চীনা ইন্টারনেট জায়ান্ট বাইটডান্স। ছবি: সংগৃহীত

নিউজ অ্যাগ্রিগেশন, টওটিয়াও অ্যাপ এবং বাইটডান্স

টওটিয়াও লাখ লাখ মিডিয়া আউটলেট থেকে নিউজ ও ভিডিও অ্যাগ্রিগেট করে এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ব্যবহার করে গ্রাহকের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ফিড দেখায়।

মিজানুর রহমান
সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:১৪ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:১৪
প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:১৪ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৩:১৪


চীনা ইন্টারনেট জায়ান্ট বাইটডান্স। ছবি: সংগৃহীত

টওটিয়াও (Toutiao) বিশ্বের অন্যতম সেরা একটা নিউজ অ্যাগ্রিগেশন অ্যাপ। ২০১২ সালে চীনা টেক জায়ান্ট বাইটডান্স (Bytedance) এই অ্যাপটি চালু করে। এটি লাখ লাখ মিডিয়া আউটলেট থেকে নিউজ ও ভিডিও অ্যাগ্রিগেট করে এবং আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স ব্যবহার করে গ্রাহকের রুচি ও চাহিদা অনুযায়ী প্রত্যেককে আলাদা আলাদা ফিড দেখায়। অনেকটা ফেসবুকের নিউজ ফিড এবং অ্যাপল নিউজ অ্যাপের মতো। অল্প কয়েকদিন টওটিয়াও অ্যাপটি ব্যবহার করলেই এটি আপনার অভ্যাস, ব্যক্তিত্ব ও চাহিদা বুঝে যাবে এবং আপনাকে সে অনুযায়ী কনটেন্ট দেখাবে। অ্যাপটি যত বেশি ব্যবহার করবেন, তত বেশি আপনার পছন্দমতো কনটেন্ট দেখতে পারবেন এবং অতি দ্রুতই এতে আসক্তি চলে আসবে।

এখানে একটু বলে রাখি, বাংলাদেশে প্রিয়.কমও এখন এটা নিয়ে কাজ করছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই সেবা দিতে পারবে। প্রিয়.কম ইতোমধ্যেই ৩৮টি ওয়েবসাইট থেকে নিউজ এগ্রিগেট করছে এবং বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় নিউজ এগ্রিগেটর সাইটে পরিণত হয়েছে। 

বলছিলাম টওটিয়াও অ্যাপের কথা, টওটিয়াও অ্যাপের সফলতা অনেকেই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি, বিশেষ করে মিডিয়া আউটটলেটগুলো। তারা অ্যাপটির বিরুদ্ধে অরিজিনাল কনটেন্ট চুরির অভিযোগ এনে শতশত মামলা করে। এক পর্যায়ে বাইটডান্সের প্রতিষ্ঠাতা ঝ্যাং ইমিং মিডিয়া আউটলেটগুলোর সঙ্গে রেভিনিউ ভাগাভাগির চুক্তি করে। এখন বিশ্বের অধিকাংশ স্থানেই টওটিয়াও অ্যাপ অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং অ্যাপটির ৭০ কোটিরও বেশি রেজিস্ট্রার্ড গ্রাহক আছে।

বাইটডান্সের কথা যেহেতু চলেই আসলো, তাহলে চীনা এ ইন্টারনেট জায়ান্ট কোম্পানিটি সম্পর্কে কিছু বলা যাক। আমরা সবাই টিকটকের নাম জানি, কিন্তু টিকটকের ক্রিয়েটর প্রতিষ্ঠান বাইটডান্সের নাম জানি না। বাইটডান্স একটা চাইনিজ স্টার্টআপ কোম্পানি যার ভ্যালুয়েশন ৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই মুহূর্তে এটাই বিশ্বের সবচেয়ে দামি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান (উবার দ্বিতীয়, সোর্স: সিবি ইনসাইটস)। অন্যান্য চীনা টেক জায়ান্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর থেকে বাইটডান্সের সাফল্য কিছুটা ব্যতিক্রমী এবং দ্রুততম।

