আলী কদম উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালামের সঙ্গে এক পাহাড়ি নারী এই ছবিটি ফেসবুকে ভাইরাল হলে এ নিয়ে বির্তকের ঝড় ওঠে। ছবি: সংগৃহীত

একজন ‘ট্রাইব’ যুবতী ও চেয়ারম্যান এবং সংস্কৃতিকাহন

আরেক ছবিতে দেখা গেলো, একজন ট্রাইব মহিলা চেয়ারম্যানকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছেন। আর সেই জড়াজড়িতে চেয়ারম্যানের কোনো অংশগ্রহণ নেই। যারা প্রাথমিক চিত্রের খণ্ডিতাংশ দেখে লাফিয়ে উঠলেন, ছবি বিশ্লেষক হয়ে দাঁড়ালেন, পরের চিত্র বিষয়ে তাদের কোনো বিশ্লেষণ নেই।

কাকন রেজা
সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০১৯, ২০:০০ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৯, ২০:০০
প্রকাশিত: ২৬ মার্চ ২০১৯, ২০:০০ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৯, ২০:০০


আলী কদম উপজেলা চেয়ারম্যান আবুল কালামের সঙ্গে এক পাহাড়ি নারী এই ছবিটি ফেসবুকে ভাইরাল হলে এ নিয়ে বির্তকের ঝড় ওঠে। ছবি: সংগৃহীত

‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে’, এক সময় গ্রামের প্রতিটি ঘরে ফ্রেমে বাঁধানো থাকতো এই বাক্যাংশটি। হ্যাঁ, এটি একটি সম্পূর্ণ বাক্য বা চরণের খণ্ডিত অংশ। এরপরে কী রয়েছে, প্রশ্ন করলে, নিশ্চিত অনেকেই জবাব দিতে পারবেন না। পুরুষতান্ত্রিকতার একটি বড় অবলম্বন এই বাক্যাংশটি। নারীকে দায়ী করার মোক্ষম উদ্ধৃতি, সে দোষে-গুণে যেটাই হোক। অথচ পুরো বাক্য বা চরণটি জানলে পারত এটি উদ্ধৃত করতেন না পুরুষকুল। পরের সে অংশটি হলো, ‘গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে’। পুরোটা কী দাঁড়ালো, সংসার সুখের হয় রমনীর গুণে/ গুণবান পতি যদি থাকে তার সনে’- এটা জেনেও কি কোনো পুরুষ চরণটি উদ্ধৃত করতে চাইতেন?

এমন ভূমিকা বর্ণনার কারণটা বলি এখন। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সদ্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান আবুল কালামকে নিয়ে কদিন ধরে সামাজিক এবং স্বভাবতই পরে গণমাধ্যমে তুমুল আলোচনা চলেছে এবং চলছে। চেয়ারম্যান বেচারা সংবর্ধনার মালা নিতে গিয়ে জ্বালা গলায় পড়েছেন। মালা জ্বালায় পরিণত হয়েছে সংবর্ধনার কিছু ছবি সামাজিকমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়াতে। এ সব ছবিতে দেখা গেছে, একজন ট্রাইব রমনীর হাত ধরে আছেন তিনি, একটিতে জড়িয়েও ধরেছেন। এটা ছিলো প্রথম ধাপের ছবি। সেই রমণী বিষয়ক খণ্ডিত চরণটির মতন। আর যায় কোথায়। কিছু মানুষ নেমে পড়লেন কোমর বেঁধে, অশালীনতা ও যৌন নিগ্রহের ঝাণ্ডা হাতে। তারা বলতে শুরু করলেন, ছবিগুলোতে জড়োসড়ো যুবতীর মুখের ভাবেই বোঝা গেছে, তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেছেন সেই চেয়ারম্যান। তাদের ভাষায় যেটা অশালীন ও যৌন নিগ্রহের সামিল। একজন সদ্য নির্বাচিত চেয়ারম্যান একজন যুবতীকে প্রকাশ্যে জড়িয়ে ধরেছেন তাও আবার তারই সংবর্ধনায়! এমন বিস্ময়বোধটাও কাজ করেনি অভিযোগ প্রকাশের তাড়াহুড়ায়! স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা বোধহয় এদের জন্যই আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘হে মানবসম্প্রদায় তোমাদের বড়ই তাড়াহুড়া’। অথচ দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ চিত্রের পরের অংশ যখন প্রকাশিত হলো, সেসব ছবিতে দেখা গেলো ওই রমনী হাসিমুখে চেয়ারম্যানকে মালা পড়াচ্ছেন, জড়িয়েও আছেন হাসিমুখে। সেই মুখে কোনো দ্বিধা-সংকোচ নেই, নেই নিগ্রহের চিহ্ন।  

