ফাইল ছবি

ইয়াবা ইস্যুতে আবারও আলোচনায় টেকনাফ

টেকনাফ উপজেলায় দোকানদার, ট্রলারের মাঝি, হোটেল বয়, রিকশাচালক, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, এমনকি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে।

মোস্তফা ইমরুল কায়েস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৩ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৫৮
প্রকাশিত: ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৪৩ আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৫৮


ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গত বছর মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলে নটক নড়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের। সম্প্রতি তারই ধারাবাহিকতায় বন্দুকযুদ্ধে যাওয়ার ভয়ে অনেকে মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ভালোর পথে ফেরার কথা জানিয়েছেন প্রশাসনকে। শুধু কি তাই, যার বিরুদ্ধে টেকনাফে ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে সেই জনপ্রতিনিধিও এবার  ইয়াবার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন! ফলে মাদক নির্মূলের ইস্যুতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা আবারও  আলোচনায় এসেছে।

ইয়াবার পাচারের রুট হিসেবে পরিচিত টেকনাফ ‍উপজেলা। সেই টেকনাফ হঠাৎ করে আবারও আলোচনায় এসেছে। মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবা টেকনাফ সীমান্ত গলিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে প্রবেশ করে। এ উপজেলায় দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ট্রলারের মাঝি, হোটেল বয়, রিকশাচালক, মসজিদের ইমাম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও ইয়াবা ব্যবসা পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্তদের অনেকে ইয়াবা ব্যবসা করে বাড়ি-গাড়ি, ফ্ল্যাট ও অটেল সম্পতির মালিক বনে গেছেন।

মাদক চোরাচালানের জন্য আলোচিত মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী টেকনাফ এলাকায় গত দুই মেয়াদের সাংসদ আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে ইয়াবা কারবারিদের মদদ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ইয়াবা পাচারের হোতা হিসেবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় নাম এসেছিল তার। গত বছর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের মধ্যে বদির এক বেয়াইও ছিলেন। এসব কারণে সমালোচিত বদি এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাননি। বদির স্ত্রী শাহিন আকতার চৌধুরী নৌকার প্রার্থী হিসেবে কক্সবাজার-৪ (টেকনাফ-উখিয়া) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।

গত ১২ জানুয়ারি এক অনুষ্ঠানে কক্সবাজারে ইয়াবা চোরাচালানে জড়িতদের আত্মসমর্পণের জন্য পাঁচ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে বদি বলেছিলেন, ‘উখিয়া-টেকনাফে কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ী থাকতে পারবে না। কেউ যদি আত্মসমর্পণ না করে, পরে তাদের পরিণতি ভয়াবহ হবে। টেকনাফের ছেলেহারা মা-বাবা, স্বামীহারা স্ত্রী ও বাবাহারা সন্তানদের কথা চিন্তা করে এ উদ্যোগ নিয়েছি। যারা ইয়াবা ব্যবসায় জড়িত তাদের আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে আত্মসমর্পণ করতে হবে।’

কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ার ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণ করতে বলার পর গতকাল ২৬ জানুয়ারি আব্দুর রহমান বদি এলাকা ইয়াবামুক্ত করতে কয়েকশ লোক ডেকে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেন। সেই মাহফিলে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের বর্জনেরও ঘোষণা দেন তিনি। সেখানে বদি বলেন, ‘টেকনাফকে ইয়াবামুক্ত করে কলঙ্কের দাগ মুছতে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া মাদক নির্মূলের কর্মসূচি সফল করতে আলেম সমাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহের কাছে দোয়া চেয়ে মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।’

নতুন বছরে মাদকবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত র‍্যাব, পুলিশ, বিজিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ১৪ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনই টেকনাফের। এরপর শতাধিক তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী ইতোমধ্যে কক্সবাজার শহরে জড়ো হয়ে আত্মসমর্পণের জন্য নিরাপত্তা হেফাজতে এসেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। জানুয়ারির শেষে বা ফেব্রুয়ারির শুরুতে তাদের আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হতে পারে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল জানিয়েছেন।

গত বছরের শেষ দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা ইয়াবা কারবারিদের হালনাগাদ তালিকায় যে ৭৩ জনকে শীর্ষ ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তার শীর্ষে ছিলেন কক্সবাজার-৪ আসনের তখনকার সাংসদ আবদুর রহমান বদি।

বদির পত্নী সম্প্রতি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শাহিন আকতারও ইয়াবা কারবারিদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইয়াবা ব্যবসায়ীরা আত্মসমর্পণ না করলে তাদের দেশ ছাড়তে হবে। এলাকায় তাদের কোনো রেহাই নেই। কোনো ইয়াবা ব্যবসায়ী এলাকায় থাকতে পারবে না। হয় ভালো হয়ে যেতে হবে, না হয় দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে ছাড় দেওয়া হবে না।

তবে মাদকবিরোধী অভিযানের পর কথিত বন্দুকযুদ্ধে যাওয়ার ভয়ে হঠাৎ করে মাদক ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের দিকে এগিয়ে আসা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্ন উঠছে, যারা এতদিন মাদক ব্যবসা করে গাড়ি, বাড়ি ও অটেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছেন। তাদের এসব সম্পদের কী হবে? সেগুলো কি তারা জমা দেবেন নাকি মামলা করে সেগুলো সরকার নিয়ে নেবে। আবার যাদের কাছে অস্ত্র আছে বা ছিল তারা কি সেসব অবৈধ অস্ত্র জমা দেবেন? এমন সব প্রশ্নগুলোর সমাধানের ব্যাপারে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে তেমন কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে মাদকের অবাধ প্রবেশ রোধ এবং নিরাপত্তা জোরদার করতে র‍্যাব-১৫ ব্যাটেলিয়ান গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাসে এই নতুন ব্যাটেলিয়ন উদ্বোধন করা হতে পারে। ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে লোকবল নিয়োগের কাজ শেষ হবে।

গত বছরের ১৪ মে দেশব্যাপী মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানে সারা দেশে চার শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। যার মধ্যে কক্সবাজারেই ৪২ জন। আর ৪২ জনের মধ্যে ৩৮ জনই টেকনাফের। এ ছাড়াও অভিযানে কোটি কোটি টাকার মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়েছে ও মামলা হয়েছে এক লাখ ১২ হাজার ৫২২টি।

এ বিষয়ে র‍্যাব-৭-এর টেকনাফ ক্যাম্পের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, ‘অভিযান চলমান থাকায় মাদক বিস্তার রোধ হয়েছে। টেকনাফ থেকে মাদক নির্মূল করতে র‍্যাব-১৫ ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হচ্ছে।’

মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা বিষয়ে র‍্যাবের মুখপাত্র মুফতি খান বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই মাদক প্রতিরোধে কাজ করছি। এখন মাদক ব্যবসায়ীদের বিচারণ আগের মতো নেই। তবে মাদকের প্রবেশদ্বার বন্ধ করতে শিগগিরই নতুন ব্যাটেলিয়ন গঠন করা হবে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, ‘আমরা টেকনাফকে মাদকমুক্ত করতে চাই। ইয়াবা ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলে তাদের স্বাগত জানানো হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের আত্মসমর্পণ প্রক্রিয়া শিগগিরই শুরু হবে। যারা আত্মসমর্পণ করেছে তারা সবাই দোষ স্বীকার করেছে।’

প্রিয় সংবাদ/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...