বাইটডান্সকে বলা হয় ‘শর্ট ভিডিও’ এম্পায়ার। ছবি: সংগৃহীত

২৯ বছর বয়সে ঝ্যাং ইমিং যখন বাইটডান্স প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখন ইনভেস্টররা এখানে ইনভেস্ট করতে রাজি ছিল না। অথচ মাত্র ৭ বছরের ব্যাবধানে সবাইকে ভুল প্রমাণ করে বাইটডান্সকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী স্টার্টআপ কোম্পানিতে পরিণত করেছেন ঝ্যাং। সাধারণত স্টার্টআপ কোম্পানিগুলো একটি বা দুটি মৌলিক সেবার উপর কাজ করে। কিন্তু বাইটডান্সের অন্তত ২০ টি মৌলিক সেবা (মোবাইল অ্যাপ) বিশ্বসেরাদের কাতারে আছে। বিশ্বব্যাপী ১৫০টিরও বেশি বাজারে ৭৫টিরও বেশি ভাষায় বাইটডান্সের সেবাগুলো পাওয়া যাচ্ছে।

অন্যান্য চীনা টেক কোম্পানিগুলোর তুলনায় বাইটডান্স অনেক আগেই বহির্বিশ্বে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করে এবং বহির্বিশ্বে তাদের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রাহক আছে। বহির্বিশ্বে তাদের সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যাপ হচ্ছে টিকটক। বিশ্বব্যাপী ১০০ কোটির বেশি টিকটক অ্যাপ ডাউনলোড করা হয়েছে যাদের প্রায় সবাই তরুণ। টিকটক ব্যবহারকারীর ২৫ শতাংশ ভারতীয় এবং ৯ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক (সোর্স: সেন্সর টাওয়ার)। এমনকি গত বছর চীন সফরের সময় অ্যাপলের সিইও টিম কুক বাইটডান্সের অফিসে যাওয়ার লোভ সামলাতে পারেননি।

বহির্বিশ্বে বাইটডান্সের অ্যাপগুলোর ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কৌশলগত অধিগ্রহণ। যেমন টিকটকের কথাই ধরা যাক। ২০১৭ সালের শেষদিকে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারে মিউজিক্যালি অ্যাপ কিনে নেয় বাইটডান্স। এই অ্যাপটি যুক্তরাষ্ট্রে আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু বাইটডান্স এটি কিনে নিয়ে তাদের টিকটক অ্যাপের সঙ্গে মার্জ করে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক ব্যবহারকারীর সংখ্যা রাতারাতি বুম করে।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে চীনের ইন্টারনেট জায়ান্ট প্রতিষ্ঠান বাইডু, আলীবাবা কিংবা টেনসেন্টের (এ তিনটি কোম্পানিকে সংক্ষেকে BAT বলা হয়) মতো কোম্পানির কোনো ধরনের সহায়তা বা অর্থায়ন ছাড়াই ঝ্যাং ইমিং বাইটডান্সকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসতে পেরেছেন। বলা হয়ে থাকে, এই BAT’র সঙ্গে কম্পোমাইজ করা ছাড়া চীনে কোনো ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান দাঁড়াতে পারে না, অথচ বাইটডান্স এখন এই তিন মোড়লের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করে টিকে আছে।

তবে দাঁত থাকলে দাঁতে ব্যথাও হবে। বাইটডান্সও এখন কঠিন সময় পার করছে। চীনে ও বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠানটির বেশ কিছু অ্যাপ ব্যাপক রেগুলেটরি ইস্যুর মুখে পড়েছে। গত এপ্রিলে তাদের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি জোক শেয়ারিং অ্যাপ চীন সরকার সে দেশে বন্ধ করে দিয়েছে। একই সময়ে তাদের মূল অর্থ আয়ের উৎস টওটিয়াও এবং ডৌয়েনও (টিকটকের চীনা ভার্সন) চীন সরকার বন্ধ করে দেয়। টিকটক অ্যাপ শিশুদের ব্যক্তিগত তথ্য গোপনে সংগ্রহ করছে, এমন অভিযোগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অ্যাপটিকে ৫৭ লাখ ডলার জরিমানা করে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা।

গ্লোবাল ইন্টারনেট জায়ান্ট হওয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে বাইটডান্স এগুচ্ছে, তাদের সে পথ মসৃণ হবে না বলেই মনে হচ্ছে।

[প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। প্রিয়.কম লেখকের মতাদর্শ ও লেখার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত মতামতের সঙ্গে প্রিয়.কম-এর সম্পাদকীয় নীতির মিল নাও থাকতে পারে।]

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...