ছবিটি প্রতীকী, ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

বোকা মেয়ের ডায়েরি: সন্তান যদি এমন হয়, আমার চাই না সন্তান!

তিনি বললেন, ‘আমাকে এখান থেকে কিছু খাওয়াতে পারেন? কিন্তু কোনো পয়সা দিতে পারব না, এমনিই খাওয়াতে হবে।’

রুমানা বৈশাখী
বিভাগীয় প্রধান (প্রিয় লাইফ)
প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৬ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৬
প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৬ আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১৮:০৬


ছবিটি প্রতীকী, ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

আজকাল আমি প্রায়ই সন্তান নিয়ে ভাবি। একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর হয়তো সকল বিবাহিত দম্পতিকেই ভাবতে হয়। মনে মনে একটি শিশুর চেহারা কল্পনা করার চেষ্টা করি, শিশুটি আমার জীবন কীভাবে বদলে দিতে পারে সেটি ভাবার চেষ্টা করি। সবশেষে ভাবি, আমি কি সত্যিই একটি শিশু চাই? কিংবা, একটি শিশুর দায়িত্ব নেবার জন্যে কি আমি তৈরি?

এই প্রসঙ্গে একটি সত্য অভিজ্ঞতা বলি আজ।

আমার একটি ছোট্ট ক্যাফে আছে হোমমেড নামে। গতকাল সন্ধ্যার কথা, একজন বৃদ্ধ আসেন হোমমেডে। বৃদ্ধ মানে একেবারেই বৃদ্ধ। মাথার চুল সব সাদা, মুখে ফ্রেঞ্চ কাট করে ছাঁটা দাড়ি। পরনে স্যুটের মতো একটা পোশাক পরিপাটি, গায়ে দামি পারফিউমের গন্ধ। অবশ্য মাথায় টুপিখানা পুরাতন, চোখের সোনালি ফ্রেমের চশমা রংওঠা।

আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে আঙ্কেল আমার কাছে এসে বললেন—

‘ম্যাডাম, এই ক্যাফে আপনি দিয়েছেন?’

তারপর ডিসপ্লে দেখিয়ে বললেন—

‘আমাকে এখান থেকে কিছু খাওয়াতে পারেন? কিন্তু কোনো পয়সা দিতে পারব না, এমনিই খাওয়াতে হবে।’

খেতে চাইলে আমি কাউকেই না বলি না। আর এত বৃদ্ধ একজন মানুষকে না বলার কোনো কারণই নেই। আমি লাফিয়ে উঠে তাকে সবকিছু দেখালাম। বললাম যেটা ইচ্ছা নিতে পারেন। কিন্তু তিনি দামি কিছু নেবেন না, কম দামি কিছু খাবেন।

যাই হোক, আমি আঙ্কেলকে সেই খাবারটি খাওয়ালাম, যেটা আমার সবচাইতে পছন্দ, আমি রোজ সকালে খাই। আমাদের চিকেন পুলি পিঠা। চিনি ছাড়া চা-ও করে দিলাম নিজের হাতে। মুখে দাঁত বোধহয় সব নেই। খুব আস্তে আস্তে তিনি নাশতা খেলেন। খেতে খেতে আমার সাথে গল্প করলেন।

প্রফেসর ছিলেন, তার স্ত্রীও তাই। দুটি কন্যা। একজন বিদেশে থাকে, একজন বনানী। বাড়িতে দুই বুড়োবুড়ি একা, আন্টি খুব অসুস্থ কিন্তু দেখাশোনার লোক নেই। তিনি তাই নিজের বোনের বাড়িতে থাকেন, কন্যাদের বাড়িতে স্থান হয়নি। আঙ্কেল সেটা করতে পারেন নাই। নিজের বিশাল ফ্ল্যাটে একলাই থাকেন। খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা মাসকাবারি। কন্যারা টাকা দেয়, হোটেল থেকে খাবার আসে। আমার মনে হলো এর বাইরে তার হাতে কেউ কোনো টাকা দেয় না। নিজের মতো কিছু কিনবেন বা খাবেন, সেই টাকাও হাতে থাকে না। কারণ কাজের মানুষ রাখার প্রসঙ্গে বললেন—

