প্রতীকী ছবি

‘ঋণখেলাপি কোম্পানি’র হাতে ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প!

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়। অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডারে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ নিয়ে কাজ করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

রাকিবুল হাসান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪১ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪১
প্রকাশিত: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪১ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১৭:৪১


প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) চলতি বছরের মার্চে দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ হয় দেশের গণমাধ্যমগুলোতে। প্রকাশিত নামগুলোর মধ্যে কম্পিউটার সোর্স লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়।

জানা গেছে, এই ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের নেতৃত্বাধীন স্টুডিও ম্যাশন লিমিটেড নামে অপর একটি প্রতিষ্ঠান সরকারের ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পের কাজ করছে। ফলে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।

অভিযোগ উঠেছে, টেন্ডারে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা না থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ নিয়ে কাজ করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

প্রিয়.কমের অনুসন্ধানে এমন চিত্রের দেখা মিলেছে। একই সঙ্গে কম্পিউটার সোর্সের সঙ্গে স্টুডিও ম্যাশনের পরিচালকদের যোগসাজশের বিষয়টির বিষয়ে প্রমাণ মিলেছে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে।

যেসব অভিযোগ উঠেছে

এই প্রকল্পে কাজ করা স্টুডিও ম্যাশনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনাকারীরা শীর্ষ ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির এই প্রকল্পের টেন্ডারে অংশ নেওয়ার মতো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটি কাজ পেয়েছে।

ঋণখেলাপি কোম্পানি কম্পিউটার সোর্সের সঙ্গে স্টুডিও ম্যাশনের যোগসাজশের বিষয়টি জানাতে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে একাধিক ব্যক্তি।

মন্ত্রীর বরাবরে ওই অভিযোগসংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠানো হয় ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে। ধারণা করা হচ্ছে, রি-টেন্ডার প্রক্রিয়ার আগে এই চিঠি পাঠানো হয়।

চিঠিটির একটি কপি দেখতে পেয়েছে প্রিয়.কম। চিঠিতে বিষয় হিসেবে লেখা ছিল, ‘সরকারি কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পের টেন্ডারে অযোগ্য কোম্পানির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংক্রান্ত’।

চিঠিতে দাবি করা হয়, ‘এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নের চিত্র অজ্ঞাত কারণে হতাশাজনক। নির্বাচনের আগে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন শুরু করার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করা হলেও অজ্ঞাত কারণে তা করা হয়নি। এমনকি জাতীয় নির্বাচনের তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও বাস্তবায়ন কাজ শুরু হওয়ায় কার্যত কোনো উদ্যোগ নেই।’

চিঠিতে দাবি করে বলা হয়, ‘স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত থাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন আজও সূর্যের মুখ দেখছে না। পছন্দের লোকদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্যই মূলত প্রকল্পটি বিলম্বের অন্যতম প্রধান কারণ। সম্প্রতি পিপিআর অনুযায়ী প্রকল্পে অত্র কাজে অংশগ্রহণের সম্পূর্ণভাবে অযোগ্য “স্টুডিও ম্যাশন” নামের একটি নামসর্বস্ব কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দিতে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা রি-টেন্ডারের মাধ্যমে প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছেন।’

চিঠিতে স্টুডিও ম্যাশন নামের কোম্পানিটির প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাতিল করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।

একই সঙ্গে এই প্রকল্পে ঋণখেলাপি কোম্পানির টেন্ডারে অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে অভিহিতকরণে প্রকল্প পরিচালক বরাবর অপর একটি চিঠি পাঠানো হয়।

চিঠিতে দাবি করা হয়, টেন্ডারে অংশ নেওয়ার মতো যোগ্যতা নেই স্টুডিও ম্যাশনের। চিঠিতে এ সংক্রান্ত ছয়টি পয়েন্ট তুলে ধরা হয়। ওই চিঠিতেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিটির অনুলিপি ডাক, টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এবং দুদক চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়।

প্রমাণ মিলল কম্পিউটার সোর্স ও স্টুডিও ম্যাশনের যোগসাজশের

এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রিয়.কমের অনুসন্ধান চলাকালে দুই প্রতিষ্ঠানের প্রসঙ্গ এলেই সামনে চলে আসে এ ইউ খান জুয়েল এবং আবু মোস্তফা চৌধুরী নামের দুই ব্যক্তির নাম।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বলছে, ঋণখেলাপি কোম্পানি হিসেবে ঘোষিত কম্পিউটার সোর্স এবং স্টুডিও ম্যাশনের নেতৃত্বদানকারীরা একই ব্যক্তি।

