ররিবার সকাল পৌনে ৮টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

এরশাদের আলোচিত-সমালোচিত কিছু সিদ্ধান্ত

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদের শাসনামল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ক্ষমতাচ্যুত হবার পরও তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:১৭ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:১৭
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:১৭ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:১৭


ররিবার সকাল পৌনে ৮টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আর নেই।

১৪ জুলাই, ররিবার সকাল পৌনে ৮টায় তিনি ইন্তেকাল করেছেন। গত ২৬ জুন থেকে তিনি রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সাবেক সামরিক শাসক এরশাদের ৯ বছরের শাসন আমলে তার নানা সিদ্ধান্ত এখনও আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। নিম্নে তার কয়েকটি তুলে ধরা হলো: 

উপজেলা পদ্ধতি চালু

লেফটেন্যান্ট জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় উপজেলা পদ্ধতি চালু করেন। তার যুক্তি ছিল, সরকারি সুবিধাদি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এ ব্যবস্থা নেওয়া। এ জন্য ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮৩ সালের ৭ নভেম্বরের মধ্যে ৪৬০টি উপজেলা পরিষদ সৃষ্টি করে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করেন তিনি। ৪২টি মহকুমাকে ভেঙে ৬৪টি জেলায় পরিণত করেন তিনি।

এ ছাড়া নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলা পরিচালনার পদ্ধতি চালু করা হয়। যারা ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলেন, তাদের অনেকের কাছেই এই পদ্ধতি প্রশংসা পেয়েছিল।

ঢাকার নাম পরিবর্তন

জানা যায়, ডাক্কা বা ডাকচৌকি থেকে ‘ঢাকা’ শব্দটি এসেছে। ‘ডাক্কা’ থেকে যে ‘ঢাকা’ শব্দটি এসেছে তার একটি প্রমাণ ছিল ১৯৯০ সালের আগপর্যন্ত ‘ঢাকা’র ইংরেজি বানানে। তখন পর্যন্ত ঢাকার বানান ছিল ডি, এ, ডাবল সি, এ (Dacca), যার উচ্চারণ হুবহু ডাক্কা-ই দাঁড়ায়।

ব্রিটিশ শাসনামলে বর্তমান রাজধানী ঢাকার নাম ছিল ইংরেজি বানানে ‘Dacca’। এই ‘Dacca’ (ডাক্কা) থেকে Dhaka (ঢাকা) নামকরণ করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল এরশাদ। তার সরকারের আমলে এই পরিবর্তন আনা হয়।

হাইকোর্টের বেঞ্চ সম্প্রসারণ

বিচারব্যবস্থা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে রংপুর, যশোর, কুমিল্লা, বরিশাল, সিলেট এবং চট্টগ্রামে হাইকোর্টের ৬টি বেঞ্চ সম্প্রসারণ করেন। বিচারব্যবস্থা দ্রুত করতে ১৮৯৮ সালের ফৌজদারি দণ্ডবিধি এবং ১৯০৮ সালের দেওয়ানি কার্যবিধি সংশোধন করেন। একই উদ্দেশ্যে প্রতিটি উপজেলায় মুনসেফ কোর্ট স্থাপন করেন। উচ্চ আদালতের বিচারের জন্য যাতে ঢাকায় আসতে না হয় সেজন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনজীবীদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত সেটি বাস্তবায়ন করতে পারেনি এরশাদ সরকার।

ওষুধ নীতি প্রণয়ন

১৯৮২ সালে এরশাদ সরকার দেশে একটি ওষুধ নীতি প্রণয়ন করে। এর ফলে ওষুধের দাম যেমন কমে আসে, তেমনি স্থানীয় কোম্পানিগুলো ওষুদ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করে।

সে নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সরকারের বাইরে থেকে যিনি সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেন তিনি হলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘ওষুদ নীতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে ভিটামিন ট্যাবলেট/ক্যাপসুল এবং এন্টাসিড বিদেশি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের ভেতরে উৎপাদন করতে পারবে না। এসব ওষুধ উৎপাদন করবে শুধু দেশীয় কোম্পানি।’

