প্রতীকী ছবি

কাশ্মীরের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের হালচাল

কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে ভারতের জনগণের কোনো সংযোগ নেই। তারা পরস্পর পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:২৭ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:২৭
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:২৭ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২০:২৭


প্রতীকী ছবি

(প্রিয়.কম) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় মুক্ত গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা আবশ্যক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে অবশ্যই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংবাদপত্রকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। তাই কার্যকর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা জরুরি। কিন্তু প্রায়শই এর উল্টো চিত্র দেখা যায়। অনেক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রেই সংবাদপত্র ও সাংবাদিকের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করে সরকার।

এই যেমন জম্মু ও কাশ্মীরে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকার সাংবাদিক ও মালিকদের ভয়-ভীতি দেখিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করছে। গ্রেফতার, জিজ্ঞাসাবাদ করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা করছে তারা। কাশ্মীরের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় লিখেছেন এ জি নূরানী। তিনি মুম্বাইভিত্তিক আইনজীবী ও লেখক। প্রিয়.কম পাঠকের জন্য এ জি নূরানীর লেখাটির ভাষান্তর করা হলো:

কাশ্মীর উপত্যকার দক্ষিণ-পশ্চিমে পীর পাঞ্জাল রেঞ্জে এসে ভারতীয় গণতন্ত্র ও আইন অকার্যকর হয়ে গেছে। ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মুর খোঁজ খবর সংবাদপত্রে পাওয়া যায়, কিন্তু মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর উপত্যকার কোনো খোঁজ-খবর পাওয়া যায় না। এই উপত্যকার মানুষের দুর্দশার কথা ভারতের জনগণ বা দেশটির সংবিধানের কাছে পরিচিত না। কাশ্মীরে করা নয়া দিল্লির কর্মকাণ্ডকেও ভারতের বুদ্ধিজীবীরা তেমন একটা পাত্তা দেন না। ব্যতিক্রম ঘটনা কেবল একবারই ঘটেছে।

যেমন সম্প্রতি কাশ্মীর উপত্যকার সাংবাদিক প্রশান্ত কানোজিয়াকে জামিন দেওয়ার সময় বিস্ময় প্রকাশ করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ। প্রথমবারের মতো তারা বলেছে, আমাদের কি এমন অসুবিধা তিনি (প্রশান্ত) করেছেন যার কারণে তাকে গ্রেফতার করা হলো। আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে…কিন্তু তার জন্য কি তাকে গ্রেফতার করতে হবে?

প্রকৃতপক্ষেই কাশ্মীরের সাংবাদিকদের জন্য তারা (ভারতীয় কর্তৃপক্ষ) তেমন কোনো সান্ত্বনার ব্যবস্থাও রাখেনি। গোলাম জিলানী কাদরি (৬২) হলেন কাশ্মীরের দৈনিক আফাকের সম্পাদক। উচ্চ রক্তচাপে ভোগা এই প্রবীণ সাংবাদিক ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে সম্মানের সঙ্গে সমাজে বাস করছেন। কিন্তু গত ২৪ জুন হঠাৎ করেই ১৯৯০ সালে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা এক মামলার পরিপ্রেক্ষিতে তার বাড়িতে অভিযান চালায় পুলিশ। তাকে গ্রেফতার করে। ওই মামলায় আরও আটজন সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছিল। যাদের মধ্যে দুইজন প্রবীণ সাংবাদিকও ছিলেন। এরা হলেন শ্রীনগর টাইমসের সুফি গোলাম মোহাম্মদ ও ডেইলি হামদার্দের গোলাম মোহাম্মদ আরিফ। আরিফ ইতোমধ্যে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন।

গ্রেফতারের পরদিন গোলাম জিলানী কাদরিকে জামিন দেওয়া হয়। তবে তাকে গ্রেফতার বা তার বাড়িতে অভিযানের ব্যাপারে কোনো ব্যাখ্যা বা কারণ জানানো হয়নি। গত ৩০ বছরের মধ্যে তিনি দুইবার তার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে কোনো পুলিশি অভিযোগ নেই বলে প্রশংসাপত্র দেওয়া হয়। কাশ্মীরের সম্পাদকদের সংগঠন কাশ্মীর এডিটর গিল্ড তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশের এমন কাণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, একজন মানুষ যিনি শ্রীনগরের প্রাণকেন্দ্রে দৈনিক ১৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন তার সঙ্গে এমনটা কেন করা হলো? তিনি কী এমন অপরাধ করেছেন?

প্রকৃতপক্ষে সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে কাদরির সঙ্গে এমনটা করা হয়। কিন্তু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এমন বর্বর আচরণের পরও টু শব্দটুকুও করেনি। ব্যতিক্রম ছিল কেবল কলকাতার সাহসী দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ। তারা কাশ্মীর এডিটর গিল্ডের প্রেসিডেন্ট ও কাশ্মীরের বহুল প্রচারিত ইংরেজি দৈনিক ‘গ্রেটার কাশ্মীর’-এর সম্পাদক ফায়াজ আহমেদ কালুকে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যাজেন্সি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছিল। অ্যাজেন্সিটি দৈনিকটির জনপ্রিয় ও সম্মানিত মহাব্যবস্থাপক রশিদ মাখদোমিকেও জিজ্ঞাসাবাদ করে। দুইজনকেই এক সপ্তাহব্যাপী জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

