বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাড়িঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসিপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন পানিবন্দি মানুষ। ছবি: সংর্গহীত

বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা

রংপুরে অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:০১ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:০৯
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:০১ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:০৯


বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাড়িঘর থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসিপত্র সরিয়ে নিচ্ছেন পানিবন্দি মানুষ। ছবি: সংর্গহীত

(প্রিয়.কম) দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি বেড়েই চলেছে। বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা। তিস্তা, যমুনা, ব্র‏হ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা, সাংগুসহ বিভিন্ন নদীর পানি ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখো মানুষ।

গাইবান্ধায় হাজারো মানুষ পানিবন্দি

গাইবান্ধা জেলার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি অব্যাহত থাকায় জেলার চার উপজেলার ১১৩ গ্রামের ৪৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

রংপুরে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা বাড়ছে

উত্তরবঙ্গের রংপুরে অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় তিন উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের ৪০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এ পর্যন্ত পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার পানি বাড়ছে

কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। জেলার ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হু হু করে পানি বাড়তে থাকায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে জেলার ৯টি উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীর পানি সেতু পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৭৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৩৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদ সীমার ৬৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং নুন খাওয়া পয়েন্টে ৩৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়াও তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ২২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসনের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শাখার তথ্য মতে, শনিবার দুপুর পর্যন্ত সৃষ্ট বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার ২৮ হাজার পরিবারের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এ ছাড়া ৭২৫টি পরিবার নদী ভাঙনের শিকার হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি

সিরাজগঞ্জের যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি যেভাবে বাড়ছে তাতে শিগগিরই বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সকাল ৬টায় যমুনার পানি সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে ১৩ দশমিক ১৫ মিটার রেকর্ড করা হয়েছে। যা বিপদসীমার মাত্র ২০ সেন্টিমিটার কম। শনিবার সন্ধ্যা থেকে রোববার সকাল ৬টা পর্যন্ত ১৫ সেন্টিামিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে।

বন্যায় সিরাজগঞ্জের একটি এলাকার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

যমুনায় সিরাজগঞ্জের কাজিপুর থেকে ভাটির চৌহালী পর্যন্ত প্রায় ৮২ কিলোমিটার নদীপথ। এক সপ্তাহ ধরে নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় নদীর অভ্যন্তরীণ চরাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। পানি বাড়ার সঙ্গে শুরু হয়েছে ভাঙন। পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজীপুরের বাঐখোলায় ভেঙে যাওয়া বাঁধে বালির বস্তা ফেলা হচ্ছে। এদিকে কয়েক দিন ধরে সিরাজগঞ্জ শহর রক্ষা বাঁধের হার্ড পয়েন্ট এলাকায় যমুনার পানি দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পাওয়ায় তলিয়ে যাচ্ছে নিম্নাঞ্চলের শত শত একর ফসলি জমি। ডুবতে শুরু করেছে নিম্নাঞ্চলের বাড়ি-ঘর। দ্রুত পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় আতঙ্কিত যমুনা পাড়ের মানুষ। জেলার বেলকুচি উপজেলার বড়ধুল ইউনিয়নে প্রায় ৩০টি পরিবারকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

তিস্তা-যমুনা ও সুরমার পানি বিপদসীমা ছুঁইছুঁই করছে আরও ৭৯ পয়েন্টে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন লাখ লাখ মানুষ। তলিয়ে যাচ্ছে রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি। ভেসে যাচ্ছে পুকুরের মাছ। পাহাড়ি এলাকায় শুরু হয়েছে ভূমিধস। ভারি বর্ষণে সৃষ্ট পাহাড় ধসে রাঙামাটিতে দুজন মারা গেছেন এবং চট্টগ্রামে তিন ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় বানভাসি মানুষের দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রয়োজনীয় খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে মানুষ।

১৪ জুলাই, রবিবার সকালে ব্রহ্মপুত্র নদের পানির তোড়ে সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া এলাকায় বাঁধের ১০০ ফিট অংশ ধসে গেছে। ফলে ওইসব এলাকার ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

