নোলক ছবির একটি দৃশ্যে শাকিব খান। ছবি: সংগৃহীত

‘মিথ্যাচার’ আর ‘ভিন্ন কথা’য় ঝুলে আছে শাকিবের ‘নোলক’

শাকিব খান অভিনীত ‘নোলক’ ছবির জটিলতা চলচ্চিত্রের দুটি সমিতি (চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক) সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো সমাধানে যেতে পারেনি।

মিঠু হালদার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৫৮ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৫৮
প্রকাশিত: ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৫৮ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৫৮


নোলক ছবির একটি দৃশ্যে শাকিব খান। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) শাকিব খান অভিনীত ‘নোলক’ ছবির জটিলতা চলচ্চিত্রের দুটি সমিতি (চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক) সমাধানের চেষ্টা করেও কোনো সমাধানে যেতে পারেনি। অন্যদিকে প্রযোজক-কাম-নির্মাতা সাকিব ইরতিজা চৌধুরী সনেট চেষ্টা করছেন, শিগগিরই যথাযথ নিয়ম মেনে ছবিটি মুক্তি দেওয়ার। কিন্তু ছবিটি নিয়ে একের পর এক ‘মিথ্যাচার’ করেই যাচ্ছেন পরিচালকের মর্যাদা ফিরে পেতে চাওয়া নির্মাতা রাশেদ রাহা—এমনটাই দাবি করেছেন সনেট। অন্যদিকে রাহা বলছেন ‘ভিন্ন কথা’।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৯-৮-২০১৮ তারিখে রাশেদ রাহা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় তার ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে সাকিব ইরতিজা চৌধুরী সনেটকে বিবাদী করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু সনেট দাবি করেন, এই জিডির কথা তিনি সম্প্রতি জানতে পারেন। এরপর তিনিও একটি জিডি করেন। এর তদন্ত শুনানির জন্যই গত ২৫ মার্চ ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে তারা দুজনই হাজির হন। বিষয়টা এখন তদন্তাধীন।

জিডিতে রাশেদ রাহা লিখেছেন, ‘২০১৭ সালের ডিসেম্বরে আমি চলচ্চিত্রটির কাজ শুরু করি। এরপর ছবির ৮৫ ভাগ কাজ শেষও হয়। একটা সময় গিয়ে বিবাদী সাকিব ইরতেজা চৌধুরী সনেট ও নায়িকা ইয়ামিত হক ববি এবং অন্য একজন পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী ‘নোলক’ ছবিটি তাদের নামে নামকরণ করার চেষ্টা করছে। এই কাজে তাদের বাধা দিলে তারা আমাকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি প্রদর্শন করে।’

প্রযোজক-কাম-নির্মাতা সাকিব ইরতিজা চৌধুরী সনেট। ছবি: সংগৃহীত

সাকিব ইরতিজা চৌধুরী সনেট প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমার ছবিটির মুক্তি আটকে দেওয়ার জন্য অনেক ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটা প্রতিটা পদে পদেই। আমাকে এখন পর্যন্ত যতগুলো পদে আটকে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, সব জায়গা থেকেই আমি ছবিটির ছাড়পত্র নিয়ে এসেছি। আমার যে ক্ষতিটা হয়েছে, আমার ছবিটি মুক্তির তারিখ বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি চাই না, এখন আর কোনো বাধা আসুক।’

‘দিন-তারিখ নির্ধারণ করে ছবিটি আমি মুক্তি দিতে চাই। অনেক তো হলো, আর না। ছবির মালিকানা নিয়ে কোনো জটিলতা নেই। থানায় যে জিডিটা করা হয়েছে, ওটা রাশেদ রাহা তার ব্যক্তিজীবনের নিরাপত্তা চেয়ে জিডিটি করেছেন। সেটা তো আর সিনেমার মালিকানা নির্ধারণের কোনো বিষয় হতে পারে না। নোলক নিয়ে যথেষ্ট মিথ্যাচার হয়েছে, আর নয়। কাগজপত্রেও সব ঠিকঠাক আছে।’

রাশেদ রাহার ওই সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পরিপ্রেক্ষিতে মার্চের ৩ তারিখে পাল্টা জিডি করেন প্রযোজক সাকিব ইরতেজাও। এরপরই গত ২৫ মার্চ সকালে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হাজির হন রাশেদ রাহা ও প্রযোজক-কাম-নির্মাতা সাকিব ইরতেজা সনেট।

শুনানি শেষে সাধারণ ডায়েরির দুই পক্ষের যে অভিযোগ, সেটি তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বাবলুর রহমানকে। বিষয়টা এখন তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

পরিচালকের মর্যাদা ফিরে পেতে চাওয়া নির্মাতা রাশেদ রাহা। ছবি: সংগৃহীত

তার কাছে প্রশ্ন ছিল, নির্মাতা রাশেদ রাহা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় যে সাধারণ ডায়েরিটি (জিডি) করেছেন, সেটি কি ‘নোলক’ ছবির মালিকানা নির্ধারণসংক্রান্ত, নাকি তাকে বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, সে অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে?