আরেক ছবিতে দেখা গেলো, একজন ট্রাইব মহিলা চেয়ারম্যানকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছেন। আর সেই জড়াজড়িতে চেয়ারম্যানের কোনো অংশগ্রহণ নেই। যারা প্রাথমিক চিত্রের খণ্ডিতাংশ দেখে লাফিয়ে উঠলেন, ছবি বিশ্লেষক হয়ে দাঁড়ালেন, পরের চিত্র বিষয়ে তাদের কোনো বিশ্লেষণ নেই। থাকলেও তা প্রকাশিত হয়নি। ভাগ্যিস চেয়ারম্যান পক্ষের লোকজন বলেননি, ওই মহিলা চুমু খেয়ে চেয়ারম্যানের শ্লীলতাহানি করেছেন। তাহলেই লড়াইটা হতো সমানে সমানে। কিন্তু তা হয়নি। শেষমেশ ওই যুবতীকেই সংবাদ সম্মেলন করে বিষয়টির ব্যাখ্যা করতে হয়েছে। চেয়ারম্যানকে অভিযুক্ত করতে গিয়ে দেশশুদ্ধ মানুষের সামনে বিব্রত করা হয়েছে মেয়েটিকে! যে মেয়েটি কিনা তাদের ভাষাতেই সহজ সরল।

‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুনে’ বলে যেমন নারীদের ডমিনেট করা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের সুবিধা। বিপরীতে পুরুষতান্ত্রিকতার অনেক অসুবিধাও রয়েছে। সেই অসুবিধারই মূল্য দিতে হয়েছে ওই চেয়ারম্যানকে, মানুষ হিসাবে মানুষকে জড়িয়ে ধরার জন্যে। ‘পুরুষ নারীকে ভোগের সামগ্রী ভাবে’, কথিত নারীবাদীতার এই উদগ্র চিন্তার শিকার হতে হয়েছে চেয়ারম্যান পদবীর পুরুষটিকে। এ হলো পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সুবিধা থাকলে অসুবিধাও ভোগ করতে হয়, এটাই সতত চিন্তা।

তবে বিষয়টিকে শুধু এভাবে ব্যাখ্যা করলেও তা খণ্ডিত ব্যাখ্যা হবে। যারা চেয়ারম্যান ও ট্রাইব যুবতীর বিষয়টিকে অশালীন ও যৌন নিগ্রহ হিসাবে ধরে নিয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই নিজেদের প্রগতিশীলতা ও সংস্কৃতির স্বঘোষিত দাবিদার ভাবেন। তাই ব্যাখ্যাটিকে সংস্কৃতিগত দিক থেকেও আলোচনায় আনতে হবে। যারা কলকাতার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে চোখ রাখেন তারা দেখবেন, মুসলমানরা অনেক অনুষ্ঠানে এসে দর্শকদের ‘নমস্কার’ বলেন। যারা অনুষ্ঠান সঞ্চালক থাকেন তারাও মুসলিমদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় তাদের নামে আগে ‘শ্রী’ উল্লেখ করেন, জনাব বলেন না। এইখানেই সংস্কৃতির পার্থক্যটা। কলকাতার সংস্কৃতি বেড়ে উঠেছে ‘নমস্কার’কে ঘিরে, ‘শ্রী’কে অবলম্বন করে। সেখানে সেই সংস্কৃতির সাথে টিউন করেই কথা বলতে হবে। না হলে তাদের সংস্কৃতিকে অশ্রদ্ধা করা হবে। আপনি নিজের সংস্কৃতিকে যদি শ্রদ্ধা করেন, তবে অন্যদেরটাকেও করতে হবে। এটাই ‘কালচার্ড’ হওয়ার সৌন্দর্য।

বর্তমানের সবচেয়ে আলোচিত সরকার প্রধান হলেন নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডান। ক্রাইস্টচার্চ মসজিদে সন্ত্রাসী হামলার পর মুসলমানদের প্রতি তার সমবেদনার প্রকাশ সবার দৃষ্টি কেড়েছে। নিউজিল্যান্ডের মুসলিম সম্প্রদায়তো বটেই, সারা বিশ্বের মুসলমান আপ্লুত হয়েছে তার আন্তরিকতায়। বিশ্বময় মানবতাবাদী মানুষের প্রশংসা কুড়াচ্ছেন তিনি। এর কারণ হলো, জাসিন্ডা মুসলমানদের আদলে, তাদের সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়ে তাদের শোকের অংশ হতে চেয়েছেন। তিনি হিজাব পড়ে মুসলিম কমিউনিটির সাথে কথা বলেছেন এবং সেই কথা শুরু করেছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে। যে কারণে তিনি একাত্ম হতে পেরেছেন তাদের শোকের সাথে, মিশে যেতে পেরেছেন মুসলিম কমিউনিটির আপনত্বে। অন্য ধর্মের হলেও মুসলমানরা তাকে গ্রহণ করেছেন নিজেদের একজন ভেবে। পার্বত্য অঞ্চলের সেই ট্রাইব যুবতী ও চেয়ারম্যানের বিষয়টিও তাই। আবুল কালাম বারবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন এবং তা হয়েছেন ট্রাইবাল কালচার বোঝেন বলেই। তিনি রপ্ত করেছেন ট্রাইবদের নিজের মানুষ হওয়ার বিষয়টি। আর সে কারণেই অমন কিছু ছবি নির্দ্বিধায় তুলতে দিয়েছেন তিনি।

