রংপুরে তিন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

১০ জেলায় বন্যার অবনতি, লাখো মানুষ পানিবন্দি

বন্যাকবলিত ১০ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০১৯, ২২:২৬ আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭
প্রকাশিত: ১৩ জুলাই ২০১৯, ২২:২৬ আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৯, ২২:৩৭


রংপুরে তিন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) দেশের অন্তত দশ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সব প্রধান নদ-নদীর পানি বেড়েই চলেছে। তিস্তা, যমুনা, ব্র‏হ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, সাংগুসহ বিভিন্ন নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে জানা গেছে।

তিস্তা-যমুনা ও সুরমার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে আরও ৭৯ পয়েন্টে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। ভেসে যাচ্ছে পুকুরের মাছ। পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয়েছে ভূমিধস। ভারি বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে দুজন মারা গেছেন এবং চট্টগ্রামে তিন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে মানুষ।

এদিকে খাগড়াছড়ির মেরুং-লংগদু সড়কের বড় মেরুং ছড়ার ওপর থাকা বেইলি সেতুটি ছয় দিন ধরে পানিতে তলিয়ে আছে। এতে যানবাহন চলাচল বন্ধ আছে। এ অবস্থায় স্থানীয় লোকজন সড়কে নৌকা নিয়ে চলাচল করছেন।

উজানের পানিতে ফুঁসছে নদ-নদী 

উজান থেকে আসা পানির ঢল আর বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের নদ-নদীগুলো ফুঁসে উঠেছে। দ্রুত বাড়ছে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। একইভাবে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, সোমেশ্বরীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে এ সব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে সারা দেশে বড় ধরনের বন্যার আপাতত আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্যার পানিতে ফুঁসছে নদী। ছবি: সংগৃহীত

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র যা বলছে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর পূর্ব, দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল, আসাম, ও মেঘালয়ের ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য দেশের সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এ ছাড়া ভারতের বিহার ও নেপালে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আগামী তিন দিন বা ৭২ ঘণ্টায় প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যমুনা নদীর পানি সারিয়াকান্দি ও কাজিপুর পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে। একই সময় চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, সোমেশ্বরী, ফেনী, হালদা, মাতামুহুরি, সাঙ্গু, ধরলাসহ প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানায়, সকাল নয়টার দিকে যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ দেশের ১৫টি নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

সাতদিন সময় লাগতে পারে বন্যার পানি কমতে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ২০ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার পানি কমতে পারে।

বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গঙ্গা, যমুনার পানি এক সঙ্গে বৃদ্ধি পেলে সাধারণত বাংলাদেশে বড় ধরনের বন্যা হয়ে থাকে। আপাতত তেমন পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা নেই। কারণ যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এ সপ্তাহে কমার পর জুলাইয়ের ২৮ তারিখের পর রাজশাহীতে পদ্মার পানি বাড়তে পারে।’

২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে

বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানা যায় দেশের সব জেলায় বর্তমানে ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দশ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র শনিবার (১৩ জুলাই) এসব তথ্য জানিয়ে বলছে, পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানিও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে। 

এদিকে রংপুরে অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, ‘গত চারদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপদসীমা শুক্রবার দুপুর থেকে অতিক্রম করা শুরু হয়েছে।’

তিনি জানান, ‘শনিবার দুপুর ১২টা থেকে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে।’

এদিকে বন্যা মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বন্যাকবলিতদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে শুকনো খাবার ও নগদ টাকা। খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

রেড ক্রিসেন্টের মেডিকেল টিম প্রস্তুত: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কাজ শুরু করেছে। করণীয় ঠিক করতে এ সংস্থাটি প্রস্তুতি সভাও সম্পন্ন করেছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের জন্য কন্ট্রোল রুম খুলেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ওয়াটস রেসপন্স টিম ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের। সোইটির স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ইকরাম ইলাহী চৌধুরী জানান, দুটি মেডিকেল টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল