বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, উভয়েই নানা সময় এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করেছে। ছবি: সংগৃহীত

এরশাদকে রংপুরে দাফন: জাপায় কী প্রভাব পড়বে?

বিদিশা রংপুরবাসীকে বিজয়ী আখ্যায়িত করে আরেক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘রংপুরবাসীর বিজয়। হেরে গেলেন ষড়যন্ত্রকারীরা।’

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২২:১৫ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২২:১৫
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২২:১৫ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২২:১৫


বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি, উভয়েই নানা সময় এরশাদকে নিয়ে টানাটানি করেছে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) নানা জল্পনা-কল্পনা আর নেতাকর্মীদের ক্ষোভ-বিক্ষোভের পর জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদকে ১৬ জুলাই, মঙ্গলবার বিকেল পৌনে ৬টায় রংপুরে দাফন করা হয়। রংপুরে এরশাদের দাফনের প্রশ্নে দলের নেতাকর্মীদের সামাল দিতে জাপার পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নেতাকর্মীদের শান্ত করার চেষ্টা করা হয়।

এরশাদের দাফন রংপুরে হবে এমন বিষয়ে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জিএম কাদের (এরশাদের ছোট ভাই) এবং দলের কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ (এরশাদের স্ত্রী) আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়ার পর রংপুরের পল্লি নিবাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। পরে এরশাদকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রংপুরের পল্লি নিবাসের লিচুতলায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

রংপুরে নিজের গড়া পল্লি নিবাসে এরশাদের দাফনের ফলে জাপাতে কী কোনো বিশেষ প্রভাব পড়বে? কেনই বা  জাপার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গিয়ে দলের নেতাকর্মীরা এরশাদকে যেকোনো মূল্যে রংপুরে চিরদিনের জন্য রেখে দিতে চাইলেন?  এর মধ্যে দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে জাপার অবস্থানে কি কোনো প্রভাব পড়বে?

মাইডোলিসপ্লাস্টিক সিনড্রোমে আক্রান্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১০ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত রবিবার (১৪ জুলাই) সকালে মারা যান। এরপর জাপার কেন্দ্রীয় নেতারা এরশাদের কবর ঢাকার সামরিক কবরস্থানে দেওয়ার কথা জানান। তবে ওই দিন থেকেই রংপুরের জাপার নেতা-কর্মীরা এরশাদকে তার নিজ শহর রংপুরে সমাহিত করার দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন।

এরপর মঙ্গলবার রংপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র মোস্তাফিজার রহমান এরশাদের দাফন রংপুরের করার বিষয়ে দাবি করেন। এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে এরশাদের মরদেহ শহরে তার বাড়ি পল্লি নিবাসে নেওয়া হয়।

এরশাদের মরদেহ পল্লি নিবাসে নেওয়ার পর সেখান জি এম কাদের ঘোষণা দেন এরশাদকে রংপুরেই দাফন করা হবে। তিনি বলেন, ‘এরশাদকে রংপুরে দাফন করার ব্যাপারে ঢাকায় যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও কথা হয়েছে। তারা সম্মতি দিয়েছেন বলে আমি এ সিদ্ধান্তের কথা জানালাম।’

যদিও এর কয়েক ঘণ্টা আগেও ঢাকার বনানীতে সেনা কবরস্থানেই এরশাদের দাফনের বিষয়ে অনঢ় ছিলেন জি এম কাদেরসহ দলের সিনিয়র বেশ কয়েকজন নেতা।

জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘রংপুরের মানুষের ভালোবাসা ও আকুতির কাছে আমরা পরাজিত হয়েছি। আমরা চেয়েছিলাম জাতীয় এ নেতার সমাধি ঢাকায় হবে। যাতে দেশ ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিরা তার সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন। আমরা এখানেও (রংপুর) তার কবরের পাশে মিউজিয়ামসহ যাবতীয় স্থাপনা করবো।’

