দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পয়েন্টের মধ্যে ৭৩টি পয়েন্টে পানি বাড়ছে। ছবি সংগৃহীত

বাড়ছে বন্যার পানি, বন্ধ হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

তুমুল বৃষ্টির কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ বেশির ভাগ বড় শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

মোক্তাদির হোসেন প্রান্তিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:০৩ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:০৩
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:০৩ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, ১৪:০৩


দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পয়েন্টের মধ্যে ৭৩টি পয়েন্টে পানি বাড়ছে। ছবি সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। আকস্মিক বন্যায় লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছেন। ত্রাণ সংকটের কারণে অনাহারে-অর্ধাহারে দিন পার করছেন এসব জেলার বন্যাকবলিত মানুষ। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। স্কুল-কলেজে পানি প্রবেশ করায় বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম। রাস্তায় পানি ওঠায় বেশকয়েকটি জেলা শহরের সঙ্গে উপজেলাগুলোর যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন জেলায় নদ-নদীর পানি বাড়ছে। প্রবাহিত হচ্ছে বিপদসীমার ওপর দিয়ে। এখন আবার শুরু হয়েছে নদীভাঙন। তাই কেউ কেউ অন্যত্র ঘরবাড়ি ভেঙে নিয়ে যাচ্ছে।

সরকারের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে দেশের ২০ জেলায় বন্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। দেশের চারটি নদী অববাহিকায় একযোগে পানি বাড়তে পারে। এতে আগামী এক সপ্তাহ টানা বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। এরপর পরিস্থিতির উন্নতির সম্ভাবনা আছে।

গতকাল ১৪ জুলাই, রবিবার দেশের ১৬টি জেলায় বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ৯৩টি পয়েন্টের মধ্যে ৭৩টি পয়েন্টে পানি বাড়ছে, এর মধ্যে ২৫টি পয়েন্টে পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। এসব নদীর পানি প্রতিদিন তিন থেকে চার ইঞ্চি বাড়ছে।

দেশের বেশির ভাগ এলাকাজুড়ে বৃষ্টির কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুরসহ বেশির ভাগ বড় শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সড়ক ও মহাসড়ক পানিতে ডুবে গিয়ে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে।

নেত্রকোনায় ২২৯ স্কুল বন্ধ ঘোষণা

নেত্রকোনায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত অবস্থায় রয়েছে। জেলার উব্ধাখালি, সোমেশ্বরী ও কংশ নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। দুর্গাপুর, কলমাকান্দা  ও বারহাট্টা উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নের তিন শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দী অবস্থায় রয়েছেন। দুই শতাধিক স্কুলে পানি উঠায় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলার বন্যার্তদের সব ধরনের সেবা দিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা কর্মচারি ও উপজেলার চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্য সহকারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।

রবিবার দুপুরে জেলার বন্যাকবলিত কলমাকান্দা, দুর্গাপুর ও বারহাট্টা উপজেলার ২২৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা।

জেলার কলমাকান্দা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, উপজেলার মোট ১৭২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে বন্যায় প্লাবিত হয়ে যাওয়ায় ১৪৭টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। পানি না কমা পর্যন্ত এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া ৯টি বিদ্যালয় বন্যাকবলিত মানুষের জন্য আশ্রয় কেন্দ্র হিসাবে খোলা রয়েছে এবং অন্য ২৫টি বিদ্যালয় স্বাভাবিক রয়েছে।

দুর্গাপুর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আবু তাহের ভূইয়া জানান, উপজেলার মোট ১২৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৭টি বিদ্যালয় বন্যার পানিতে প্লাবিত হওয়ায় বিদ্যালয়গুলো বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। অন্য বিদ্যালয়গুলো স্বাভাবিক থাকলেও বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে আরও বিদ্যালয় প্লাবিত হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

বারহাট্টা উপজেলার ১০৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে বন্যার কারণে ৭৫টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানান উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহী দিলশাদ এলীন। তিনি বলেন, বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় এসব বিদ্যালয়ে পাঠদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্য বিদ্যালয়গুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পানি নেমে গেলে বন্ধ বিদ্যালয়গুলোতে আবারো পাঠদান শুরু হবে।

এ ব্যাপারে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ বলেন, বিদ্যালয়ে ও বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে বন্যা পানি প্রবেশ করার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই বিদ্যালয়গুলোর পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সুনামগঞ্জে বন্যায় ১৬৮ স্কুল বন্ধ

সুনামগঞ্জে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় জেলার ১৬৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠাদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান এমন তথ্য জানিয়েছেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্যমতে, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে পানি প্রবেশ করায় পাঠদান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার ২২টি, দোয়ারাবাজার উপজেলার ১৮টি, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ২৭টি, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ৩টি, ছাতক উপজেলার ১০টি, জামালগঞ্জ উপজেলার ৩০টি, তাহিরপুর উপজেলার ১৯টি ও ধর্মপাশা উপজেলার ৫৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রয়েছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. জিল্লুর রহমান জানান, অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। এতে জেলার ১৬৮টি বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করায় আমরা সেগুলো বন্ধ রেখেছি। তা ছাড়া আমরা যেসব বিদ্যালয় উঁচু বা আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে সেগুলোর প্রধান শিক্ষক ও দফতরিকে সার্বক্ষণিক বিদ্যালয়ে অবস্থান করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যদি একজন মানুষও আশ্রয়ের জন্য আসেন তাহলে তাকে বিদ্যালয়ে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে।

লালমনিরহাটে ৫৮ স্কুল-মাদরাসায় পাঠদান বন্ধ

লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। বন্যার পানি বিদ্যালয়ে ঢোকার কারণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার ৪৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

লালমনিরহাট প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলায় ১৬টি, আদিতমারী উপজেলায় ৮টি, কালীগঞ্জ উপজেলায় ২টি ও হাতিবান্ধা উপজেলায় ২০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে বন্যার পানি ঢুকে পড়ায় সাময়িকভাবে শ্রেণি পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।  

বন্যায় ফেনীর ১০ স্কুলে পাঠদান বন্ধ

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে পানিবন্দী হয়ে ফেনীর পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার ১০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। লাগাতার বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানির চাপে মুহুরী-কহুয়া নদীর অন্তত ১১ স্থানের বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যায়। প্রবল বেগে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। এতে সড়ক, ঘরবাড়ি, মৎস্য খামার, আমনের বীজতলা, ব্যবসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। বিভিন্ন গ্রামে অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ফলে বন্ধ রাখা হয়েছে দুই উপজেলার ১০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান কার্যক্রম।

পরশুরাম উপজেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের মাঠে ও ফ্লোরে পানি থাকায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে।

ফুলগাজী উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফাতেমা ফেরদৌসি জানান, ফুলগাজী সদর ইউনিয়নের ৪টি বিদ্যালয় বন্যায় পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পাঠদান কার্যক্রম শুরু হবে।

বন্ধ হলো গাইবান্ধার ১৪৫টি স্কুল

বন্যার পানির কারণে গাইবান্ধার চরাঞ্চল ও নদীবেষ্টিত ১৪৫টি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যায় গাইবান্ধা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হোসেন আলী বলেন, বন্যার কারণে বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে পানি উঠেছে। বিদ্যালয়গুলো পানিবন্দি হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ক্লাস করানোর পরিবেশ নেই। বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গিয়ে বাড়িঘরে পানি প্রবেশ করায় কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে আসা নিরাপদ নয়। যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এসব কারণে বন্যাকবলিত ১৪৫টি বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

প্রিয় সংবাদ/রিমন