যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্নে ইরানিরা ঐক্যবদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্থিরতা: কী ভাবছেন ইরানিরা?

কোনো ভুল করা যাবে না। কট্টরপন্থীরাই দেশটি চালায়। কিন্তু ইরান যখন আমেরিকার মুখোমুখি হবে, বেশিরভাগ ইরানিই—তা রক্ষণশীল হোক বা উদারই হোক, প্রথমেই দেশের পক্ষে যাবে।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০
প্রকাশিত: ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০


যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্নে ইরানিরা ঐক্যবদ্ধ। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দিন দিন অবনতি হচ্ছে। কিন্তু ইরানের নাগরিকদের কথা বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। কারণ দেশটিতে বিদেশি সাংবাদিকদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি ইরানিদের মনোভাব জানার চেষ্টা করেছে। এই সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন পরমাণু চুক্তি থেকে নিজেদেরকে সরিয়ে নেন তখন ইরানিরা এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা তো আছেই।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এই অবনতির বিষয়ে দেশটির সাধারণ নাগরিকরা কী ভাবছেন? বিষয়টিকে তারা কীভাবে দেখছেন? তা জানতে প্রযোজক কারা সুইফট ও ক্যামেরাপারসন নিক মিল্লিয়ার্ডকে নিয়ে বিবিসি প্রতিনিধি মার্টিন প্যাটেইন্স তেহরান ও পবিত্র শহর কুমে যান। তারা স্থানীয়দের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেন। প্রিয়.কমের পাঠকদের জন্য বিবিসির প্রতিবেদনটি ভাষান্তর করা হলো—

যদিও ইরানে কারও বক্তব্য বা ভাষ্য নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কড়াকড়ি নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। বিদেশি কোনো সাংবাদিক দেশটিতে ঢুকতে গেলে সরকারি প্রতিনিধিদল তাদের সঙ্গে থাকে।

গ্রীষ্মকালের প্রচণ্ড গরমে অতীষ্ট সময়েও ইরানের রাজধানীর কাছাকাছি এক উপশহরে অবস্থিত আলবোর্জ পর্বতে তুষার দেখা যাচ্ছিল। সাপ্তাহিক ছুটিতে ছোট থেকে বড় সবাই ব্যাক-প্যাক ঘুচিয়ে শহরকে পেছনে ফেলে ওই পর্বতারোহণে বের হন। পবর্তের উপরে তারা নির্মল বায়ু পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা থেকে যেন তাদের কোনোভাবেই মুক্তি নেই। এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নে এক ব্যক্তি আগ্রহী হয়ে বলেন, কে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে না?

তিনি কী বলতে চেয়েছেন, তা বুঝাতে যেন তিনি পবর্ত আরোহণের ক্লিপ ও বেল্ট দেখালেন। বললেন, এক বছর আগে যে দাম দিয়ে এসব কিনতেন এখন চারগুণ বেশি দামে কিনতে হয়।

হাদি (ডানে) মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র প্রশ্নে ইরানিরা এক হয়ে গেছে। ছবি: সংগৃহীত

গত বছর বিশ্বের ছয় শক্তিধর রাষ্ট্রের সঙ্গে করা ইরানের ‘পরমাণ চুক্তি ২০১৫’ থেকে নিজেদের একতরফাভাবে সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, চুক্তিটি খুব সাদা-মাটা ও উদার ছিল, যা ইরানকে ব্যালিস্টিক মিসাইল তৈরির সুযোগ দিচ্ছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মাতবরির সুযোগ তৈরি করছিল।

ট্রাম্প ইরানকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনতে ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ করতে চেয়েছেন। অনেক ইরানি মনে করেন, এর মাধ্যমে যুদ্ধ বাধতে পারে।

এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছে ইরান। দেশটি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোও চুক্তিটি বাদ দিবে। যদিও যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এখনো চুক্তিটিকে সমর্থন করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত ইরানি কট্টরপন্থীদের একাট্টা করেছে এবং তারা বলছেন, শুরুতেই ওয়াশিংটনকে এত বিশ্বাস করা উচিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের (যুক্তরাজ্যও আছে এই তালিকায়) প্রতি ইরানের এই অবিশ্বাস শুরু হয় ১৯৫৩ সালে, যখন দেশ দুটি ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করে।

হাদি নামে এক ইরানি বলেন, ‘আমাদের ইরানিদের দীর্ঘ এক ইতিহাস আছে। আমরা সবসময় প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

হাদি একটি কফির দোকান চালান। পর্বতারোহীরা পর্বতে ওঠার সময় তার দোকান থেকে কফি পান করে সতেজ হয়ে নেয়। তার দোকানটি অর্ধনির্মিত, যার ছাদ ত্রিপল দিয়ে তৈরি। তিনি আমাদেরকে তার দোকানের ভেতরে যেতে আমন্ত্রণ জানান এবং জামু, খেজুর ও তরমুজ খেতে দেন।

হাদি বলেন, ‘আমেরিকানরা মনে করেছে তাদের নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানে দাঙ্গা শুরু হবে এবং আপোষ সমঝোতা ছাড়া ইরানের আর কোনো রাস্তা থাকবে না। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার ফলে হিতে বিপরীত হয়েছে। কারণ এর ফলে ইরানের উদারপন্থী ও রক্ষণশীলদের মধ্যে ঐক্য তৈরি হয়েছে। আমাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য আছে। অবস্থা যত কঠিন হবে এখানকার মানুষ আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হবে।’

পবর্ত থেকে নেমে কুয়াশা মারিয়ে আমরা তেহরানের দক্ষিণের উপশহরে গেলাম। সেখানে গিয়ে মনে হলো, যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার প্রভাব এখানে যেন সবচেয়ে বেশি।

খুব সরু রাস্তা এবং একটির ওপর আরেকটি ঘর দেখা গেল এই শহরে। এই শহরে মূলত ইরানের শ্রমিক শ্রেণির মানুষজন বাস করেন। তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার আগেই প্রান্তিক মানুষ হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তারপরও গত বছরগুলোতে তাদের অবস্থা পরিবর্তনের দিকে যাচ্ছিল।

কিন্তু এখন? একদিকে খাদ্যের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে কাজ খুঁজে পেতে তাদের নাভিশ্বাস উঠছে।

জোহরেহ ফারজানেহ নামের এক নারী বলেন, ‘আমি আসলে বুঝি না আমাদেরকে কষ্ট দিয়ে ট্রাম্প কি পান।’

তিন সন্তানের জননী ফারজানেহ একটি পোশাক কারখানায় দৈনিক ২ ডলার মজুরিতে কাজ করেন। তিনি জানান, এই নিষেধাজ্ঞা তাদেরকে দারিদ্রতার কষাঘাতে জর্জরিত করেছে এবং তিনি তার পরিবারের জন্য খাবার কেনার অর্থ আয় করতে পারছেন না। এ ছাড়া অ্যাজমার কারণে তাকে ইনহেলার ব্যবহার করতে হয়, এখন সেটির ব্যবস্থাও করতে পারছেন না তিনি।

ফারজানেহ জানান, তিনি তার ১১ বছর বয়সী ছেলেকে একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছেন খাবারের জন্য। তার ভাবনা, ছেলেটি অন্তত একদিনের খাবার নিয়ে আসবে। কারও কাছে সাহায্যের কথা বলতে তিনি অপমান বোধ করেন এবং তিনি খুব কষ্ট পান।

তিনি বলেন, ‘আমি সৃ্ষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাই যে খাওয়ার জন্য আমাদের এখনো এক পিস রুটি ও চিজ আছে। অন্তত ইরানে শান্তি আছে, এখানে কোনো যুদ্ধ নেই।’