একই সময় জাপার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের আবেগ, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর কৃতজ্ঞতাবোধকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এরশাদকে রংপুরেই দাফন করতে অনুমতি দিয়েছেন রওশন এরশাদ। এরশাদের কবরের পাশে তার জন্য কবরের জায়গা রাখতেও অনুরোধ জানিয়েছেন রওশন।

রওশন এরশাদ বলেন, ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের প্রতি রংপুরের গণমানুষের ভালোবাসা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। তাদের আবেগ ও অনুরাগেই রংপুরে এরশাদকে সমাহিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

দাফনের সময় এরশাদের ছোট ভাই জি এম কাদেরসহ পরিবারের অন্য সদস্য, আত্মীয়স্বজন উপস্থিত ছিলেন। সামরিক বাহিনীর সদস্য এরশাদের দাফন কার্য পরিচালনা করে।

এরশাদকে রংপুরে দাফনের কয়েক ঘণ্টা আগে তার ভাই জি এম কাদের জানিয়েছিলেন, উনার (এরশাদ) শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী বনানীতে সেনাবাহিনীর কবরস্থানেই তাকে সমাহিত করা হবে। এই কবরস্থান ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় হলেও যেকোনো সময় যে কেউ সেখানে যেতে পারে। তবে এরশাদের নির্বাচনি এলাকা রংপুরের নেতা-কর্মীরা তাকে রংপুরে দাফন করার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এরশাদের রংপুরের বাড়ি ‘পল্লি নিবাসের’ লিচুবাগানে তারা কবরও খুঁড়ে রাখেন।

এ সময় রংপুর সিটি মেয়র ও জাপার সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা ঘোষণা দেন, তারা ‘যেকোনো মূল্যে’ এরশাদের মরদেহ রংপুরে রেখে দেবেন। রংপুর শহরের কালেক্টরেট ঈদগাহ মাঠে মঙ্গলবার দুপুর ২টা ২৫মিনিটে এরশাদের শেষ জানাজা হয়। 

এরশাদকে রংপুরে দাফনে সন্তোষ জানিয়ে নীলফামারী জেলা জাপার সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শহীদ একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘এটাই ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে। রংপুরে কবর হওয়ায় স্যারের আত্মা শান্তি পাবে।’

রংপুর মহানগর জাপার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক লোকমান হোসেন বলেন, ‘স্যারের মরদেহ (এরশাদ) রংপুরে তার ইচ্ছা অনুযায়ী দাফন করা হয়েছে। আমরা স্যারের ইচ্ছা পূরণ করতে বদ্ধপরিকর ছিলাম। এখানে দাফন হওয়ায় সাধারণ মানুষসহ দলীয় লোকজন স্বাচ্ছন্দ্যে স্যারের কবর জিয়ারত করতে পারবেন। এটা আমাদের পরম পাওয়া।’

গাজীপুর মহানগর জাপার সহ সভাপতি তসলিম উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘রংপুরে স্যারকে কবর দেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক হয়েছে। তিনি সারা বাংলাদেশের নেতা হলেও আসলে তো তিনি রংপুরের সন্তান। আমরা চেয়েছিলাম উন্মুক্ত স্থানে কবর হোক। রংপুর অনেক দূরে। তবুও তো আমরা যখন খুশি যেতে পারব।’

জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ফারুক শেঠ বলেন, ‘আমাদের প্রিয় নেতাকে রংপুরে দাফনের সিদ্ধান্ত যথাযথ হয়েছে।’

এদিকে মঙ্গলবার ফেসবুকে এক স্ট্যাটাসে এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা সিদ্দিক লিখেন, ‘দোয়া করি রংপুরের পল্লি নিবাস যেন তার (এরশাদ) শেষ ঠিকানা হয়।’

পরে বিকেলে যখন রংপুরে এরশাদকে দাফনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় তখন বিদিশা রংপুরবাসীকে বিজয়ী আখ্যায়িত করে আরেক স্ট্যাটাসে লিখেন, ‘রংপুরবাসীর বিজয়। হেরে গেলেন ষড়যন্ত্রকারীরা।’