এ বিষয়ে বাবলুর রহমান বলেন, ‘আসলে সিনেমাটি নির্মাণের একটা পর্যায়ে গিয়ে তাদের (প্রযোজক ইরতিজা চৌধুরী সনেট ও রাশেদ রাহা) মধ্যে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি হয়। সে সময়ই প্রথম রাশেদ রাহার পক্ষে তার বোন তার নিরাপত্তার বিষয়টি উল্লেখ করে একটি জিডি করেন। এখানে নোলক ছবির মালিকানা নির্ধারণবিষয়ক কোনো বিষয় কিছু নেই। এটার তদন্ত চলতেছে। শেষ হলে বলতে পারব।’

এদিকে বিষয়টি নিয়ে রাশেদ রাহা প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি চাই, ছবিটা আমার নামেই যাক। আমার যে রেমুনারেশন প্রাপ্য আছে, সেটা আমাকে দিক। এ দুটি বিষয় ছাড়া আমার আর কোনো বিষয়ে কিছু বলার নেই। আমি এখনো চাই ছবিটা পর্দায় আসুক, সেন্সরে যাক। তবে সেটা একটা সমাধান হয়েই। এর বাইরে আর কিছু চাওয়ার নেই। বিষয়টা যদি সমাধান না হয়, জটিলতা কিন্তু বাড়বেই।’

‘নোলক’ ছবির কাহিনি, সংলাপ ও চিত্রনাট্য করেছেন ফেরারি ফরহাদ। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঢাকার কপিরাইট অফিসে নির্মাতা রাশেদ রাহা লিখিত দাবি করেন, নোলক চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপির রচয়িতা তিনি নিজে। কিন্তু কপিরাইট অফিস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে নোলক ছবির সৃজনশীল কর্মের প্রণেতা ও মেধাস্বত্ত্বের অনুপাত হিসেবে কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন সনদ ফেরারি ফরহাদ পান।

কপিরাইট অফিসের পরিদর্শক আতিকুজ্জামান আতিক প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টার সমাধান করে দিয়েছি। মামলার রায় রাশেদ রাহার বিরুদ্ধে গিয়েছে। কারণ সে যেসব তথ্য দিয়েছে সবই ভুল ছিল। এখন প্রকৃত মালিক চাইলে রাহার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। আর মামলার রায় হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে রাশেদ রাহা চাইলে আবেদন করতে পারতেন তার পক্ষে। কিন্তু তিনি সেটা করেননি। আর যেহেতু তিনি করেননি, এখন আপিল করলেও হবে না। আমাদের দায়িত্ব মালিকানা নিশ্চিত করে দেওয়া, সেটাই করে দিয়েছি।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ‘নোলক’ ছবিটিকে অনাপত্তিপত্র প্রদান করেছে। এতে যুগ্ম সচিব (পরিচালক, উৎপাদন) নুজহাত ইয়াসমিনের স্বাক্ষর রয়েছে। যেখানে বলা হয়েছে, মেসার্স বি হ্যাপী ছবিটি প্রযোজনা করেছে। আর পরিচালক হিসেবে নাম রয়েছে সাকিব ইরতেজা চৌধুরী সনেটের। সেখানে বলা হয়েছে, ‘ছবিটি বিএফডিসিতে নির্মিত হয়নি। এ চলচ্চিত্রটির খাতে বিএফডিসির কোন পাওনা না থাকায় বিএফডিসির অনাপত্তি জ্ঞাপন করা হলো।’

‘নোলক’ ছবির একটি দৃশ্যে শাকিব খান ও ববি হক। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি মুশফিকুর রহমান গুলজার বলেন, ‘এ বিষয়টা সমাধান করার জন্য আমার কয়েকবার বসেছিলাম দুই পক্ষের সঙ্গে। আমরা বলেছি পরিচালক হিসেবে নির্মাতা ও প্রযোজক দুজনেরই নাম যাবে। কিন্তু তারা মানেনি বিষয়টা। আমাদের এখন আর কী করার আছে? আমরা ও প্রযোজক সমিতি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি।’

২০১৭ সালের ১ ডিসেম্বর ভারতের হায়দরাবাদে ‘নোলক’ ছবির শুটিং শুরু হয়। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল গত পহেলা বৈশাখে। মহরতের পর টানা ২৮ দিন ভারতের হায়দরাবাদে শুটিং হয়। ইউনিট নিয়ে দেশে ফেরার পরই ছবির প্রযোজক সাকিব সনেটের সঙ্গে লগ্নি করা টাকাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নির্মাতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ কারণেই ছবির নির্মাণকাজ কয়েকবার পিছিয়ে যায়।

দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত বছরের ২২ জুলাই ফের কলকাতায় ছবির শুটিং শুরু হয়। কিন্তু সেবার দেখা দেয় আরেক দ্বন্দ্ব। ছবির প্রযোজক আসেন পরিচালকের ভূমিকায়। তখন থেকেই ছবিটি নিয়ে জটিলতার শুরু হয়।

বর্তমানে ছবিটি সেন্সর বোর্ড প্রদর্শনের জন্য জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে ছবিটির প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। এতে ববি হক ছাড়াও অভিনয় করেছেন মৌসুমী, ওমর সানী, তারিক আনাম খান, ভারতের রজতাভ দত্ত, সুপ্রিয় দত্তসহ অনেকেই।

সাকিব ইরতিজা চৌধুরী সনেট বলেন, ‘ছবিটি করতে গিয়ে আমার প্রফেশন, ব্যক্তি, কোম্পানি, বিনিয়োগে লস—সব দিক থেকেই ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে। ছবির যে বাজেট ছিল, রাহা তারও দেড় গুণ বেশি খরচ করে ফেলেছে। আমার অনুমতি ছাড়া প্রোডাকশনের এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সে আইফোন এক্স কিনেছে। আমি তো একজন ব্যবসায়ী, এখানে তো আর টাকা অনুদান দেওয়ার জন্য আসিনি।’

প্রিয় বিনোদন/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...