বিমানবন্দরে তামিম ইকবালকে কিছু একটা বুঝাচ্ছিলেন নিউজিল্যান্ডের এই স্থানীয় পুলিশ। ছবি: বিসিবি

তামিমের জবানিতে ক্রাইস্টচার্চ হামলার বর্ণনা

মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখেছি। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। এটা এমন কিছু, যা আমরা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। দলের সবারই এই এক কথা।

মুশাহিদ
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৫:০৩ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৫:০৪
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৫:০৩ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৯, ১৫:০৪


বিমানবন্দরে তামিম ইকবালকে কিছু একটা বুঝাচ্ছিলেন নিউজিল্যান্ডের এই স্থানীয় পুলিশ। ছবি: বিসিবি

(প্রিয়.কম) ক্রাইস্টচার্চের দীন অ্যাভিনিউতে আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ৪৯ জন। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। হতাহতদের সে তালিকায় থাকতে পারত বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের নামও। কিন্তু অল্পের জন্য বড় বিপদ থেকে রক্ষা পান তারা।

এই হামলার জেরে বাতিল করা হয় বাংলাদেশ-নিউজল্যান্ডের মধ্যকার তিন ম্যাচ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ টেস্ট। ম্যাচ বাতিল হওয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই দেশে ফিরেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। ১৬ মার্চ, শনিবার রাত ১০.৪২ মিনিটে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে ঢাকায় পৌঁছান বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা।

দেশে ফিরে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট ইএসপিএন ক্রিকইনফোকে ক্রাইস্টচার্চ হামলার ঘটনা খুলে বলেছেন তামিম ইকবাল। বাঁহাতি এই ওপেনারের জবানিতে শুনুন ঘটনার বর্ণনা—

বাসে ওঠার আগে কী কী হয়েছে তা খুলে বলছি। এতে বুঝতে পারবেন, ওই দু-তিন মিনিট কীভাবে সব পাল্টে দিয়েছে। মুশফিক ও রিয়াদ ভাই সাধারণত খুতবায় উপস্থিত থাকতে চান। এ কারণে আমরা একটু আগে-ভাগে জুমার নামাজে যেতে চেয়েছি। বাস ছাড়ার কথা ছিল বেলা দেড়টায়। কিন্তু রিয়াদ ভাই সংবাদ সম্মেলনে যান, সেখানে একটু দেরি হয়। সংবাদ সম্মেলন থেকে তিনি ড্রেসিংরুমে ফিরে আসেন। ড্রেসিংরুমে আমরা ফুটবল খেলেছি। তাইজুল হারতে চায় না। কিন্তু সবাই ওকে হারাতে চাচ্ছিল। তাইজুল আর মুশফিক খেলছিল, এতে করে কয়েক মিনিট দেরি হয়। এই ছোটখাটো বিষয়গুলোই শেষ পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়ে দিয়েছে।

এরপরই আমরা বাসে উঠি। পরিকল্পনা ছিল নামাজ শেষে হোটেলে ফিরব। এ কারণেই সৌম্য সরকার ও শ্রী (জাতীয় দলের ভিডিও বিশ্লেষক শ্রীনিবাস চন্দ্রশেখর) আমাদের সঙ্গে গেছে। আর অনুশীলনও ছিল ঐচ্ছিক। যারা করবে না, তারা হোটেলে থাকবে। যারা করতে চায়, তারা মাঠে আসবে।

আমি সবসময় বাঁ পাশের ছয় নম্বর আসনে (বাসে) বসে থাকি। মসজিদের কাছাকাছি পৌঁছালে আমার ডান পাশের সবাই জানালা দিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করে। দেখলাম, মেঝেতে একটা দেহ পড়ে আছে। মাতাল অথবা অজ্ঞান ভেবেছিলাম। বাস এগিয়ে গিয়ে মসজিদের কাছাকাছি দাঁড়াল। কিন্তু সবার মনোযোগ ছিল মেঝেতে পড়ে থাকা দেহটি ঘিরে। এ অবস্থায় আরেকটি লোককে দেখলাম। রক্তমাখা শরীর, ধীরে ধীরে পড়ে যাচ্ছে। ভয় তখনই দানা বেঁধে উঠতে শুরু করে।

মসজিদের কাছাকাছি একটি গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায় আমাদের বাস। দেখলাম বাসচালক এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি কাঁপছিলেন ও কাঁদছিলেন। উনি বলছিলেন, গোলাগুলি হচ্ছে, ওখানে যেও না, ওখানে যেও না। বাসচালক বলেন, ওরা (খেলোয়াড়) মসজিদে যাচ্ছে। তার (নারী) জবাব, না, না, মসজিদে যেও না। গোলাগুলি মসজিদে হচ্ছে। এরপর তিনি আবারও কাঁদতে শুরু করলেন। সবাই তার কথা শুনেছে ও দেখেছে। ভয়টা আরও বাড়ল। তখন মসজিদ থেকে আমরা মাত্র ২০ গজ দূরে। বাস থেকে নেমে মসজিদে ঢুকব আর কি। দেখলাম, মসজিদের আশপাশে আরও অনেক রক্তমাখা শরীর পড়ে আছে।

যখন আরও মরদেহ দেখলাম, বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কী করা উচিত। অনেকেই ভয়ে মাথা থেকে নামাজের টুপি খুলে ফেলল। মানে বুঝতে পারছিলাম কিছু একটা ঘটছে। যারা পাঞ্জাবি পরে ছিল, ওরাও ওপরে জ্যাকেট পরে নিল। এ ছাড়া আর কী করার আছে?