এর ফলে দেশীয় কোম্পানিগুলো আর্থিকভাবে লাভবান হয় এবং বিদেশি কোম্পানিগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা অন্য ওষুধ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগ করতে পারে। তা ছাড়া সে নীতির আওতায় সরকার সব ধরনের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণ করতো। ফলে ওষুধের দাম কমে আসে বলে উল্লেখ করেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম

এরশাদ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি নিয়ে যেসব কাজ করেছিলেন সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমে রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব আরও বেড়ে যায়। বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল এবং সংগঠনকেও মদদ দিতে থাকেন এরশাদ। রাজনৈতিক সংকট সামাল দিতে সংবিধানে তিনি রাষ্ট্রধর্মের ধারণা নিয়ে আসেন।

বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ যেহেতু মুসলিম সেজন্য তাদের খুশি করতে তিনি এ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কারণ নানা দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিতর্ক নিয়ে এরশাদ তখন জর্জরিত। যদিও এরশাদের প্রবর্তিত সে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি পরবর্তীকালে কোনো সরকার বাতিল করেনি।

এ প্রসঙ্গে ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা শাহ্ মোহাম্মদ মোহেব্বুল্লাহ বলেন, ‘এরশাদের মৃত্যুর মাধ্যমে বাংলাদেশ এক মহান নেতাকে হারিয়েছে। তার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।’

ছারছীনা দরবারের সঙ্গে এরশাদের গভীর সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে পীর সাহেব বলেন, ‘এরশাদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ছারছীনা দরবারের মাহফিল থেকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ঘোষণা করে কোটি কোটি মুসলিম তৌহিদী জনতার হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন। এ ছাড়াও তিনি সংবিধানে বিসমিল্লাহ, সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার, ইবতেদায়ী মাদরাসার স্বীকৃতি প্রদান সহ ইসলাম ধর্মের জন্য অনেক অবদান রেখেছেন।’

শুক্রবার ছুটি, বিনামূল্যে মসজিদ-মন্দিরে বিদ্যুৎ

স্বাধীনতার পূর্ব থেকে দেশের সাপ্তাহিক ছুটি ছিল রবিবার। মুসলমানদের বিশেষ ইবাদতের দিন শুক্রবারে কোনো ছুটি ছিল না। যার কারণে জুমার নামাজে ভোগান্তিতে পড়তে হতো কর্মজীবীদের। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উদ্যোগেই সাপ্তাহিক ছুটি রবিবারের পরিবর্তে শুক্রবার করা হয়।

রেডিও-টেলিভিশনে নামাজের আগে আজান সম্প্রচারের কোনো ব্যবস্থা বাংলাদেশে ছিল না। এরশাদের নির্দেশেই রেডিও এবং টেলিভিশনে সর্বপ্রথম আজান সম্প্রচার চালু হয়েছিল। সে ধারাবাহিকতায় এখনও নামাজের আগে দেশের রাষ্ট্রীয় রেডিও-টেলিভিশনে আজান দেওয়া হয়।

দেশের সর্বসাধারণের ধর্মীয় আবেগের প্রতি সম্মান জানিয়ে মসজিদ-মন্দিরের পানি ও বিদ্যুৎ বিল মওফুক করা ছিল এরশাদের জনপ্রিয় পদক্ষেপ। 

কবিতা ও প্রেম

এরশাদ কবিতা লিখতে ভালোবাসতেন। কবিতার প্রতি এমন গভীর প্রেম বিষয়ে এরশাদ বলেছিলেন- ‘আমি বাংলার ছাত্র ছিলাম। রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, নজরুল পড়েছি, মাইকেল মধুসূদন, সুকান্ত পড়েছি। তাদের লেখায় প্রভাবিত হয়েছি। তবে আমি যা ভেবেছি তাই বইয়ে লিখেছি।’