আমাদের সমাজে ‘অতি প্রগতিশীল’ বলে একটি প্রজাতির উদ্ভব হয়েছে। আমি যাদের বলি, ‘ককটেল’ সম্প্রদায়। এরা পহেলা বৈশাখে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পড়ে, কপালে সিঁদুর মেখে রমনা বটমূলে যান। আবার থার্টিফার্স্টে জিন্স, মিডি, মিনিতে উন্মত্ত হন। এরা লোক উৎসবকে ‘ফোক ফেস্টিভাল’ বানিয়ে জগার খিচুড়ি পাকান, আবার ‘রক ফেস্টিভালে’ দুহাত তুলে নাচেন। এদের সবটাই স্ববিরোধী। কলকাতায় মুসলমানরা ‘নমস্কার’ বলে সেখানকার সার্বিক সংস্কৃতিকে সম্মান জানান। কিন্তু পহেলা বৈশাখে পড়া কপালের সিঁদুর কী আমাদের সার্বিক সংস্কৃতি! বাংলাদেশের লোকাচারের সাথে স্প্যানিশ লোকাচারের পার্থক্য এরা বোঝেন না। তারা জানেন না, পশ্চিমবঙ্গের লোকাচারের সাথেও বাংলাদেশের লোকাচারের রয়েছে হাজারো ভিন্নতা। সংস্কৃতির ভেদ-বিভেদ না বুঝেই এরা ‘লোক’ নামে ‘ফোক’ ফেস্টিভাল করেন। যে ‘ফেস্টিভালে’ ‘লোক’ বা ‘ফোক’ কোনো কিছুই থাকে না, থাকে শুধু নিরর্থ আর লক্ষ্যহীন উৎসব।

এই ‘ককটেল’ সম্প্রদায়কে দেখবেন, বিদেশে গিয়ে টুকুসটাকুস করে অন্যের গালে চুমু খেয়ে ‘হাই-হ্যালো’ করছেন। যদি বলেন, এমনটা করলেন কেনো। তাহলে নির্ঘাত গালি খাবেন ‘আনকালচার্ড’ বলে। আবার দেশে ওই চেয়ারম্যানের বেলায় হবে উল্টোটা। সেই চেয়ারম্যানও টুকুসটাকুসের জন্য গালি খাবেন ‘আনকালচার্ড’ অভিধায়। এই যে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’, এটাই হলো সংস্কৃতিহীনতা। সংস্কৃতিহীনরা যখন সংস্কৃতি শেখাতে যায়, তখন বিষয়টি হয়ে দাঁড়ায় অনেকটা অন্ধের হাতি দর্শনের মতন। এদের স্থান-কাল-পাত্র ভেদ থাকে না। এমন শিক্ষার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ।

ট্রাইব অধ্যুষিত এলাকার সংস্কৃতির সাথে বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে। আমাদের জাতীয়তার প্রশ্নটিও এসেছে তেমন চিন্তা থেকেই। সেদিকে আর যাই না। তবে বাংলাদেশের সার্বিক সংস্কৃতিতে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন ট্রাইব বা যে কারও নামের আগে ‘জনাব’ উচ্চারণ করাটা স্বাভাবিকতা। একজন ট্রাইবের অন্যদেরকে ‘সালাম’ দেওয়াটাও স্বাভাবিকতার বাইরে নয়। কিন্তু একান্ত ট্রাইব কালচারে, যেখানে রয়েছে তাদের সার্বিকতা, সেখানে সে সংস্কৃতিকে সম্মান করাই সঠিক ‘কালচার’। এই যে সার্বিকতা ও একান্ততা, এমন বিষয়গুলোর ভেদ বুঝে উঠাটা অত্যন্ত জরুরি। এই ভেদ-বিভেদ না বুঝে নিজেকে ‘প্রগতিশীল’ বা ‘সংস্কৃতিবান’ প্রচার করার মধ্যে কোনো মাহাত্ম্য নেই, রয়েছে অবিমৃশ্যকারিতা।

ফুটনোট: লেখায় ‘ট্রাইব’ শব্দটি ব্যবহার করেছি জেনে-বুঝেই। সরকার এমনসব মানুষদের বলছেন ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, আবার কেউ বলছেন ‘আদিবাসী’, কারও কাছে ‘উপজাতি’। ‘আদিবাসী’ দিবস পালিত হয় দেশে। অথচ রাষ্ট্র-সরকার তাদের বলে ‘নৃগোষ্ঠী’। এই দ্বন্দ্ব এড়াতেই সরাসরি ইংরেজি শব্দের ব্যবহার। এরমধ্যে কোনো বিশেষ ইংরেজি প্রীতির কু বা সুগন্ধ খোঁজার আবশ্যকতা নেই।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]