সোমবার বাদ জোহর চিলমারী থানাহাট এইউ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিল্পী সফিউল আলম রাজার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

নিজ গ্রামে শায়িত ভাওয়াইয়া শিল্পী-সাংবাদিক সফিউল আলম রাজা

নিজ গ্রামে বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা রায়হানুল হক মোফার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ভাওয়াইয়া শিল্পী ও সাংবাদিক সফিউল আলম রাজা।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১৮:৫৪ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১৯:০২
প্রকাশিত: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১৮:৫৪ আপডেট: ১৮ মার্চ ২০১৯, ১৯:০২


সোমবার বাদ জোহর চিলমারী থানাহাট এইউ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে শিল্পী সফিউল আলম রাজার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: ফোকাস বাংলা

(প্রিয়.কম) নিজ গ্রামে বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা রায়হানুল হক মোফার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন ভাওয়াইয়া শিল্পী ও সাংবাদিক সফিউল আলম রাজা

১৮ মার্চ, সোমবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে নিজ জন্মভূমি চিলমারী উপজেলার জোড়গাছ মন্ডলপাড়া কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়। 

এর আগে বাদ জোহর চিলমারী থানাহাট এইউ সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে ও তার নিজ গ্রামে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও আত্মীয়স্বজন জানাজায় অংশ নেন।

সোমবার সকালে কুড়িগ্রাম কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার চত্বরে মরদেহ পৌঁছালে কুড়িগ্রাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সাংবাদিক-শিল্পী রাজাকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

এ সময় কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমিনুল ইসলাম মঞ্জু মন্ডল, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক, বাংলাদেশ ভাওয়াইয়া একাডেমির পরিচালক ভূপতি ভূষণ বর্মা, কুড়িগ্রাম প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বিপ্লব, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি জ্যোতি আহম্মেদ ও সম্পাদক দুলাল বোস, সাংবাদিক সফি খান, ইউসুফ আলমগীর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

১৭ মার্চ, রবিবার রাজধানী ঢাকার পল্লবীর সাড়ে ১১ নম্বর সড়ক এলাকায় নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’র একটি কক্ষে ঘুমন্ত অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন সফিউল আলম রাজা। প্রতিষ্ঠানটি ‘কলতান গানের স্কুল’ নামেই পরিচিত।

১৬ মার্চ, শনিবার রাতে এশিয়ান টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ শেষে সফিউল আলম রাজা নিজ ঘরে ফেরেন। রবিবার দুপুরের দিকে তার স্কুলের দরজা বন্ধ থাকায় ডাকাডাকি করা হয়। কোনো সাড়া না পাওয়া গেলে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায়, তিনি শুয়ে আছেন। অনেক ডাকাডাকির পর না উঠলে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, মিরপুর ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে জানাজার পর সফিউল আলম রাজার মরদেহ কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।

সবসময় হাসি লেগে থাকত সফিউল আলম রাজার মুখে। ছবি: প্রিয়.কম

দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতার পাশাপাশি সফিউল আলম রাজা বিভিন্ন গণমাধ্যমের শ্রোতা-দর্শকদের কাছে ‘ভাওয়াইয়া রাজা’ নামেই পরিচিত ছিলেন। ভাওয়াইয়া গানের এই শিল্পীর জন্ম কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায়। কৈশোরে পিতা মরহুম নাজমুল হক ও মাতা মরহুমা শামসুন্নাহার বেগমের উৎসাহ এবং অনুপ্রেরণায় তার গান শেখা শুরু।

সংগীতে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিক্ষা গ্রহণ না করলেও ভাওয়াইয়ার কিংবদন্তি-গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী নুরুল ইসলাম জাহিদের কাছে সংগীতের তাত্ত্বিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছিলেন রাজা। তিনি বাংলাদেশ বেতারের ‘বিশেষ’ ও বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘প্রথম শ্রেণি’র শিল্পী ছিলেন। এ ছাড়াও তিনি দেশের সব ক’টি চ্যানেলে নিয়মিত সংগীত পরিবেশন করে আসছিলেন। সংগীত পরিবেশন করছেন বিদেশি বিভিন্ন মঞ্চ এবং মিডিয়াতেও (এর মধ্যে কলকাতার তারা মিউজিক এবং কলকাতা টিভি উল্লেখযোগ্য)।

লোকসংগীতের অন্যতম ধারা ভাওয়াইয়া গানের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে শিল্পী রাজা ২০০৮ সালে রাজধানীতে ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ভাওয়াইয়া স্কুল’। যে স্কুলে ভাওয়াইয়ার ওপর এক বছরের ফ্রি সার্টিফিকেট কোর্স করানো হয়। ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি সংস্কৃতির সব শাখা নিয়ে রাজধানীর পল্লবীতে ‘কলতান সাংস্কৃতিক একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন এই শিল্পী। তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘উত্তরের সুর’-এ চারটি মৌলিক ভাওয়াইয়া গান গেয়েছেন।

শিল্পী জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ সফিউল আলম রাজা বেঙ্গল ফাউন্ডেশন আয়োজিত বেঙ্গল বিকাশ প্রতিভা অন্বেষণে লোকসংগীত বিভাগে (ভাওয়াইয়া নিয়ে) ২০০৬ সালে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন।

রাজধানীতে এ পর্যন্ত তার ছয়টি একক সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে দুটি, আড়িয়াল সেন্টারের উদ্যোগে একটি, আঁলিয়স ফ্রঁসেজের উদ্যোগে একটি, গুরুর চিকিৎসা সহায়তায় ‘ভাওয়াইয়া’ গানের দল-এর আয়োজনে একটি এবং ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে একটি একক সংগীতানুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে রাজার একটি মিক্সড অ্যালবাম এবং ভায়োলিন মিডিয়া থেকে ২০১১ সালে প্রকাশিত হয়েছে একক ভাওয়াইয়া অ্যালবাম ‘কবর দেখিয়া যান’।

সফিউল আলম রাজা সংগীত নিয়ে সফর করেছেন অস্ট্রেলিয়া, ভারতসহ বিভিন্ন দেশ। তিনি সরকারি ও বেসরকারিভাবে বিভিন্ন রিয়েলিটি শোতে ‘বিচারক’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

শিল্পী সফিউল আলম রাজা পেশায় একজন সাংবাদিক ছিলেন। ঢাকা রি‌পোর্টার্স ইউ‌নি‌টির (ডিআরইউ) স্থায়ী সদস্য ছিলেন। সংগঠনটির সাংস্কৃ‌তিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। দীর্ঘ ২৫ বছরের সাংবাদিকতা জীবনে দৈনিক জনকণ্ঠ, দৈনিক জনতা, দৈনিক অর্থনীতি, দৈনিক যুগান্তর এবং সর্বশেষ অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রিয়.কমের প্রধান প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

পেশাগত জীবনেও সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন সফিউল আলম রাজা। সাংবাদিকতায় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুরস্কার, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার, ডেমোক্রেসি ওয়াচ হিউম্যান রাইটস অ্যাওয়ার্ড, ইউনেস্কো ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ড, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। নিজের জন্মস্থান কুড়িগ্রামের চিলমারীর বন্দরে শান্তি নিকেতনের আদলে একটি ভাওয়াইয়া ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...