‘একদিন আমার সব ছিল। বাসায় দুই-তিনটা কাজের মানুষ ছিল। এখন একটা কাজের মানুষ রাখার ক্ষমতা নেই। মেয়েদের পেছনে সবই শেষ।’

মাথার ওপরে ছাদ আছে, কিন্তু বেশি দিনের জন্যে না। মেয়েদের সম্পত্তি লিখে দিয়েছিলেন। এখন মেয়েরা ফ্ল্যাট বিক্রির ব্যবস্থা করছে। পিতার মাথার ওপরের ছাদ বিক্রি করে দেবে, কারণ তাদের ছেলেমেয়েদের বিদেশে পাঠাবে!...ইত্যাদি অনেক কথা বলে আঙ্কেল বিদায় নিলেন। আমি ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম, না হলে হয়তো আরও বসতেন, আরও গল্প করতেন। আমি তার মাঝে কথা বলতে না পারার তীব্র হাহাকার দেখেছি। নিঃসঙ্গতা দেখেছি। বারবার প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি তোমার আব্বুর কোনো কিছুই নাও নাই? কেন নাও নাই?’

শুরু করেছিলেন ম্যাডাম ডেকে, যাওয়ার সময় মামণি আর মা ডেকে গেলেন। আমি বললাম ইচ্ছে হলেই চলে আসতে, তিনি খুব খুশি হলেন। দেখে মনে হলো বুঝি বহুকাল কেউ তাকে নিঃস্বার্থভাবে কিছু বলেনি।

আমার কেন যেন মানুষটিকে দেখে মন ভেঙে গেছে। সোনার খাঁচায় সাজিয়ে রাখা একজন বৃদ্ধ, যাকে দেখে লোকে ভাবে না জানি কত্ত ভালো আছেন। দামি পোশাক, দামি পারফিউম, বড় বাড়ি। অথচ তার জীবন কাটে তীব্র হাহাকার নিয়ে। নিঃসঙ্গতা নিয়ে। জীবনের কাছে ব্যবহৃত একজন মানুষ হবার গ্লানি নিয়ে।

সত্যিই কি একে পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন করা বলে? কেবল দামি পোশাক পরালে আর তিন বেলা খাওয়ার ব্যবস্থা করলেই হয়ে যায় দায়িত্ব পালন? হয়ে যায়? মা-বাবাকে দেখেশুনে রাখার, সুখে রাখার, তাদের সব ইচ্ছা পূরণ করার দায় কি সন্তানের না? কেবল খাওয়া-পরা দেয়াটাই কি সব? সম্মান, ভালোবাসা, সময়, সহমর্মিতা ইত্যাদি আর কিছুই কি বৃদ্ধ মানুষগুলো পেতে পারেন না?

পরিশিষ্ট

আমি জানি জগতের সকলে একরকম হয় না। আমি এ-ও জানি যে, জগতে অসংখ্য সন্তান এমনও আছে, যারা মা-বাবার খাতিরে দুনিয়া ছেড়ে দিতে পারে। তবে হয়তো বাস্তবতা এটাই যে, আজকালকার যুগে তেমন সন্তানদের সংখ্যা কমে যাচ্ছে ক্রমে। আমরা নিজেদের সন্তানের জন্যে সবচাইতে সেরাটা চাই, কিন্তু অবহেলা করতে শুরু করি পিতা-মাতাকে। আমরা ভুলে যাই যে বৃদ্ধ পিতা-মাতাও সন্তানের মতোই। তাদেরও ঠিক ততটাই আদর-ভালোবাসা-মমতা-যত্নের প্রয়োজন হয়, যেমনটা কোনো ছোট শিশুর। বৃদ্ধ পিতা-মাতার জীবনের শেষ দিনগুলি সুন্দর করে তুলতে পারে কেবল তাদের সন্তানদের ভালোবাসাই।

আমি জানি সব, বুঝিও। তবুও গতকালকের মানুষটির স্মৃতি আমার মন থেকে যাচ্ছে না। আমার কেবল মনে হচ্ছে—

সন্তান যদি এমন হয়,

আমার তাহলে প্রয়োজন নেই সন্তানের। প্রয়োজন নেই!

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]