সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

ফাগুন হত্যা এবং কিছু প্রশ্ন

ফাগুনের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত করেছে কে? পুলিশ উদ্ধার করে কি তাকে হাসপাতালে নিয়েছিল? এমনও তো হতে পারে, সে আরও কিছুক্ষণ বেঁচে ছিল। মাথায় আঘাতের কারণে অচেতন অবস্থায় ছিল।

তানজিল রিমন
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০১৯, ১৭:১৬ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯, ১৮:৪৬
প্রকাশিত: ১৯ জুন ২০১৯, ১৭:১৬ আপডেট: ১৯ জুন ২০১৯, ১৮:৪৬


সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

তরুণ সাংবাদিক ইহসান ইবনে রেজা ফাগুনের হত্যার প্রায় এক মাস হতে চলেছে। এখন পর্যন্ত দুজনকে আটক করা ছাড়া আর কোনো নতুন তথ্য নেই।

গত ২১ মে, মঙ্গলবার ঢাকা থেকে বাড়ি ফেরার পথে নিখোঁজ হন ফাগুন। পরে তার মরদেহ উদ্ধার করে জামালপুর রেলওয়ে থানা পুলিশ। ঘটনা-পরবর্তী গণমাধ্যমকে দেওয়া রেলওয়ে পুলিশের তথ্য নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে।

মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ঘেঁটে দেখা গেছে, একই বিষয়ে রেলওয়ে পুলিশ একেক পত্রিকাকে একেক ধরনের তথ্য দিয়েছে। বিষয়গুলো একটু দেখা যাক-

সময়

ঠিক কয়টা সময় রেলওয়ে পুলিশ মৃতদেহের খবর পেয়েছে? কয়টা সময় উদ্ধার করেছে? বিভিন্ন পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ের বর্ণনা এসেছে। জামালপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তাপস চন্দ্র পণ্ডিতের বরাত দিয়ে পত্রিকাগুলো যে সময়ের কথা লিখেছে, তাতে ২১ মে রাত ১১টা থেকে পরদিন সকালের কথাও এসেছে। পরদিন সকালের সময় যারা উল্লেখ করেছে, তাদেরটা বাদ দেওয়া যাক। কিন্তু যারা একইদিন ১১টা থেকে রাত দেড়টা বা মধ্যরাত লিখেছেন, তারা সবাই কি ভুল করেছেন? এরমধ্যে রয়েছে প্রথম আলো, কালের কণ্ঠ, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, সমকাল, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, ডয়েচে ভেলে, জনকণ্ঠ, যুগান্তর, বাংলাদেশ প্রতিদিন, জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। এর বাইরে আরও পত্রিকা রয়েছে, যারা সময়টা ভিন্ন ভিন্ন লিখেছে। সময় সংক্রান্ত অংশটুকু বিভিন্ন পত্রিকা থেকে তুলে ধরা হলো-

পুলিশ ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে প্রথম আলো লিখেছে, সদর উপজেলার নান্দিনা বন্ধপাড়া এলাকার রেললাইনের পাশে গতকাল রাতে অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। খবর পেয়ে রাত ১১টার দিকে পুলিশ লাশটি থানায় নিয়ে যায়।

ওসির বরাত দিয়ে অন্যরা সংবাদ দিয়েছে। এরমধ্যে কালের কণ্ঠ লিখেছে, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে জামালপুর-নান্দিনা রেলস্টেশনের মাঝামাঝি কালিবাড়ী মধ্যপাড়া এলাকায় রেললাইনের পাশে পড়ে থাকা অজ্ঞাত এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ঢাকা ট্রিবিউনবাংলা ট্রিবিউন লিখেছে, মঙ্গলবার রাত দেড়টার দিকে স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে রানাগাছা রেল লাইনের পাশ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবককের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। 

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম  লিখেছে, মঙ্গলবার গভীর রাতে উপজেলার রানাগাছা মধ্যপাড়া এলাকা থেকে ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন (২১) নামে এই সাংবাদিকের লাশ উদ্ধার করেন তারা।

