শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

‘গানের জগতে প্রথম-দ্বিতীয় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে সামিল হননি তিনি’

রবিবার বাদ জোহর শাহনাজ রহমতুল্লাহকে রাজধানীর বনানীর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রিয়.কম
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০১৯, ২০:৪৮ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০১৯, ২০:৫৫
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০১৯, ২০:৪৮ আপডেট: ২৪ মার্চ ২০১৯, ২০:৫৫


শাহনাজ রহমতুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বাংলাদেশসহ অসংখ্য কালজয়ী গানের কিংবদন্তি শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বারিধারার নিজ বাসায় শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় মারা গেছেন। রবিবার (২৪ মার্চ) বাদ জোহর তাকে রাজধানীর বনানীর সম্মিলিত সামরিক বাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।

এদিকে বিকেলে ৫টার দিকে বাংলাদেশের প্রথিতযশা কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা এই শিল্পীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। সেটি প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো-

‘কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ মরে গিয়ে জানিয়ে দিলেন উনি ছিলেন, উনি আছেন, উনি থাকবেন এবং ওনাকে ছাড়া উপমহাদেশের সংগীত জগত কতোটা অসম্পূর্ণ। সত্যিই আমরা ভাগ্যবান যে শাহনাজ রহমতুল্লাহ একান্তই আমাদের ছিলেন। ‘সুর সম্রাট’ আলাউদ্দিন আলী এবং শাহনাজ রহমতুল্লাহ মিলে যে অনবদ্য সৃষ্টির যৌথ অধ্যায় ছিল তা সত্যি সত্যিই ভিষণ মৌলিক। তার গানের প্রক্ষেপণ, উপস্থাপন, তার কন্ঠের ট্রিমেলো, রেজোন্যান্স, শব্দচয়ন, সর্বোপরি তার বিশেষায়িত অন্যরকম কন্ঠ তার প্রতিটি গানকে অন্যরকম উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।’

ফেসবুকে তিনি লিখেন, ‘বেশির ভাগ গান কবিতা থেকে গান হয়ে ওঠে কিন্তু আমার গবেষণা বলে ওনার গান প্রথমে গান হয়ে জন্ম নিয়ে তারপর কবিতা হয়ে উড়ে উড়ে সাহিত্যে ছড়িয়ে যায়, যেমন ‘সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি’ এই লাইনটি দিয়ে তার সুরের মাধুরীর ওপর ভিত্তি করে একজন ঔপন্যাসিক একটি উপন্যাস লেখার প্লট পেয়ে যাবেন। সেই পরিবেশ শাহনাজ আপা তার গানের অনুরনন দিয়ে তৈরি করে দিয়ে গেছেন হেলায় অবহেলায়। অথচ এগুলো উনি জেনেশুনে সুনিপুণভাবে করেন নাই। তিনি গান গেয়েছেন অসম্ভব ভালোবেসে এবং অতিরিক্ত অপেশাদার ভঙ্গীতে। গানের জগতে প্রথম দ্বিতীয় হওয়ার ইঁদুর দৌড়ে কখনই সামিল হন নাই তিনি। নিজের এই বিশেষত্বকে তিনি কখনই সিরিয়াসলি নেন নাই। তারপরও যা গান গেয়েছেন একটা গান ও মাটিতে পড়েনি। তা সারা দেশের গানপ্রিয় মানুষের হৃদয়ে ঢুকে স্থায়ী ভাবে বসতি গড়েছে। তার গাওয়া দেশের গানগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করার মত স্পর্ধা আমার নেই, সে গানগুলো কোন মানবীর গাওয়া, এ ভাবতেই গাঁয়ে কাটা দেয়। তার দেশের গানগুলো শুনে আমি বোকা মেয়ে যখন তখন কাঁদি। আর প্রেমের গান? তার গানে হয়তো আমার বাবাও প্রেমে পড়েছিলেন, আমার ছেলেও, হয়তো আমার নাতনি ও একইভাবে প্রেমে পড়বে।’

কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা লিখেন, ‘শোনা যায় এমন শাব্দিক বা শব্দময় দীর্ঘশ্বাস না দিয়েও ভয়াবহ অন্তর্গত দীর্ঘ নিঃশ্বাস তিনি অনায়াসেই গানে আনতেন। যা একজন বিরল শিল্পীর পারংগম ক্ষমতা। আমি তার কন্ঠের চাইতেও এই আন্ডার ভয়েজের কারুকার্যময় দীর্ঘ নিঃশ্বাস এর অন্ধভক্ত। এজন্য যতবার আমি তাকে দেখেছি অটোমেটিক আমি কেঁদেছি (এখানে অটোমেটিক শব্দের বিকল্প বাংলা শব্দ খুঁজে না পাওয়ায় দুঃখিত)।উনি তখন বলতেন এই মেয়ে, এই বোকা মেয়ে তুমি কাঁদো কেনো, তুমি আমার কাছে এসো! আমার বড়ই দুঃখ বাংলাদেশ তাঁকে পন্ডিত শাহনাজ রহমতুল্লাহ অথবা ডঃ শাহনাজ রহমতুল্লাহ উপাধিতে ভুষিত করেনি। এ দুর্ভাগ্য কার আমি জানিনা। ব্যাক্তিগত জীবনে তিনি অন্যান্য সচেতন সাজানো গোছানো শিল্পীদের চেয়ে একদম আলাদা ছিলেন।

কনকচাঁপা ফেসবুকে লিখেন, ‘স্বামী অন্তঃপ্রাণ মানুষটি শিশুর মতো সরল ছিলেন। গল্পে বসলে অনেক কথাই গড়গড়িয়ে বলতেন এবং আমরা হাসলে রেগে গিয়ে বলতেন এই তোমরা হাসছো কেন! এই টেকনিক্যাল হিপোক্রেট জগতের অনেক কিছুই তার অজানা ছিল। তার সাথে শেষ দেখা আমার ডলি ইকবাল আপার বাসায়। দুপুরের খাওয়া শেষ করে একসাথে আমি আর শাহনাজ আপা ডলি আপার বেডরুমে আসরের নামাজ আদায় করছিলাম। নামাজ শেষে উনি আমাকে ডাকলেন বললেন কনক, আমার কাছে আসো। আমি তার উদ্দেশ্য বুঝে ওনার জায়নামাজের পাশে বসতেই উনি আমার মাথায় হাত দিয়ে কন্যাসম স্নেহে দোয়া পড়ে ফু দিলেন। আমি বরাবরের মতোই বোকার মতো অশ্রুসিক্ত হতেই আবার বকা, এই মেয়ে,কাঁদবে না, তুমি আমার খুব আদরের জানোতো!’

সংগীত শিল্পী কনকচাঁপা তার স্টেটাসে আরও লিখেন, ‘হেসেখেলে গান ভালোবেসে যেভাবে তিনি মুকুটহীন রানীর মতো এই দুনিয়ায় ছিলেন ঠিক তেমনি খেলাচ্ছলেই চলে গেলেন। ভাবখানা এমন যে খেলছিলেন, হঠাৎই কিছু একটা প্রয়োজনে ওপারে যাওয়ার দরকার পড়ায় মিনিট পাঁচেকের নোটিশে চলে গেলেন। যাক, যার যাবার সে যাবেই, ধরে রাখার শক্তি কি আমাদের আছে! আমরা শুধু চাই আমাদের ‘মোর দেন নাইটিংগেল’ যেন সুখে থাকেন। আল্লাহ, তুমি তাঁকে কবুল করে নাও।’

প্রিয় বিনোদন/কামরুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...