বিনা দোষে কারাগারে থাকা ছেলের মুক্তি চেয়ে আদালতপাড়ায় শহর বানু। ছবি: প্রিয়.কম

বিনা দোষে মৃগী রোগ নিয়ে ছেলে জেলে, আদালতে দিন কাটে মায়ের অশ্রু ফেলে (ভিডিও)

বৃদ্ধার বয়স হবে আনুমানিক ৬০-৬৫ বছর। চোখে-মুখে হতাশা ও কষ্টের ছাপ। কী যেন বলবেন, কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৫২ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৫২
প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৫২ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১৯:৫২


বিনা দোষে কারাগারে থাকা ছেলের মুক্তি চেয়ে আদালতপাড়ায় শহর বানু। ছবি: প্রিয়.কম

(প্রিয়.কম) মঙ্গলবার দুপুর দেড়টা। সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের ৯ নম্বর কোর্টের সামনে এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করছেন শহর বানু নামের এক বৃদ্ধা। পরনে একটি গোলাপি রঙের শাড়ি। বৃদ্ধার বয়স হবে আনুমানিক ৬০-৬৫ বছর। চোখে-মুখে হতাশা ও কষ্টের ছাপ। কী যেন বলবেন, কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না।

২৩ এপ্রিল, মঙ্গলবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের মূল ভবনের দ্বিতীয় তলায় এমন চিত্র দেখা যায়।

প্রিয়.কমের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে শহর বানু বলেন, তার ছেলে আরমান বিনা দোষে সাড়ে তিন বছর যাবৎ কারাবন্দী রয়েছেন। কিন্তু মুক্তি মিলছে না। কথাগুলো বলতে বলতে জীবন সায়াহ্নের এই বৃদ্ধা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের পানি মুছছিলেন আর কান্না করছিলেন।

জানা যায়, মিরপুরের শাহাবুদ্দিন বিহারির বিরুদ্ধে দায়ের করা এক মাদক মামলায় জেলে রয়েছেন আরমান। কারণ হিসেবে জানা যায়, শাহাবুদ্দিনের পিতার নাম মো. ইয়াসিন এবং আরমানের পিতার নামও ইয়াসিন। পিতার নামের মিল থাকার কারণে অপরাধী না হয়েও আরমান জেল খাটছেন বছরের পর বছর। আর এই কারাবন্দী আরমানের মুক্তি চেয়েই হাইকোর্টের বারান্দায় ঘুরছেন মিরপুর পল্লবীর শহর বানু।

কেন এসেছেন হাইকোর্টে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘গত সাড়ে তিন বছর আগে থেকেই ছেলের মুক্তির জন্য প্রশাসন-পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে ঘুরছি। কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত, উকিলের চেম্বার—কোথায়ও যাওয়া বাদ দেইনি। কিন্তু ছেলের মুক্তি মিলছে না। আমার শুধু একটিই দাবি, ছেলের মুক্তি। বিনোদোষে কেন আমার ছেলেকে কারাবন্দী করে রাখা হবে। আমার আরমানের কী দোষ? সে তো নিরপরাধ, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।’

শহর বানুর দুই ছেলের মধ্যে আরমান বড়। আরমানকে যখন পুলিশ ধরে নিয়ে যায়, তখন তার স্ত্রী দুই মাসের গর্ভবতী ছিলেন। গর্ভে থাকা সন্তান দুনিয়াতে এসেছে, কিন্তু আরমান জেল থেকে এখনো বের হয়নি।

আপনার সংসার চলে কীভাবে?—এমন প্রশ্নের জবাবে শহরবানু প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমি ও আমর ছেলের বউ অন্যের বাড়িতে বুয়া হিসেবে কাজ করি। আমার স্বামী বেঁচে নেই। ১৫-১৬ বছর আগেই মারা গ্যাছে। একমাত্র উপার্জনের ব্যক্তি ছিল আরমান। আরমানকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার পর আমি ও আরমানের বউ অন্যের বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ করি।’

এক প্রশ্নের জবাবে শহর বানু বলেন, ‘আমার ছেলে মৃগীর রোগী। শুনতে পাই মাঝেমধ্যে জেলখানার ভিতরে অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকে। মুখ দিয়ে ফেনা ওঠে। দুই ঘন্টা পর সুস্থ হয়। তার হুঁশ থাকে না। অন্য আসামিরা আমার ছেলেকে সেবা দেয়। সুস্থ করে তোলে।’