২০১৭ সালের ১২ মার্চ ‘ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছে কম্পিউটার সোর্স!’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রিয়.কম। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অসংখ্য শো-রুম বন্ধের মধ্যে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে ব্যাংকের কাছে শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দিতে না পারার কারণে নতুন নামে ব্যবসা শুরু করতে যাচ্ছে কম্পিউটার সোর্স। নতুন এই প্রতিষ্ঠানের নাম দেওয়া হয়েছে “স্টুডিও ম্যাশন লিমিটেড”। যদিও কম্পিউটার সোর্স একই সাথে “সিএসএম” (কম্পিউটার সোর্স মেশিন) নামে একটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে এবং “সেভাল ইলেক্ট্রনিক্স লিমিটেড” নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুরে পরিচালনা করছে। সম্প্রতি জানা গেছে, কম্পিউটার সোর্সের কাছে প্রোডাক্ট ও সার্ভিস নেওয়া হলে “স্টুডিও ম্যাশন লিমিটেড” নামে ইনভয়েস (ক্রয় রশিদ) দেওয়া হচ্ছে।’

প্রতিবেদনটিতে কম্পিউটার সোর্সের পরিচালক হিসেবে (ডিস্ট্রিবিউশন সেলস) পরিচয় করে দেওয়া হয় এ ইউ খান জুয়েলকে।

একই সঙ্গে ২০১৮ সালের নভেম্বরে আইসিটিবিষয়ক অপর একটি সংবাদমাধ্যম ‘এসএমএল (স্টুডিও ম্যাশন লিমিটেড) অ্যাপয়েন্টেড সান্তাক ইউপিএস ডিস্ট্রিবিউটর’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে এ ইউ খান জুয়েলকে স্টুডিও ম্যাশনের পরিচালক হিসেবে পরিচয় করে দেওয়া হয়। একই দিন অন্য যেসব সংবাদমাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল সেখানেও বলা হয় স্টুডিও ম্যাশনের পরিচালক এ ইউ খান জুয়েল।

এদিকে বেসিসের তথ্য অনুযায়ী স্টুডিও ম্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মোস্তফা চৌধুরী। এর আগে তিনি কম্পিউটার সোর্সের পরিচালক হিসেবে ছিলেন এর প্রমাণ মেলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতেই।

২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইংরেজি এক দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আবু মোস্তফাকে পরিচয় করে দেওয়া হয় কম্পিউটার সোর্সের পরিচালক হিসেবে।

মন্ত্রীর কাছে পাঠানো অভিযোগের একটি চিঠির খণ্ডিত অংশ। ছবি: প্রিয়.কম

যা বললেন সংশ্লিষ্টরা

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এবং ট্রেনিং সেন্টারে ফাইবার ক্যাবল নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্পে পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড বা বিটিসিএলএর জেনারেল ম্যানেজার আমিনুর রহমান। প্রকল্পটিতে স্টুডিও ম্যাশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে বলে প্রিয়.কমকে নিশ্চিত করেন তিনি। তবে ঋণখেলাপি কোম্পানি কম্পিউটার সোর্সের সঙ্গে স্টুডিও ম্যাশনের সম্পৃক্ততার কথা তিনি অস্বীকার করেন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘কম্পিউটার সোর্সের সঙ্গে এইটার কোনো সম্পর্ক নেই। এইটা আলাদা কোম্পানি। তাদের কোনো রেফারেন্সও নেই।’

প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন সব কন্টাক্ট হয়ে গেছে। কাজ শুরু হয়ে যাবে খুব শিগগির। কাজ এখন সার্ভে পর্যায়ে রয়েছে। ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সার্ভে হয়ে গেছে। ইকুইপমেন্ট আসলে ইনস্টলের কাজ শুরু হয়ে যাবে।’

টেন্ডারে অংশ নেওয়ার বিষয়ে যোগ্যতাবিষয়ক যে অভিযোগ উঠেছিল এর বিষয়ে বিটিসিএল প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছিল বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

তিনি বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ আমাদের কাছে এসেছিল। আমরা বিষয়টি মূল্যায়ন কমিটির কাছে পাঠিয়েছিলাম। কমিটি বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করেছে। তারা বলেছে কোনো সমস্যা নেই।’

বিটিসিএলের ওয়েবসাইটে এই প্রকল্প সম্পর্কিত কোনো তথ্য নেই, তাকে এমনটি জানালে তিনি বলেন, ‘ও তথ্য নেই! যারা বিষয়টি দেখে তাদের বলে দেবো।’

এদিকে উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলো মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের কাছে তুলে ধরে প্রিয়.কম। মন্ত্রী জানিয়েছেন এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি জানেন না।

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে এই ধরনের কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে এই বিষয়ে আমি খোঁজ নিচ্ছি।’

সর্বশেষ যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় স্টুডিও ম্যাশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু মোস্তফা চৌধুরীর সঙ্গে।বেসিসের ওয়েবসাইটে থাকা তার নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সিমটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না বলে জানা যায়।

উল্লেখ্য, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছিল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ১২ জুন প্রকল্পটি গৃহীত হয়। দেশের আটটি বিভাগে সরকারি কলেজ ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে তিনটি লটে একযোগে অপটিক্যাল ক্যাবল ও ইকুইপমেন্ট স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করা হবে বলেও জানানো হয়েছিল।

প্রিয় প্রযুক্তি/আজাদ চৌধুরী