প্রতীকী ছবি

বিচারহীনতার কারণেই বাড়ছে ধর্ষণ

জননিরাপত্তা সম্পন্ন রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সামাজিক আন্দোলনের বিকল্প নেই।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০১৯, ১৩:২২ আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯, ১৩:২২
প্রকাশিত: ১২ জুলাই ২০১৯, ১৩:২২ আপডেট: ১২ জুলাই ২০১৯, ১৩:২২


প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ধর্ষণ হচ্ছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ৬৩০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অন্যদিকে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) বলছে, ছয় মাসে ৪৯৮ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অপরাধীদের বিচার না হওয়ার কারণেই এ ধরনের অপরাধ বাড়ছে। বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারলে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমবে না।

মানবাধিকার সংগঠনের নেতারা বলছেন, অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি, তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্য গ্রহণের সময় ভিকটিমকে হয়রানির কারণেই ধর্ষণ মামলার বিচার হয় না। এ ছাড়াও ধর্ষণ মামলার আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার পেছনে বড় একটি কারণ বাদীপক্ষের সঙ্গে আসামিপক্ষের সমঝোতা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ধর্ষণের শিকার নারী-শিশু দরিদ্র পরিবারের। আর্থিক প্রলোভনে তারা সমঝোতা করে। সামাজিকভাবে লজ্জা ও ভয়েও মীমাংসায় আগ্রহী হয় তারা। আবার অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তারি পরীক্ষা বা প্রমাণ সংগ্রহের অভাবেও ভিকটিমের পক্ষে ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তখন তারা বাধ্য হয়েই অভিযুক্তের শর্ত মেনে সমঝোতায় যেতে বাধ্য হয়।

‘ধর্ষকদের জামিন না দিতে বলা হয়েছে’

সামাজিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনায় নিয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনায় জড়িতরা যেন উচ্চ আদালত থেকে বেল (জামিন) না পায় সে বিষয়ে সবাইকে মনোযোগী হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

১০ জুলাই, বুধবার রাজধানীর নিবন্ধন অধিদফতর প্রাঙ্গণে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে কর্মরত জেলা ও দায়রা জজদের নতুন গাড়ির চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এ অনুরোধ করেন আইনমন্ত্রী।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জানি না। অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে এটা নিয়ে আলাপ আলোচনা করব।আমি শুধু একটু অনুরোধ করতে পারি, যে অপরাধগুলো হচ্ছে আমার মনে হয় সময় এসেছে একটু কঠোর হওয়ার, সময় এসেছে (অপরাধী) এদের জেলখানায় রাখার। সে ব্যাপারে বিচার বিভাগকে আমি কোনো সুপারিশ বা আদেশ দিচ্ছি না। সামাজিক পরিস্থিতিতে আমি শুধু অনুরোধ করছি, এদিকে যেন সকলের মনোযোগটা হয়।’

ধর্ষকদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে ঢাবি শিক্ষার্থীদের মানববন্ধন

ধর্ষকদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড চেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রীরা। গত মঙ্গলবার বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে সন্ত্রাসবিরোধী রাজু স্মারক ভাস্কর্যের সামনে এক মানববন্ধনে এ দাবি করেন তারা। অসংখ্য শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। দেশব্যাপী চলমান একের পর এক ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে এ মানববন্ধন করেন তারা।

মানববন্ধনে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের প্ল্যাকার্ড বহন করেন। এ সময় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যে বিচার সমাপ্ত করে ধর্ষকদের মৃ্ত্যুদণ্ড কার্যকরের দাবি করেন তারা।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক বি এম লিপি আক্তার বলেন, ‘আমরা ধর্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চাই, তাদের প্রকাশ্য শাস্তি চাই। অন্যান্য অপরাধের প্রকাশ্যে বিচার হলেও ধর্ষকদের বিচার হয় না। একটা খুনের চেয়ে কোনো অংশে ধর্ষণ ছোট না। এ জন্য ধর্ষণের শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই ধর্ষকরা ভয় পাবে।’

ধর্ষণ ইস্যুতে যা বললেন প্রধানমন্ত্রী

ধর্ষণের মতো জঘন্য কাজ যারা করে, তারা মানুষ না বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন ‘সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

৮ জুলাই, সোমবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে চীন সফর নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন।

নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, সরকার ধর্ষণ রোধে আরও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে কি না?