একুশে বইমেলায় ছিল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পদচারণা। অমর একুশে গ্রন্থমেলা-১৮ তেও নতুন চারটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছেন তিনি। বইগুলো হলো- হে আমার দেশ, ঈদের কবিতা, বৈশাখের কবিতা ও প্রেমের কবিতা।

এ চারটি বই ছাড়াও এখন অবধি তার ২৩টির বেশি বই বইমেলায় প্রকাশ পেয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৪টি গদ্যগ্রন্থ, বাকি সবই কবিতার বই।

রওশনের আগে এরশাদের আরেকটি বিয়ের কথা আলোচনায় ছিল বহু দিন; ক্ষমতায় থাকাকালে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে তার সম্পর্কও ছিল আলোচনায়। এ নিয়ে এরশাদের ভাষ্য ছিল, তিনি নারীদের কাছে যান না, নারীরাই তার কাছে আসে। পরে কবিকন্যা বিদিশাকে এরশাদের বিয়ে করাও ছিল আলোচিত ঘটনা; তাদের এই বিয়ে টেকেনি। 

যোগাযোগ ব্যবস্থায় উন্নয়ন 

এরশাদ অসংখ্য রাস্তা, পুল, সেতু, কালভার্ট নির্মাণ করেছিলেন। তিনি প্রায় ১০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা পাকা করেছেন এবং দেড় হাজার ছোট বড় সেতু নির্মাণ করেছেন।

তিনি মহানন্দা, ঘাঘট আর নাগর নদীতে সেতু নির্মাণ করেছেন। নির্মাণ করেছেন মেঘনা সেতু, কর্ণফুলী সেতু, বুড়িগঙ্গা সেতু, রামপুরা সেতু, টঙ্গী সেতু, টেকেরহাট সেতু, শম্ভুগঞ্জ সেতু, কামার খালী সেতু, বান্দরবনে সাংগু সেতু, পঞ্চগড় সেতু, সিলেটে শাহজালাল-লামা কাজী সেতুসহ, অসংখ্য সেতু।

রাজধানীকে যানজট মুক্ত রাখার জন্য করেছেন রোকেয়া সরণী, প্রগতি সরণী, মুক্তি সরণী, বিজয় সরণী, পান্থপথ, জনপথ, নর্থ সাউথ রোড, সোনারগাঁ রোড, লিংক রোডসহ অসংখ্য রাস্তা। রাজধানীতে একমাত্র ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে সায়দাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী ৩টি বড় বাসস্ট্যান্ড তৈরি করেছেন। সাবেক এ রাষ্ট্রপতি আন্তঃনগর ট্রেন ব্যবস্থা চালু করে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবদান রেখেছন। 

পহেলা বৈশাখের দিন ছুটি

সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্ক ও পরবর্তী সময়ে সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের জন্য বাংলা বর্ষপঞ্জি শুরু করলেও পহেলা বৈশাখ এখন সব ধর্ম ও বর্ণের বাঙালির প্রাণের উৎসব। এরশাদই পহেলা বৈশাখকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেন। বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব পহেলা বৈশাখ। পৃথিবীর সব প্রান্তের বাঙালিরা দিনটিকে উৎসবমুখর করেন নানা আয়োজনে।

চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নয়ন

উপজেলা পর্যায়ে ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে তিনজন বিশেষজ্ঞসহ ৯ জন ডাক্তার নিয়োগ দিয়েছিলেন। পল্লী এলাকার ৩৯৭ উপজেলার মধ্যে ৩৩৩টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণ করেন। প্রতিটি ইউনিয়নে পরিবার কল্যাণকেন্দ্র স্থাপন করে সেখানে ওষুধ ও কর্মচারী নিশ্চিত করেছিলেন। সরকারি হাসপাতালগুলোতে পথ্যের জন্য বরাদ্দ ৮ হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার টাকা করেন। সারা দেশে ২৫ হাজার দাইকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন: বিনামূল্যে বই প্রদান

