নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ (বামে) ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। ছবি: সংগৃহীত

রিফাত হত্যা: নতুন করে আলোচনায় মিন্নি

‘ভিডিও ফুটেজে আসামিরা রিফাত শরীফকে মারপিট করার সময় মিন্নি অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে পেছন পেছন হাঁটছিল। যা একজন স্ত্রী’র পক্ষে সম্ভব নয়।’

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৫ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৫
প্রকাশিত: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৫ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০১৯, ২২:৫৫


নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ (বামে) ও আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) বরগুনার চাঞ্চল্যকর রিফাত শরীফ হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা ও বিচারের দাবিতে কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে রিফাতকে খুন করার পেছনে মিন্নির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, এজন্য তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক।

শুধু তাই নয়, মিন্নিকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানা জায়গায় চলছে কানাঘুষা। এদিকে বরগুনা-১ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর ছেলে অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথও মিন্নির শাস্তি দাবি করেছেন।

মিন্নিকে গ্রেফতারের পাশাপাশি শাস্তির দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফও। অন্যদিকে রবিবার মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে বরগুনা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এ মানববন্ধন করা হয়।

মিন্নিকে গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি জানিয়ে রিফাতের বাবার সংবাদ সম্মেলন

রিফাতের স্ত্রী মিন্নিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে ১৩ জুলাই, শনিবার দিবাগত রাত ৮টায় বরগুনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন নিহত রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ। মিন্নি এই হত্যা মামলার ১ নম্বর সাক্ষী। সম্মেলনে এই হত্যাকাণ্ডে মিন্নি জড়িত ছিল এমন সন্দেহে তিনি ১০টি যুক্তি তুলে ধরে লিখিত বক্তব্য রাখেন।

বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, ২৫ জুন সকাল ৯টায় প্রধান আসামি নয়ন বন্ডের বাড়িতে যায় রিফাতের স্ত্রী মিন্নি। রিফাতকে ছাড়া মিন্নি প্রতিদিন কলেজে গেলেও ঘটনার দিন তাকে ডেকে নিয়ে যায় মিন্নি। ঘটনার আগে রিফাত মিন্নিকে মোটরসাইকেলে কলেজ থেকে নিয়ে আসার জন্য গেলে মিন্নি মোটরসাইকেল পর্যন্ত এসে সন্ত্রাসীদের উপস্থিত না দেখে কালক্ষেপণের জন্য পুনরায় কলেজের দিকে ফিরে যায়।

তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজে আসামিরা রিফাত শরীফকে মারপিট করার সময় মিন্নি অত্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে পেছন পেছন হাঁটছিল। যা একজন স্ত্রী’র পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া রিফাত শরীফকে কোপানোর সময় মিন্নি আসামিকে জাপটে ধরেছে কিন্তু আসামিদের কেউই মিন্নির ওপর চড়াও হয়নি।

তিনি বলেন, রক্তাক্ত অবস্থায় রিফাত রিকশাযোগে হাসপাতালে যাওয়ার সময় মিন্নি তার ব্যাগ ও স্যান্ডেল গোছানোর কাজে ব্যস্ত ছিল। এবং আসামিদের একজন রাস্তা থেকে ব্যাগ তুলে মিন্নির হাতে দেয়। এমনকি রিফাত শরীফকে বরিশাল মেডিক্যালে নেওয়ার সময়ও মিন্নি তার সঙ্গে যায়নি।

সার্বিক বিষয়ের ওপর সম্প্রতি একটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ মিন্নিকে ঘটনার নেপথ্যের কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করে তাকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

মিন্নির শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন

রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবিতে মানববন্ধন করা হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ‘বরগুনার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে বরগুনা প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে উপস্থিত ছিলেন নিহত রিফাত শরীফের বাবা দুলাল শরীফ, চাচা আবদুল আজীজ শরীফ, জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মারুফ মৃধা প্রমুখ। মানববন্ধনে বক্তারা মিন্নিকে রিফাত হত্যার নেপথ্যের নায়িকা উল্লেখ করে তাকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

এমপি-পুত্র সুনাম দেবনাথ যা বললেন

মিন্নিকে গ্রেফতার ও জিজ্ঞাসাবাদের দাবিতে বরগুনার মানববন্ধন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে এমপি-পুত্র অ্যাডভোকেট সুনাম দেবনাথ বলেন, রিফাতের পরিবার সংবাদ সম্মেলনে মিন্নির বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো তুলেছে, তার বড় ধরনের তদন্ত হওয়া দরকার। সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে ছবি এবং ভিডিও দেখা যাচ্ছে, তাতে আমাদের সকলের মনে হয় এর তদন্ত হওয়া দরকার। তারপর কে আইনের আওতায় আসবে কি আসবে না তদন্তেই তা বেরিয়ে আসবে।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করে সামনে আসলেন মিন্নি

আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি রিফাত শরীফ নিহতের ঘটনায় রবিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। গতকাল শনিবার রাতে তার শ্বশুরের সংবাদ সম্মেলন এবং আজ সকালে তার বিরুদ্ধে মানববন্ধনের পর তিনি এই পদক্ষেপ নেন। তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগসহ সার্বিক বিষয় নিয়ে মুখ খোলেন তিনি।

দুপুর ১২টার দিকে মিন্নি মাইঠা গ্রামে তার বাবার বাড়িতে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন। এতে তিনি অভিযোগ করেন, যারা বরগুনায় ‘বন্ড ০০৭’ নামে সন্ত্রাসী গ্রুপ সৃষ্টি করিয়েছিলেন, তারা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী। নেপথ্যের এই ক্ষমতাবানেরা বিচারের আওতা থেকে দূরে থাকা ও এই হত্যা মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য শ্বশুরকে চাপ দিয়ে এই সংবাদ সম্মেলন করিয়েছেন।

মিন্নি অভিযোগ করেন, ‘নয়ন বন্ড একজন মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ী। তার নামে অনেক মামলা ছিল। সে আমাকে দীর্ঘদিন ধরে উত্যক্ত করত। আমার ছোট ভাই ও বাবাকে হত্যার হুমকি দিত। এ জন্য তার বিরুদ্ধে কখনো মুখ খোলার সাহস পাইনি। আমার শ্বশুর অসুস্থ। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তিনি আরও অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। আমার স্বামীকে হত্যার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে নিয়ে নেতিবাচক, কুরুচিপূর্ণ নানা পোস্ট এবং এডিট করা ছবি আপলোড করে একটি মহল আমার বিরুদ্ধে শুরু থেকেই ষড়যন্ত্র শুরু করে। এর মূল উদ্দেশ্য এই ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা। কারণ, ০০৭ সন্ত্রাসী গ্রুপটি যারা সৃষ্টি করেছিলেন, তারা খুবই ক্ষমতাবান ও বিত্তশালী।’

রিফাত শরীফের স্ত্রী মিন্নি ঘটনার দিন নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ঘটনার দিন আমার স্বামীকে কোপানোর সময় আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি তাকে বাঁচাতে। এমনকি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। এরপর রক্তাক্ত অবস্থায় আমিই রিকশায় করে রিফাত শরীফকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাই। যখন চিকিৎসকেরা তাকে বরিশালে পাঠাতে বলেন, তা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। জ্ঞান ফিরলে আমি জানতে পারি তাকে (রিফাত শরীফ) বরিশালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

ফেসবুকে আপনার নামে গত ২৭ জুন ১১টি আইডি দেখা যায়, গতকাল শনিবার রাতেও চারটি আইডির সন্ধান পাওয়া যায়—এগুলো কি আপনার? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মিন্নি বলেন, ‘এগুলো সবই ষড়যন্ত্র। কোনো সুস্থ ব্যক্তি এটা করে? আমাকে নেতিবাচকভাবে প্রচারের জন্যই এসব করা হয়েছে। এসব কারা করেছে, তা তদন্ত করলেই বের হয়ে আসবে।’

রিফাতের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নদের বাড়িতে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে মিন্নি বলেন, ‘এটা মিথ্যা ও বানোয়াট কথা। আর নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার যে আগে বিয়ে হওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে, সেটাও মিথ্যা। কারণ, নয়ন বন্ড আমাকে জোর করে ধরে একটি বাড়িতে নিয়ে একটা কাগজে সই রেখেছিল। এরপর কী করেছে সেটা জানি না। পরে শুনি সেটা বিয়ের কাবিননামা।’

মিন্নি বলেন, ‘বিয়ের দুই মাস পর স্বামীকে হারালে একজন নারীর মানসিক অবস্থা কেমন থাকতে পারে! তার ওপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত কুৎসা এবং বাজে ছবি পোস্ট দেওয়ার কথা শুনে আমি আরও বিপর্যস্ত। রিফাতকে হত্যার পর থেকেই আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। আমাদের বাড়িতে পুলিশ প্রহরার ব্যবস্থা করায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ সুপারকে ধন্যবাদ। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আকুল আবেদন জানাতে চাই, আমি একজন স্বামীহারা অসহায় নারী। এই সুযোগে আমার বিরুদ্ধে যারা মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্র করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হোক।’

গত ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বরগুনা সরকারি কলেজের ফটকের সামনের রাস্তায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বেলা ৩টার দিকে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিফাতের মৃত্যু হয়। পরের দিন এই ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম শরীফ বাদী হয়ে বরগুনা থানায় ১২ জনের নামে এবং চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা করেন।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল

পাঠকের মন্তব্য(০)

মন্তব্য করতে করুন


আরো পড়ুন

loading ...