টেলিগ্রাফ তাদের করা প্রতিবেদনে লিখে, গত ফেব্রুয়ারিতে গভর্নর সত্য পাল মালিকের প্রশাসন দৈনিক ‘গ্রেটার কাশ্মীর’ ও ‘কাশ্মীর রিডার’কে সরকারি বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা স্বাধীনতাপন্থীদের কভারেজ দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনী আইন লঙ্ঘন করেছে মর্মে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

দৈনিকটি আরও লিখে, সেনাবাহিনী বাড়াবাড়ি করছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করলে সাংবাদিকদের কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় পুলিশ ভয় দেখায়। সাংবাদিকরা নাগরিক সমাজের অংশ এবং সাধারণভাবেই তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরবে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শ্রীনগর থেকে ফায়াজ আহমেদ ও রশিদকে ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন অ্যাজেন্সির দিল্লিতে নেওয়ার পুরো বিষয়টিই ভুল ছিল। অ্যাজেন্সির লোকজন তো সব জায়গাতেই আছে। শুধুমাত্র স্বাধীন সংবাদপত্রকে ভয় ও কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যেই পুরো ব্যাপারটি ঘটানো হয়েছে।

কাশ্মীরে ভারতের প্রেস কাউন্সিলের একটি লজ্জাজনক কাণ্ডের ইতিহাস আছে। তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যদের ধর্ষণ অভিযোগের বিষয়ে একটি কমিটি করেছিল। লিখিত কোনো অভিযোগ দায়ের করা হয়নি অবশ্য।

ওই কমিটি তাদের মূল্যায়নে বলেছিল, ১৯৯১ সালে কুনান পুষ্পুরা কাণ্ডে সেনাবাহিনীর কোনো সদস্য দ্বারা কেউ ধর্ষিত হয়নি। পরে অবশ্য এটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছিল। এখন জম্মু ও কাশ্মীরের সংবাদপত্র নিয়ে ওই কাউন্সিলের গঠিত উপকমিটির প্রতিবেদনের দিকে চোখ বুলানো যায়। ‘জম্মু ও কাশ্মীরের সংসবাদমাধ্যম ও তাদের অবস্থা পর্যালোচনা প্রতিবেদন’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনটি তিন পর্যালোকের সমন্বয়ে গঠিত একটি উপকমিটি তৈরি করে। তিন আলোচকের এই উপকমিটি সম্পূর্ণ ভুয়া একটি বিষয়। তাদের দেওয়া প্রতিবেদনও ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করেছে। তারপরও এই উপকমিটির প্রতিবেদনে কী উল্লেখ করা আছে তা দেখা যেতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এই মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রি (কাশ্মীরের) তরুণ সাংবাদিকদের কাছে চাকরির বড় একটি উৎস হয়ে উঠছে। কিন্তু যখন থেকে বেসরকারি ব্যবসার ক্ষেত্র কমতে থাকে এবং বেসরকারি বিজ্ঞাপন কমতে থাকে তখন থেকেই তারা পুরোপুরি সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। আর এই অবস্থারই সুযোগ নিতে শুরু করলো কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার। তারা কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই সংবাদপত্রের টুঁটি চেপে ধরার চেষ্টা করে।’ কথা হলো প্রেস কাউন্সিল কি কখনো তার জন্য নিন্দা করেছে?

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘কথা বলার সময় সাংবাদিক, মালিক ও সম্পাদকদের কাছ থেকে উপকমিটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া পেয়েছে। তারা সবাই বলছে তারা বৈষম্যের শিকার। বিশেষ করে মাঝারি, ছোট ও সাময়িকিগুলো সরকারের বিজ্ঞাপন ও বিজ্ঞাপনের হারের বিষয়ে তাদের বৈষম্যের কথা বলেছে।

এই উপকমিটি উপসংহারে কি বলেছে? তারা বলেছে, ‘জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে বাকি জাতীয় সংবাদমাধ্যমের এই পার্থক্য ঘুচিয়ে উঠতে হবে। আন্ত-আঞ্চলিক মিডিয়া এক্সচেঞ্জ জম্মু, কাশ্মীর ও লাদখার সাংবাদিকদের মধ্যে ভালো একটা বোঝাপড়া তৈরি করবে। পাশাপাশি জম্মু ও কাশ্মীরের সাংবাদিকদের দেশের অন্যান্য প্রান্তে পরিদর্শনে উৎসাহিত করবে এবং পরস্পর অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশের অন্য প্রান্ত থেকেও সাংবাদিকরা জম্মু ও কাশ্মীর পরিদর্শন করতে পারে এবং জম্মু ও কাশ্মীরকে বুঝতে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে পারে। সরকারের উচিত জম্মু ও কাশ্মীরে পেশাদার সাংবাদিকদের সংগঠন ও সমিতিকে পেশাগত উন্নয়নে কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনে উৎসাহ দেওয়া।’ কিন্তু সরকারের দমন-পীড়নের ব্যাপারে কাউন্সিলের এই উপ-কমিটি কিছু বলেনি।

এটাই বাস্তবতা যে, কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে ভারতের জনগণের কোনো সংযোগ নেই। তারা পরস্পর পরস্পর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আর এই দমন-পীড়নের কারণেই কি বিদেশি সাংবাদিকদের কাশ্মীর পরিদর্শনে বাধা দেওয়া হয়?

প্রিয় সংবাদ/কামরুল