সমকাল  লিখেছে, স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে রেললাইনের পাশ থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের এক যুবকের লাশ উদ্ধার করা হয়।

বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমও একই সময়ের কথা লিখেছে। যুগান্তররাইজিংবিডি লিখেছে, সাড়ে ১২টায় উদ্ধারের কথা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে কোন সময়টায় পুলিশ খবর পেয়েছে এবং কোন সময়টায় উদ্ধার করেছে? পুলিশে খবর দিলো কে? আর পত্রিকাগুলোর প্রতিটি সংবাদই তাদের জেলা প্রতিনিধির করা এবং সময়টা রেলওয়ে পুলিশের ওসির বলা সময়টাই লেখা হয়েছে। এখন ভুলটা আসলে কার? ওসি কি একেকজনকে একেক সময়ের কথা বলেছেন নাকি পত্রিকাগুলো ভুল শুনে ভুল লিখেছে?

এ বিষয়ে কথা হয় মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রকিবুল হকের সঙ্গে। তিনি প্রিয়.কমকে জানান, ১২টা ৪০ মিনিটে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং মরদেহ নিয়ে যান ১২টা ৫৫মিনিটের দিকে।

আঘাতের চিহ্ন

ফাগুনের মরদেহ আঘাতের চিহ্ন নিয়ে রেলওয়ে ওসি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তাতেও বেশ গোলমাল রয়েছে। তার বরাত দিয়ে পত্রিকাগুলো যে তথ্য দিয়েছে, একটার সঙ্গে অন্যটার মিল নেই।

প্রথম আলোকে তিনি বলেছেন, ফাগুনের শরীরের কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। তবে মাথায় আঘাত থাকতে পারে।

প্রথম আলোকে ধারণার কথা বললেও বিডিনিউজকে বলেছেন, আঘাতের চিহ্ন নেই। অথচ একই দিন সমকালকে জানিয়েছেন, মৃতদেহের মাথার বাঁ পাশে ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করায় মাথা থেঁতলে মগজ বেরিয়ে গেছে। রাইজিংবিডিও এই তথ্য জানিয়েছে।

বাংলানিউজকে বলেছেন, সুরতহালে মরদেহের শরীরে ট্রেনে কাটা বা অন্য কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।

এমন তথ্য জানিয়েছে কালের কণ্ঠও।

সত্যিই কী ফাগুনের শরীরে আঘাতের কোনো চিহ্ন ছিল না। মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ২১ মে, মঙ্গলবার রাতে। আর পত্রিকার অনলাইনে সংবাদ এসেছে ২২ মে, বুধবার সন্ধার পরে এবং পত্রিকায় এসেছে ২৩ মে, বৃহস্পতিবার। সাংবাদিকরা ওসির সঙ্গে কথা বলেছেন বুধবার বিকেলে বা সন্ধ্যায়, কেউ হয়তো রাতে। এখন প্রশ্ন হলো, মরদেহ উদ্ধারের পর যে সুরতহাল প্রতিবেদন করে পুলিশ, সেখানে আসলে কী লেখা রয়েছে? ওসি-ই বা কেন একেকবার একেক তথ্য দিলেন।

ফাগুনের সহকর্মীরা যারা মরদেহ দেখেছেন, তারা জানিয়েছেন, মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের কারণে মাথা থেতলে গেছে। ভেতর থেকে কিছু বের হয়ে গেছে। মাথার একাংশ ভেতরে থেতলানো। সমকালরাইজিংবিডির কাছে যে তথ্য দিলেন, অন্যদের কেন তা দিলেন না?

