বাংলা সাহিত্যের প্রয়াত কবি আল মাহমুদ। ফাইল ছবি

আল মাহমুদ ও ‘ডিলেমা’ আক্রান্তগণ

দুঃখ করে উদয় শংকর রতন বলতেন, ‘ওই কাগজে কবিতা প্রকাশের জন্য আমাকে “হিন্দু রাজাকার” বলা হয়। ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোসাই।’

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২২ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২২
প্রকাশিত: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২২ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:২২


বাংলা সাহিত্যের প্রয়াত কবি আল মাহমুদ। ফাইল ছবি

একজন অচেনা ও বিস্মৃত কবি উদয় শংকর রতন। আমৃত্যু থেকেছেন নিজ জেলা শহরে, আমাদের মতন ‘জলে ভাসা পদ্ম’ হননি। তিনি আমার জেলা শেরপুর থেকে উঠে আসা কবি। উদয় শংকর রতন আত্মহত্যা করেছিলেন। জানি না, কবি কেন বেছে নিয়েছিলেন আত্মহননের জটিল-কঠিন পথ। তবে যখনই দেখা হয়েছে, বলেছেন হতাশার কথা। বিয়ে-থা করেননি, সংসারের ভাবনা তার ছিল না, তার ভাবনায় ছিল শুধু কবিতা। নিজ গাঁটের টাকা খরচ করে কয়েকটি প্রকাশনা ছিল তার। কবিতার বইয়ের বিক্রি-বাট্টার অবস্থা তো জানাই, খরচের টাকাও উঠে আসেনি। বিভিন্ন ছোট-বড় কাগজে তার লেখা ছাপা হয়েছে, হয়েছে জাতীয় দৈনিকগুলোতেও। কিন্তু উদয় শংকরের বড় আফসোস ছিল, লেখক সম্মানী না পাওয়াতে। তার ক্ষোভ ছিল, লেখকের প্রতি নিদারুণ তাচ্ছিল্যের ব্যাপারে। এমন ক্ষোভের পরত জমতেই হয়তো তিনি আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন। কবির আরেকটি ক্ষোভ ছিল উল্লেখযোগ্য, যার প্রকাশ তিনি প্রায়ই করতেন। তার একটি কবিতা ছাপা হয়েছিল ইসলামপন্হি হিসেবে দাবিদারদের একটি দৈনিকে। সেখান থেকে তিনি আশির দশকে দুশো টাকা সম্মানি পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই হয়েছিল কাল। দুঃখ করে বলতেন, ‘ওই কাগজে কবিতা প্রকাশের জন্য আমাকে “হিন্দু রাজাকার” বলা হয়। ভাত দেবার মুরোদ নেই, কিল মারার গোসাই।’ উদয় শংকর মানে রতন দা’র কথাগুলো এখনো কানে বাজে।

আল মাহমুদের প্রস্থানে অনেকের বিতিকিচ্ছিরি ধরনের ‘কথা’ পড়লাম। এগুলো সমালোচনার পর্যায়ে পড়ে না বলেই শুধু ‘কথা’ লিখলাম। আর এসব ‘কথা’ বিষয়েই কবি উদয় শংকর রতনকে মনে পড়ল। বিশেষ করে মনে পড়ল ‘ডেইলি স্টারে’ প্রকাশিত পশ্চিম বাংলার কবি জয় গোস্বামীর উক্তিটি। তিনি বললেন, ‘আল মাহমুদের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল আমার তীর্থ-দর্শনের মতো’। এখন কি জয় গোস্বামীও ‘হিন্দু রাজাকার’ হবেন, আমাদের রতন দা’র মতন! অনেকে তো কলকাতাকেই ‘তীর্থ’ ভাবেন, তাদের কী হবে! প্রশ্ন নয়, বিস্মিত হই চরিত্রায়নে। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এমন গানটি কি ভূপেন হাজারিকার বিজেপিতে যোগ দেওয়ার জন্য গুরুত্ব হারাবে! নজরুলও তো বলেছিলেন, ‘কোথা সে মুসলমান’। ভূপেন তো মরে ভূত, বেঁচে আছে তাঁর গান, মানুষের হৃদয়ের কথা হয়ে। ব্যক্তি অমর হয় না, সৃষ্টি হয়।

সক্রেটিস আর গ্যালিলিও সর্বকালের সেরাদের দুজন। একজন দার্শনিক, অন্যজন বিজ্ঞানী। এ দুজনেরও বিচার হয়েছিল। তারা দুজনই দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। সক্রেটিস পড়েছিলেন রাজরোষে, আর গ্যালিলিও ধর্মরাজদের। সক্রেটিস আপোষ করেননি, তার মৃত্যুদণ্ড পেতে হয়েছিল হেমলক পানে। গ্যালিলিও আপোষ করেছিলেন বেঁচে থাকার তাগিদে। তার প্রাণটা রক্ষা পেয়েছিল, কিন্তু নির্বাসিত একঘরে জীবন কাটাতে হয়েছে তাকে। অথচ মৃত্যুর আড়াই হাজার বছর পর নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছিলেন সক্রেটিস। গ্যালিলিও নির্দোষী, তা প্রমাণ হয়েছিল সাড়ে তিনশ’ বছর পর। একে কী দুই মনীষীর দুর্ভাগ্য বলব, নাকি সভ্যতার!

আল মাহমুদ হয়তো গ্যালিলিওর মতন আপোষ করেছিলেন, কিংবা তার চিন্তা পরিবর্তিত হয়েছিল। চিন্তার তো পরিবর্তন হয়, বামপন্হি কমরেডদের নামের আগেও ‘আলহাজ’ বসে। বাংলাদেশের বামধারার গুরু মেজর জলিল, আসব রব, শাহজাহান সিরাজ সবারই তো চিন্তার পরিবর্তন হয়েছে। শিবাজীর স্তুতি করে রবীন্দ্রনাথও ভুল স্বীকার করেছিলেন। অবশ্য সেটা গ্যালিলিও মানসিকতায় কিনা তাও ভাবনার বিষয়। তবে চিন্তার পরিবর্তন হয়, হওয়াটা স্বাভাবিক। পরিবর্তনের বিষয়টি না থাকলে সভ্যতার গতি রুদ্ধ হয়ে যেত।

‘ডিলেমা’ শব্দটির বাংলা অর্থ ‘উভয়-সংকট’। আল মাহমুদকে নিয়ে অনেকেই ডিলেমায় আক্রান্ত। কামিনী রায়ের ছড়ার মতন ডিলেমা, ‘পাছে লোকে কিছু বলে’। এমন ‘লোক’ থেকে বাঁচার জন্য অনেকের অবস্থা, ‘আড়ালে আড়ালে থাকি/নীরবে আপনা ঢাকি,/সম্মুখে চরণ নাহি চলে/পাছে লোকে কিছু বলে’—এমনটা। অথবা কারো, ‘কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি/সযতনে শুষ্ক রাখি; নিরমল নয়নের জলে, পাছে লোকে কিছু বলে’—এমনি। থাক ডিলেমা আক্রান্তদের অবস্থার গল্প। মূল কথায় আসি, ব্যক্তি আল মাহমুদের ‘ব্যক্তি’টা ‘গত’ হয়েছে তার মৃত্যুর পরই, এখন কবিতা ও গদ্যের স্রষ্টা আল মাহমুদ সঙ্গত কারণে নিজ সৃষ্টিতেই ভাস্বর হয়ে থাকবেন। এ নিয়ে কোনো ‘ডিলেমা’ নেই, থাকার কারণও নেই।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]