্রজাতির পাখি শীতে বাংলাদেশে থাকে, কিন্তু প্রজনন করে না৷ প্রজননের সময় হলে উত্তর গোলার্ধের চলে যায় তারা৷ তখন তারা উত্তরে মানে হিমালয়, তিব্বত, মঙ্গোলিয়া বা আরও উত্তরে সাইবেরিয়ায় চলে যায়৷ আর ১০ থেকে ১২ প্রজাতির পাখি আছে, যারা গ্রীষ্মেই শুধু বাংলাদেশে থাকে, শীতে এখানে থাকে না, দক্ষিণে চলে যায়, যেখানে শীতেও কিছুটা আর্দ্র৷

যেখানে মানুষের বসতি কম, সেখানেই পাখির বসবাস বেশি৷ যেমন, উপকূলে মানুষের বসতি কম, কারণ, সেখানে মানুষ বসবাস করতে পারে না৷ সেখানে পাখির বসতি বেশি৷ আবার সিলেটের বিস্তীর্ন হাওরঞ্চালে মানুষের পক্ষে বসবাস করা কঠিন, সেখানেও পাখির বেশি বসবাস৷ অর্থাৎ যেখানে মানুষের বসবাস বা চলাফেরা কম সেখানেই পাখির বসবাস বেশি৷

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, বাংলাদেশে পাখির প্রজাতির সংখ্যা ৬৫০টি৷ এর মধ্যে ৩০টি বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে বিলুপ্ত৷ অবশিষ্ট ৬২০টি প্রজাতির মধ্যে ৪৭৭ প্রজাতির পাখি বাংলাদেশে নিয়মিত দেখা যায়, বাকি ১৪৩ প্রজাতি অনিয়মিত দেখা যায়৷ নিয়মিত ৪৭৭ প্রজাতির মধ্যে ৩০১টি বাংলাদেশের ‘আবাসিক’ এবং ১৭৬ প্রজাতি ‘পরিযায়ী’ পাখি।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...