এদিকে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ড ও পোড়ারচর এলাকার প্রায় ৪০০ পরিবার আকস্মিকভাবে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদের মধ্যে বোচাগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যা কবলিত এলাকার ৩৫টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে।

লালমনির হাট এলাকার দুশ্য। ছবি: সংগৃহীত

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, চারটি উপজেলার প্রায় ৪৪ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব মানুষের জন্য ৬৩টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বন্যা দুর্গত এলাকার মানুষের জন্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৪ উপজেলায় ২৪০ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২ লাখ টাকা, ২ হাজার শুকনা খাবারের প্যাকেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় কাপাসিয়া ইউনিয়নে বন্যা দুর্গত ১০০ পরিবারের মধ্যে শুকনো খাবার ও বেলকা ইউনিয়নে ১০০ পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া, সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৩৩০টি পরিবারের মধ্যে ২০ কেজি চাল এবং ৩০ পরিবারকে শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে। শুকনো খাবারের মধ্যে মিনিকেট চাল, সোয়াবিন তেল, মসুর ডাল, লুডুলস, চিনি ও লবণ রয়েছে।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী পরিচালক মোখলেছুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, রবিবার দুপুর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি বিপদসীমার ৭৮ সেন্টিমিটার, তিস্তার ২২ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘট নদীর পানি ৫৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে করতোয়া নদীর পানি এখনও বিপদসীমার সামান্য নিচে রয়েছে।

 উজানের পানিতে ফুঁসছে নদ-নদী

উজান থেকে আসা পানির ঢল আর বৃষ্টির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দেশের নদ-নদীগুলো ফুঁসে উঠেছে। দ্রুত বাড়ছে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের যমুনা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি। একইভাবে উত্তর পূর্বাঞ্চলের সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, সোমেশ্বরীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এ কারণে এ সব অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে সারা দেশে বড় ধরনের বন্যার আপাতত আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র যা বলছে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর, উত্তর পূর্ব, দক্ষিণ পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের সিকিম, পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চল, আসাম, ও মেঘালয়ের ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এ জন্য দেশের সব নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বৃষ্টির এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে।

এ ছাড়া ভারতের বিহার ও নেপালে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে আগামী দুই দিন বা ৭২ ঘণ্টায় প্রধান নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। চট্টগ্রাম, সিলেট ও রংপুর বিভাগে সুরমা, কুশিয়ারা, কংস, সোমেশ্বরী, ফেনী, হালদা, মাতামুহুরি, সাঙ্গু, ধরলাসহ প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ কারণে নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র আরও জানায়, সকাল নয়টার দিকে যমুনা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রসহ দেশের ১৫টি নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে।

সাতদিন সময় লাগতে পারে বন্যার পানি কমতে

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া সাংবাদিকদের বলেছেন, প্রধান প্রধান নদ-নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে ২০ থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তার পানি কমতে পারে।

২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে

বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে জানা যায় দেশের সব জেলায় বর্তমানে ২৩টি পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পানি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত দশ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের রংপুর সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, গত চারদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে বিপদসীমা শুক্রবার দুপুর থেকে অতিক্রম করা শুরু হয়েছে।

তিনি জানান, শনিবার দুপুর ১২টা থেকে তিস্তা ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৪৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির ফলে রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার ৪০টি গ্রাম প্লাবিত হয়ে পড়েছে।

এদিকে বন্যা মোকাবেলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। বন্যাকবলিতদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে শুকনো খাবার ও নগদ টাকা। খোলা হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র।

রেড ক্রিসেন্টের মেডিকেল টিম প্রস্তুত: বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কাজ শুরু করেছে। করণীয় ঠিক করতে এ সংস্থাটি প্রস্তুতি সভাও সম্পন্ন করেছে। ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের জন্য কন্ট্রোল রুম খুলেছে। প্রস্তুত রাখা হয়েছে ন্যাশনাল ডিজাস্টার ওয়াটস রেসপন্স টিম ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির স্বেচ্ছাসেবকদের।

সোইটির স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক ইকরাম ইলাহী চৌধুরী জানান, দুটি মেডিকেল টিম ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

প্রিয় সংবাদ/কামরুল