এরপর আমরা বাসের মেঝেতে শুয়ে পড়ি। এভাবে সাত-আট মিনিট কাটল। ঠিক কী ঘটছে, তা বুঝতে পারছিলাম না। তবে সহিংস কিছু যে ঘটছে, সেটা টের পেয়েছি। ভীষণ ভয় পেতে শুরু করি। দেখুন, ঠিকমতো কথা বলতে পারছি না। আমরা বাসচালককে বললাম, এখান থেকে বাস বের করুন। কিছু একটা করুন। কিন্তু সে অনড় ছিল। সবাই চিৎকার করে তাকে বললাম। আমিও চিৎকার করেছি। ওই ছয়-সাত মিনিট কোনো পুলিশ ছিল না।

হঠাৎ করেই পুলিশ আসল। ওদের বিশেষ বাহিনী যেভাবে ঝড়ের বেগে মসজিদে ঢুকল, আমরা ভাষাহীন হয়ে যাই। প্রায় অনুভূতিশূন্য অবস্থা। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। রক্তমাখা শরীর নিয়ে আরও অনেকে বের হতে শুরু করে মসজিদ থেকে। তখন আর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি। চিৎকার করতে শুরু করি ‘আমাদের যেতে দাও, যেতে দাও।’

কেউ একজন বলল, ‘বাসে থাকলে আমরা আরও বিপদে পড়ব।, আমারও তাই মনে হলো, বাস থেকে বের হতে পারলে পালানোর সুযোগ পাব। বাসে আমরা সহজ লক্ষ্যবস্তু। কিন্তু যাব কোথায়? দুটি দরজাই বন্ধ।

ঠিক সেই মুহূর্তে বাসচালক ১০ মিটারের মতো বাসটি এগিয়ে নেন। জানি না তিনি এই কাজটা কেন করলেন। আমরা তখন ভেঙে পড়েছি। সবাই প্রায় আশা ছেড়ে দিয়েছে। মাঝের দরজায় ধাক্কা ও লাথি মারছি। বাসচালক দরজা খুললেন।

বাসটা তিনি (চালক) যখন সামনে নিচ্ছেন, তখন আপনাকে (প্রতিবেদক) ফোন করেছিলাম। আপনি ভেবেছিলেন মজা করছি। কিন্তু আমি যে কতটা সিরিয়াস, তা বলা কিংবা বোঝানোর মতো অবস্থায় ছিলাম না। প্রায় আট মিনিট পর বাস থেকে শেষ পর্যন্ত নামা হলো। সবাই বলছিল, পার্ক দিয়ে দৌড় দিই। কেউ বলল, পার্কে আমরা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হব। বন্দুকধারী যদি আমাদের দেখে গুলি করতে শুরু করে?

আমার কাছে যেটা ভীতিকর লাগছিল, পুলিশ আমাদের দৌড়াতে দেখে কী ভাববে? এর মধ্যে দেখলাম, আপনারা তিনজন (ক্রিকইনফোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসাম, প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক উৎপল শুভ্র ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদক মাজহারউদ্দিন) আসছেন। তখনো বুঝতে পারিনি। কিন্তু কাল রাতে বুঝলাম, আপনারা কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন। অনেক কম মানুষই এমন ঝুঁকি নেয়। ওইরকম পরিস্থিতিতে কাছের মানুষেরাও হয়তো আপনাদের মতো ভূমিকা নেয় না। আসলে আপনাদের দেখে কিছুটা শান্ত হই এবং হাঁটতে শুরু করি। কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর সবাই মাঠের দিকে দৌড়াতে শুরু করে।

জানেন, মৃত্যুকে নিজের চোখে দেখেছি। শরীর ঠান্ডা হয়ে আসছিল। এটা এমন কিছু, যা আমরা সারা জীবনে ভুলতে পারব না। দলের সবারই এই এক কথা। সবার মুখে কিছুটা হাসি ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে-ভেতরে বিধ্বস্ত।

আমরা হোটেলে ফিরে সোজা রিয়াদ ভাইয়ের রুমে চলে যাই। বন্দুকধারীর ভিডিও দেখি, খেলোয়াড়রা সবাই কাঁদতে শুরু করে, যেভাবে ড্রেসিংরুমে আমরা সবাই কেঁদেছি। একটা কথা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এই ঘটনা ভুলতে অনেক সময় লাগবে। পরিবারের সাহায্য লাগবে। চোখ বন্ধ করলে দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে। কাল রাতে বেশির ভাগ ক্রিকেটার একসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আমি ঘুমিয়েছি মিরাজ ও সোহেল ভাইয়ের সঙ্গে। স্বপ্নে দেখেছি, বাইকে করে ওরা গুলি করছে।

বিমানবন্দরে আসার পথে আমরা একে-অপরকে বলছিলাম, একটু এদিক-সেদিক হলেই আমরা নয়, লাশগুলো ঘরে ফিরত। মাত্র ত্রিশ সেকেন্ডের ব্যাপার।

প্রিয় খেলা/রিমন