সার্বজনীন বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তনের পদক্ষেপ নেন। প্রতি ২ কিলোমিটার এলাকা বা ২ হাজার মানুষের বসবাস এলাকায় একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু করেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ শুরুই করেন তিনি। এ ছাড়া চারটি শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা একই দিনে নেওয়া শুরু করেন।

প্রতিটি উপজেলায় একটি বালক ও একটি বালিকা বিদ্যালয় এবং জেলা সদরে একটি কলেজকে আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। ২১ কলেজকে জাতীয়করণ করেন। ৯টি কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করেন।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও কলেজশিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি করেন। ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় হল এবং ১৭টি কলেজ হোস্টেল নির্মাণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের নামে কোনো হোস্টেল নির্মাণ না করলেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং জিয়াউর রহমানের নামে দুটি হোস্টেল নির্মাণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দোতলা বাসসহ অতিরিক্ত বাসের ব্যবস্থা করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করেন।

আরও কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড

চট্টগ্রাম পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করেন এরশাদ। আত্মসমর্পণকারী পার্বত্য বিপথগামী উপজাতিদের সাধারণ ক্ষমা এবং পুনর্বাসনে বিশেষ সুবিধার ব্যবস্থা করেছেন।

গণমাধ্যমের জন্য জাতীয় প্রেস কমিশন গঠন করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এ ছাড়া রেডিও ও টেলিভিশন একত্রীকরণের মাধ্যমে জাতীয় সম্প্রচার সেল গঠন করেন।

সরকার নিয়ন্ত্রিত দি বাংলাদেশ অবজারভার ও চিত্রালীকে পূর্বতন মালিকানায় ফিরিয়ে দেন। দৈনিক বাংলা, বিচিত্রা এবং বাংলাদেশ টাইমসের স্বাধীন ব্যবস্থাপনার জন্য ‘দৈনিক বাংলা ট্রাস্ট’ ও ‘বাংলাদেশ টাইমস ট্রাস্ট’ নামে দুটি ট্রাস্ট গঠন করেন।

অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম, যৌথ দর-কষাকষির এজেন্ট নির্ধারণ এবং ট্রেড ইউনিয়নের নির্বাচনের অনুমতি দেন তিনি। রেলওয়ে বোর্ড বিলুপ্ত করে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল এবং রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চল নামে দুটি সংস্থা গঠন করেন।

বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। রাজশাহী বিমানবন্দরের কাজ সমাপ্ত করেন। সিলেট ওসমানী বিমানবন্দর সম্প্রসারণ করেন। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে বোয়িং ওঠানামার জন্য রানওয়ে সম্প্রসারণ করেন। 

ঢাকায় এক ডজনের বেশি শিশু পার্ক নির্মাণ করেন। যানজট নিরসনে ট্রাফিক সিগন্যাল চালু করেন। নগর ভবন ও পুলিশ সদর দফতর নির্মাণ করেন।

মিরপুরে দ্বিতীয় জাতীয় স্টেডিয়াম এবং ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ করেন। দেশের একমাত্র ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপি প্রতিষ্ঠা করেন। বনানীতে আর্মি স্টেডিয়াম নির্মাণ করেন। বিসিএস একাডেমি ও লোক প্রশাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বন্ধ থাকা পদোন্নতি চালু করেন। গেজেটেড পদে মহিলাদের জন্য ২০ শতাংশ পদ সংরক্ষণ করেন।

সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার

ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য এরশাদ সামরিক গোয়েন্দাদের ব্যবহার করেন। এ অভিযোগ ছিল বেশ জোরালো। এ ছাড়া সামরিক বাহিনীর সহায়তা নিয়ে তিনি ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে দুটি বিতর্কিত নির্বাচন করেন।