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দুর্ভাগ্য হচ্ছে ধর্ষণ সবসময় সব দেশে আছে। তবে এখন মেয়েরা সাহস করে কথাটা বলে। একটা সময় সামাজিক লজ্জার কারণে বলতে পারত না।’

ধর্ষণ রোধে পুরুষ সমাজকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পুরুষ সমাজকেও বলব, ধর্ষণটা তো পুরুষ সমাজ করে যাচ্ছে, পুরুষ সমাজেরও একটা আওয়াজ তোলা উচিত। খালি নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? নির্যাতিত হয়ে সব চিৎকার করবে আর নির্যাতনকারীর স্বজাতি যারা আছে তাদেরও এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া উচিত বলে মনে করি।’

বিচারহীনতার কারণে বাড়ছে ধর্ষণ

মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, ধর্ষণ মামলায় মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশের শেষ পর্যন্ত সাজা হয়’।

বিচারহীনতাই ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, প্রত্যেক জায়গায় একজন নারীকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে অথবা একটা কিশোরীকেই প্রমাণ করতে হচ্ছে, সে ধর্ষিত হয়েছে। যেটা আমরা চাই, আসামিই প্রমাণ করবে সে নির্দোষ। রেপ কেসে এটাই কিন্তু হওয়া উচিত।’

এদিকে অনেক সময় ধর্ষণের ঘটনা প্রমাণ করতে না পারার কারণেও বিচার পান না ভিকটিম। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সেলিম রেজা চৌধুরী জানান, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষা হলে ধর্ষণের শারীরিক প্রমাণ পাওয়া সহজ। দেরি হলে প্রমাণ বিলীন হয়ে যায়।

তিনি বলেন, ‘সাধারণত ধর্ষণের পর প্রভাশালীরা সালিশসহ নানা বাহানায় সময় পার করে। তারপর থানায় গেলে থানা নানাভাবে মামলা নিতে দেরি করে। ফলে ধর্ষণ প্রমাণ কঠিন হয়ে পড়ে।’

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় মামলার দীর্ঘসূত্রতায় বাদীপক্ষ মামলা চালাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ধর্ষণের ঘটনায় প্রায়ই সামাজিক ও পারিবারিক পরিসরে আপসের কথা শোনা যায়। তারপরও কেউ কেউ আছেন, যারা সুবিচার পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগেও সমঝোতা করেন ভিকটিম।

শিশুদের নিয়ে কাজ করে এমন ২৬৯টি সংগঠনের জোট বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম (বিএসএএফ) এক প্রতিবেদনে বলছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রতিবন্ধী ২৭ জনসহ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯৬ শিশু। এদের মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৩ শিশু এবং ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৩ শিশুকে।

শিশুর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের এই সংখ্যাটা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং বিষয়টি খুবই উদ্বেগের বলে মনে করেন বিএসএএফের পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ। তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই যে ওয়ারীতে একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হলো, এর বিচার কবে নাগাদ হবে, তা ঠিক বলা যাচ্ছে না। প্রায় প্রতিটি শিশু হত্যার বিচারই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। অনেকেই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। বিচার শুরু হতেই ছয় মাস বা এক বছর সময় লেগে যাচ্ছে। আর দীর্ঘ সময় পর একটা দুইটা ঘটনার বিচার হলেও শাস্তি কার্যকর হচ্ছে না। বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি, তা থেকে বের হতে না পারলে শিশু নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব না।’

ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন শিশু ও প্রতিবন্ধীরাও

সিলেটের রাজন ও খুলনার রাকিবকে নির্যাতনের পর হত্যার ঘটনার কথা উল্লেখ করে আবদুস সহিদ মাহমুদ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘চার বছর আগের এই ঘটনায় মৃত্যুদণ্ড রায় হলেও এখন পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় শিশু নির্যাতনে এই দুটি ঘটনায় খুব দ্রুত বিচার হয়েছে নিম্ন আদালতে। কিন্তু দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় সেই রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কারণ নিম্ন আদালতের ঘটনা উচ্চ আদালতের বিভিন্ন বিভাগে ঘুরতে ঘুরতেই চার বছর শেষ। আলোচিত এই দুটির ক্ষেত্রে যদি এমন হয়, তাহলে অন্যগুলোর বিচার কীভাবে হবে?’

নারী নেত্রী ও নিজেরা করির সমন্বয়ক খুশী কবির বলেন, ধর্ষণ ‘দুর্বল’-এ ওপর সবলের ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার। এটাই মূলত তার বিচার না পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে।

তিনি বলেন, ‘সমাজে এখনো ধর্ষণের জন্য মেয়েদের দিকেই আঙুল তোলা হয়। ধর্ষণের শিকার মেয়ে বা ওর পরিবারের চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়, মেয়েটিই দোষী। সবমিলিয়ে এমন সামাজিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়, যেখানে মেয়েটি বিচার চাইতেই ভয় পাবে। আবার তার বিচারের জন্য যা যা আলামত ও সাক্ষ্য প্রয়োজন, সেটি দুর্বল করে দেওয়ার কাজটি শুরু থেকেই করা হয়। সর্বশেষ প্রমাণের অভাবে মামলা আর বেশি দূর এগোয় না।’

পরিবেশ বিজ্ঞানী কানিজ আকলিমা সুলতানা বলেন, ‘ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। যেকোনো মহামারি সরকার চাইলে রুখতে পারে। প্রশাসন যদি তাদের এলাকার স্কুল, কলেজ, মাদরাসার সঙ্গে সংযুক্ত থেকে খোঁজখবর নেয় তাহলে খুব অল্প সময়েই ধর্ষণ রোধ করা যাবে।’

প্রিয় সংবাদ/রিমন