১০ দিনের সফরে আমরা অনেক ইরানির সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সঙ্গে কথা বলে আমার এই ধারণা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হতে পারে তারা কেউ এটা মনে করেন না। এমনকি ওমান উপসাগরে তেলের ট্যাঙ্কারে ইরান হামলা করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগের পর সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। তারপরও তারা তেমনটি মনে করেন না। কিংবা ইরানের গুলিতে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার পরও তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ হবে, তা মনে করেন না।

ইরানের সাবেক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসেইন শেখুলিসলাম বলেন, দেশের কোনো স্বার্থ নেই এই যুদ্ধে।

তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ বাধবে না। যদি কেউ ভুল করে তবে সেটি সম্ভব। কিন্তু আমরা যুদ্ধ চাই না এবং আমি এটা বিশ্বাস করি যে, ট্রাম্প বুঝতে পারছেন তার পক্ষে যুদ্ধ করা ঠিক হবে না। কারণ আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানে আমেরিকার সৈন্য নিহত হওয়া। ওয়াশিংটন ডিসিতে নিহতের শেষকৃত্য করতে প্রস্তুত নন ট্রাম্প।’

পর্বতের আলাপে ফিরি। আমরা উপরে উঠতে থাকলাম এবং একটি পানির প্রবাহ পার করলাম। তখন নাসিম নামের এক নারীর সঙ্গে আমার দেখা হলো। নাসিম কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে পর্বতে উঠছিলেন।

আমি তাকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সম্পর্কে কী ভাবেন, তা জিজ্ঞেস করলাম। তিনি হাসলেন। তিনি দুই হাত উপরে তুলে এমন একটা ভাব করলেন, যেন তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। কিন্তু তিনি যা বললেন, তাতে অবাক হলাম।

নাসিম বলেন, ‘যুদ্ধ হলেই বোধহয় আমাদের জন্য ভালো হয়।’

আমি তার কাছে জানতে চাইলাম, কেন যুদ্ধ চান? উত্তরে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ মনে হয় আমাদের শাসন ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে। বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন করে ভালোর দিকে নিয়ে যাবে। কিন্তু এই যুদ্ধ যদি গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যায় তবে তার দরকার নেই। আদতে সেটা ভালো কিছু না।’

 কুয়াশার হাতছানি পর্বতে। ছবি: সংগৃহীত

২০০৯ সালে যখন বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে দ্বিতীয়বারের মতো মাহমুদ আহমেদিনেজাদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন নাসিমের মতো ইরানিরাই রাস্তা দখল করে বিক্ষোভ করেছিলেন।

মীর হোসেইন মৌসাভি নামের এক পরাজিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থী গ্রিন রং ব্যবহারের পর ওই বিক্ষোভকে ‘গ্রিন রেভ্যুলেশন’ আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। পরে অবশ্য মৌসাভিকে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল।

তখন কর্তৃপক্ষ গণবিক্ষোভকে কঠোর হাতে দমন করেছিল এবং বলেছিল, ইরানে বিরোধীদের জোরদার কোনো আন্দোলন নেই। কিন্তু ইরানে রাজনৈতিক মতের ভিন্নতা আছে। এখানে ধর্মীয় রক্ষণশীল কট্টরপন্থী যেমন আছে, উদারপন্থীও আছে। তবে বেশিরভাগ ইরানিই বোধহয় মাথা নিচু করে রাখতে ভালোবাসেন। আর এই বিভাজনের সুযোগই কাজে লাগাতে পারবে বলে ট্রাম্প মনে করেন।

কোনো ভুল করা যাবে না। কট্টরপন্থীরাই দেশটি চালায়। কিন্তু ইরান যখন আমেরিকার মুখোমুখি হবে, বেশিরভাগ ইরানিই—তা রক্ষণশীল হোক বা উদারই হোক, প্রথমেই দেশের পক্ষে যাবে।

প্রিয় সংবাদ/রিমন