অভিযোগ রয়েছে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের তুষ্ট রাখার জন্য সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়োগ ব্যাপকতা লাভ করে এরশাদের শাসনামলে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে উঠে তখন সেনাবাহিনী এরশাদের ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে এবং বিষয়টি তাকে জানিয়ে দেয়। এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।

তখন ঢাকা সেনানিবাসে ব্রিগেডিয়ার পদে কর্মরত ছিলেন আমিন আহমেদ চৌধুরী, যিনি পরবর্তীতে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। আমিন আহমেদ চৌধুরী ২০১৩ সালে মারা যান। ২০১০ সালে বিবিসি বাংলার সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে আমিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘উনি (সেনাপ্রধান) প্রেসিডেন্টকে বলেছিলেন আপনার উচিত হবে বিষয়টির দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান করা। অথবা বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেওয়া।’

দুর্নীতির বিস্তার

ক্ষমতায় থাকাকালীন এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এরশাদের দুর্নীতি নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। ১৯৮৬ সালে ব্রিটেনের দ্য অবজারভার পত্রিকা এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

মরিয়ম মমতাজ নামে এক নারী নিজেকে এরশাদের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করে দ্য অবজারভার পত্রিকাকে বলেন, ‘জেনারেল এরশাদ আমেরিকা এবং সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে ১৫০ মিলিয়ন ডলার পাচার করেছেন।’

এ ছাড়া বিভিন্ন সময় এসোসিয়েট প্রেস এবং ওয়াশিংটন পোস্ট সহ নানা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ শিরোনাম হয়েছিল। ক্ষমতাচ্যুত হবার পর দুর্নীতির মামলায় কারাগারেও থাকতে হয়েছে তাকে।

নির্বাচনে কখনো হারেননি এরশাদ

এরশাদের শাসনামল নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক না কেন, ক্ষমতাচ্যুত হবার পরও তিনি কখনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। এমনকি কারাগারে থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়েও পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন এরশাদ। যদিও এরশাদের নির্বাচনি এলাকাগুলো ছিল তার গ্রামের বাড়ি রংপুর এবং আশপাশের জেলায়।

এরশাদের জন্ম ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে। অবিভক্ত ভারতের কুচবিহারে শিশুকাল কাটে তার। ভারত ভাগের পর তার পরিবার চলে আসে রংপুরে; পেয়ারা ডাকনামে পরিচিত এরশাদের কলেজের পড়াশোনা চলে রংপুরেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে ১৯৫২ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এরশাদ। ১৯৭৮ সালে এরশাদ লেফটেন্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে সেনাপ্রধান হন। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেন এরশাদ। নিজেকে সশস্ত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ঘোষণা করে সামরিক শাসন জারি করেন তিনি, স্থগিত করেন সংবিধান।

প্রথমে বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদে বসিয়েছিলেন এরশাদ। কিন্তু সব ক্ষমতা ছিল এরশাদেরই হাতে, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এরশাদের অনুমোদন ছাড়া কোনো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ ছিল না আহসান উদ্দিনের। তার এক বছর পর আহসানউদ্দিন চৌধুরীকে সরিয়ে নিজেই রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসেন এরশাদ।

পরে ১৯৮৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এরপর ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর গণ আন্দোলনের মুখে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেন এরশাদ। পরে ১৯৯১ সালে কারাগারে থেকেই রংপুরের পাঁচটি আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন তিনি। রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে রংপুর থেকে কোনো নির্বাচনেই হারেননি এরশাদ।

দশম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল ছিল তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। একাদশ জাতীয় সংসদেও জাতীয় পার্টি প্রধান বিরোধী দলের আসনে। দশম জাতীয় সংসদে এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদমর্যাদায় ছিলেন। একাদশ সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে তাকে বিরোধীদলীয় নেতার পদে বসান।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল/রুহুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...