ছেলেকে জেল থেকে বের করতে এত সময় লেগে যাচ্ছে কেন?—এমন প্রশ্নের জবাবে এই বৃদ্ধা বলেন, ‘আমার ছেলেকে জামিন করাতে এক উকিলের কাছে এক বছর মামলা নিয়ে ঘুরেছি। সে পারেনি। এরপর হাইকোর্টে এসেছি। আসার পর উকিলরা আমাকে পরামর্শ দিয়েছে পেপারে রিপোর্ট করানোর জন্য। তারা বলেছে, পত্রিকায় রিপোর্ট করালে আপনার ছেলে বের হবে। এরপর আমি সাংবাদিকদের জানালে আমার ছেলের বিষয়ে রিপোর্ট করা হয়।’

মিরপুরের পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমানকে আদালতে হাজির করার নির্দেশনা, মুক্তি ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে।

গত ২১ এপ্রিল, রবিবার এ বিষয়ে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে ল’ অ্যান্ড লাইফ ফাউন্ডেশনের পক্ষে ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট করেন। আবেদনে নির্দোষ আরমানের আটকাদেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না—এই মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক, ঢাকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পল্লবীর ওসিসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছে রিটে।

বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আগামী ২৩ এপ্রিল, মঙ্গলবার আবেদনটি শুনানির জন্য দিন ধার্য ছিল। শুনানির পর নির্দোষ আরমানকে যে মামলায় কারাগারে রাখা হয়েছে, সেই মামলার যাবতীয় নথি তলব করেছে হাইকোর্ট। আগামী সাত দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগর দায়রা জজকে এ নথি পাঠাতে বলা হয়েছে। বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। আগামী ৬ মে এ মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।

আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার হুমায়ন কবির পল্লব। এর আগে গত ১৮ এপ্রিল একটি জাতীয় দৈনিকে ‘কারাগারে আরেক জাহালম’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদন সংযুক্ত করে রিট আবেদনটি দায়ের করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অপরাধী না হয়েও পাটকল শ্রমিক জাহালমকে জালিয়াতির ৩৩ মামলার আসামি হয়ে তিন বছর কারাভোগ করতে হয়েছিল। অনেক ঘাটের জল পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে তিনি কারামুক্ত হন। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা এখন মানুষের মুখে মুখে। এর রেশ না কাটতেই আরেক জাহালম-কাণ্ড বেরিয়ে এসেছে।

পল্লবীর বেনারসি কারিগর মো. আরমান নির্দোষ হয়েও ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গত তিন বছর ধরে কারাভোগ করছেন। রাজধানীর পল্লবী থানার একটি মাদক মামলায় ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি মাদক কারবারি শাহাবুদ্দিন বিহারি এ মামলার প্রকৃত আসামি। কিন্তু তার পরিচয়ে, তার পরিবর্তে সাজা ভোগ করছেন আরমান।

শুধু পিতার নামে মিল থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে শাহাবুদ্দিন নামে আদালতে সোপর্দ করেছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। অন্যদিকে প্রকৃত আসামি শাহাবুদ্দিন কারাগারের বাইরে দিব্যি মাদক কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন।

এ ঘটনায় প্রশ্ন জেগেছে, এটি কি পুলিশের ভুল, নাকি সচেতন অপরাধ? উৎকোচের বিনিময়েই কি প্রকৃত মাদক কারবারিকে রক্ষার অপতৎপরতা চালানো হচ্ছে? যদি তা-ই হয়, তবে এ ঘটনায় কে কে দায়ী? তাদের আইনের মুখোমুখি করা সম্ভব কি? একদিকে যখন এসব প্রশ্ন উঠছে, অন্যদিকে তখন নির্দোষ কারাবন্দী আরমানের দরিদ্র মা, স্ত্রী আর সন্তানের যাপিত জীবন হয়ে পড়েছে মানবেতর।

পুলিশের ভুলে অথবা গোপন কারসাজিতে মৃত ইয়াছিন ওরফে মহিউদ্দিনের ছেলে শাহাবুদ্দিনের পরিবর্তে দীর্ঘ তিন বছর ধরে কারাগারে মানবেতর জীবনযাপন করছেন মো. আরমান (৩৬)। শুধু পিতার নামে (মৃত ইয়াছিন) মিল থাকায় শাহাবুদ্দিনের বদলে পল্লবীর ১৩ হাটস, ব্লক-এ, সেকশন-১০ তেজগাঁও নন-লোকাল রিলিফ ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃগী রোগী আরমানকে বিনা অপরাধে সাজা ভোগ করতে হচ্ছে।

প্রিয় সংবাদ/আজাদ চৌধুরী

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...