আবার দুই দিন পর জার্মানির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে বলেছেন, মাথায় আঘাতের কারণে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণের কথা।

তড়িঘড়ি করে দাফন প্রক্রিয়া

প্রায় সব পত্রিকায় খবর এসেছে, ফাগুনের মরদেহের দাফন প্রক্রিয়া শুরু করেছে ১২ ঘণ্টা যাওয়ার আগেই। ফাগুনের মরদেহ যদি রাত ১টায় উদ্ধার হয়, সে অনুযায়ী পরদিন বেলা ১টায় হয় ১২ ঘণ্টা। অথচ তার আগে সকালেই মরদেহ ময়নাতদন্ত শেষে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করা হয় বেওয়ারিশ হিসেবে। এত তড়িঘড়ি কেন করছিল রেলওয়ে পুলিশ? দায় এড়ানোর জন্য? এখানে ঠিক কোন ধরনের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে, বুঝতে পারছি না। কোনো মরদেহ পাওয়ার পর পুলিশের কাজ আসলে কী?

আবারও সময়ের হেরফের

জামার্নির সংবাদমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে তাপস চন্দ্র পণ্ডিত বলেছেন, ‘বুধবার সন্ধ্যায় পিবিআই-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছে আমি জানতে পারি, শেরপুরের একজন সাংবাদিকের ছেলে মিসিং আছে৷ তখন তার কাছ থেকে কাকন রেজার নম্বর নিয়ে আমি নিজেই তাকে ফোন করি৷’

অথচ আমরা ফাগুনের সহকর্মীরা বুধবার বিকেলের আগেই ফাগুনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পেয়েছি। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আমরা জানতে পারি, জামালপুরে যে মরদেহ উদ্ধার হয়েছে, সেটি ফাগুনের। নিশ্চিত করেছেন ফাগুনের বাবা কাকন রেজা।

এই তথ্য এসেছে অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে। তাহলে নতুন করে আবার সময়ের বিষয়টি হেরফের হলো কেন?

মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হলো কীভাবে?

২৪ মে প্রকাশিত ডয়েচে ভেলের প্রতিবেদনে নতুন একটি তথ্য দিয়েছেন ওসি, যে তথ্য আগের দুই দিন কাউকে জানাননি। তিনি বলেছেন, ‘মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে রেললাইনের পাশে ফাঁকা জায়গায় একটি ছেলেকে পড়ে থাকতে দেখে এগিয়ে আসেন গ্রামবাসী৷ তখনও দেহে প্রাণ ছিল৷ গ্রামবাসী তাকে উদ্ধার করে মাথায় পানিও দিয়েছে৷ কিন্তু বেশিক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা যায়নি৷ মৃত্যুর আগে কিছু বলেও যেতে পারেনি ফাগুন৷ মাথায় আঘাতের কারণে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে৷ তবে মৃত্যু সেই রক্তক্ষরণের কারণেই হয়েছে, নাকি গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে, সেটি পোস্টমর্টেম রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না৷’

আহত অবস্থায় ফাগুন কিছুক্ষণ বেঁচে ছিল, এই তথ্য আগে আর কেউ দিতে পারেনি।

ওসি বলেছেন, ফাগুন আহত অবস্থায় বেঁচে ছিল কিন্তু বেশিক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা যায়নি। এরপর যে ফাগুনের মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত করেছে কে? পুলিশ উদ্ধার করে কি তাকে হাসপাতালে নিয়েছিল? এমনও তো হতে পারে, সে আরও কিছুক্ষণ বেঁচে ছিল। মাথায় আঘাতের কারণে অচেতন অবস্থায় ছিল।

পুলিশ বলছে, ১২টা ৪০ মিনিটে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে এবং সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ১২টা ৫৫মিনিটে মরদেহ নিয়ে গেছে। মৃত্যুর বিষয়টি কি চিকিৎসক ছাড়া অন্য কেউ নিশ্চিত করতে পারে? পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে যদি মৃত্যু হয়, তাহলে পুলিশ তাকে কেন হাসপাতালে নিল না? 

ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন জামালপুর রেলওয়ে থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রকিবুল হক, যিনি ফাগুন হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি দাবি করেন, তারা ফাগুনের পালস, নিঃশ্বাস যাচাই করেছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিত হয়েছেন।