এরশাদবিহীন জাপার ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনা

এরশাদের মৃত্যুর পর তার প্রতিষ্ঠিত জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব নিয়ে ফের আলোচনা শুরু হয়েছে। রংপুরে এরশাদের দাফন সম্পন্নের পর দলের নেতারা জানান, প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জাপার চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পার্টির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও তার ছোট ভাই জি এম কাদের দল পরিচালনা করবেন। আর জাতীয় সংসদের দায়িত্বে থাকবেন তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদ। এ মতের সঙ্গে জাপার সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা একমত হয়েছেন। এতে দল আরও বেশি সংগঠিত হবে।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, এরশাদের মৃত্যের মধ্যে দিয়ে জাপা ধীরে ধীরে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলবে। অনেকটা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানির দল ন্যাপের মতো কিংবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মুসলিম লীগের মতো হবে। কিন্তু জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব এ কথা মানতে নারাজ।

জাপা নেতাদের দাবি, এরশাদের অবর্তমানে জাপা আরও বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠবে। এরশাদ যাকে দায়িত্ব দিয়ে গেছেন তার নেতৃত্বেই চলবে দল। এরশাদ ৩২ বছরে দলকে একটি অবস্থানে রেখে গেছেন। তার অনুপস্থিতিতে দল ভাঙা নয়, বরং আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হবে।

পার্টির সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদ সোমবার জাতীয় সংসদে জানাজা শেষে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, এরশাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পার্টি পরিচালনা হবে। এরশাদের স্বপ্ন পূরণে ঐক্যবদ্ধভাবে তারা জাতীয় পার্টিকে সামনে এগিয়ে নেবেন।

এই ব্যাপারে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, ‘জেনারেল এরশাদের অবর্তমানে তার দল কতটা শক্তি নিয়ে চলতে পারবে, সেটা সময় বলে দেবে। তবে সেই শক্তিটা কতটুকু, সেটা আমাদের কাছে বিবেচ্য বিষয় নয়। আওয়ামী লীগ সবসময়ই মুক্তিযুদ্ধের দলগুলোকে এক প্লাটফরমে নিয়ে চলার পক্ষে এবং সেই ধারা অব্যাহত থাকবে।’

পার্টির মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা জানান, যারা দলে বিশৃঙ্খলা করতে চান, তারা সুবিধা করতে পারবেন না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জি এম কাদের দলকে একতাবদ্ধ রাখবেন।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘গত কয়েকটি নির্বাচন থেকেই জাতীয় পার্টির প্রভাব কমে এসেছে। জাতীয় পার্টির অবস্থান রংপুরেই অনেক দুর্বল হয়ে গেছে। ফলে এরশাদের অবর্তমানে জাতীয় পার্টির অবস্থান ওইভাবে থাকবে বলে মনে হয় না।’

জাতীয় পার্টির সাবেক মহাসচিব ও প্রেসিডিয়াম সদস্য এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের আন্তরিক চেষ্টা হবে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা। দলকে সম্মানজনক অবস্থানে রাখতে ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক রওনক জাহান বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণ এখন অন্য চেহারা নিচ্ছে। জাতীয় পার্টি তো আদর্শভিত্তিক কোনো পার্টি ছিল না। এটা পুরোটাই এরশাদের ব্যক্তি ইমেজ নির্ভর পার্টি ছিল। তার অবর্তমানে পার্টিটা টিকে থাকবে কিনা, সেটাই এখন সন্দেহের মধ্যে পড়ে গেলো।’

জানা যায়, এরশাদ গুরুতর অসুস্থ হওয়ার পরই তার দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। একেবারে শয্যাশায়ী হওয়ার আগে বিষয়টি আঁচ করতে পেরে এরশাদও জি এম কাদেরকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেন।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল