আদালতে হাজির করা হয় ওসি মোয়াজ্জেমকে। ফাইল ছবি

‘পাস’ করেছেন নুসরাত, বিচার শুরু ওসি মোয়াজ্জেমের

এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ওসি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি নির্দোষ।’

আমিনুল ইসলাম মল্লিক
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২১:২২ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২১:২২
প্রকাশিত: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২১:২২ আপডেট: ১৭ জুলাই ২০১৯, ২১:২২


আদালতে হাজির করা হয় ওসি মোয়াজ্জেমকে। ফাইল ছবি

(প্রিয়.কম) নির্মমভাবে নিহত ফেনীর ফুলগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে খুন হন তিনি। আজ আলিম পরীক্ষার ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, পরীক্ষায় ‘পাস’ করেছেন তিনি।

এদিকে নুসরাতের একটি বক্তব্য ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের মামলায় ট্রাইব্যুনালে বিচার শুরু হয়েছে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের। তার বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন করেছে ট্রাইব্যুনাল।

কয়টি বিষয়ে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল নুসরাতের?

১৭ এপ্রিল, বুধবার আলিম পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায়, নুসরাত কোরআন মাজিদ ও হাদিস বিষয়ের পরীক্ষায় ‘এ ’গ্রেড পেয়েছেন। বাকি পরীক্ষাগুলো দিতে না পারায় তাকে অনুত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে।

নিহত নুসরাত জাহান রাফি ও তার আলীম পরীক্ষার ফলাফল। ছবি: সংগৃহীত

ওসি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি নির্দোষ’

এদিকে ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আগে তাকে অভিযোগ পড়ে শোনান রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম। তিনি ওসি মোয়াজ্জেমকে জিজ্ঞেস করেন, ‘নুসরাতের ভিডিও ভাইরাল করার অপরাধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হলো। আপনি দোষী না নির্দোষ?’ এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ওসি মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমি নির্দোষ।’

সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। অভিযোগ গঠনের ফলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারকাজ শুরু হয়েছে। এদিন কারাগার থেকে মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতে হাজির করা হয়।

এ সময় মামলার দায় থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। শুনানি শেষে অব্যাহতির আবেদন নামঞ্জুর করে অভিযোগ গঠন করে আদালত। সেই সঙ্গে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ৩১ জুলাই দিন ধার্য করা হয়।

এর আগে ১০ জুলাই মামলার অভিযোগ গঠন শুনানির দিন ধার্য ছিল। কিন্তু গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে তাকে আদালতে হাজির না করায় অভিযোগ গঠন শুনানি পেছানোর আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। বিচারক সময় আবেদন মঞ্জুর করে ১৭ জুলাই (আজ বুধবার) অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য নতুন দিন ধার্য করেন।

অভিযোগ গঠনের বিরোধিতার পাশাপাশি আসামির আইনজীবী আদালতে আরও দুটি আবেদন করেন। প্রথমত, তিনি এজলাসে পুলিশের উপস্থিতিতে আসামির সঙ্গে আইনজীবীদের প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার সুযোগ চান, দ্বিতীয়ত মামলার আর্জিতে বর্ণিত (সংযুক্ত) পেনড্রাইভের কপির জন্য আবেদন করেন। আদালত পেনড্রাইভের কপি সংযুক্তির আবেদন মঞ্জুর করলেও এজলাসে কথা বলার আবেদন মঞ্জুর করেননি।

এর আগে গত ২৪ জুন জেল কোড অনুযায়ী, ওসি মোয়াজ্জেমের ডিভিশনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন আদালত। ১৭ জুন বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আস শামস জগলুল হোসেন ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে এসে গত ১৬ জুন শাহবাগ থেকে তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

২৭ মে বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) প্রতিবেদন আমলে নিয়ে এ গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। আসামি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন করেন মামলার বাদী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন। আদালত বাদীর আবেদন আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এদিন সকালে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন পিবিআইয়ের সদর দফতরের সিনিয়র এএসপি রিমা সুলতানা।

গত ১৫ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (প্রত্যাহার হওয়া) মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলার আবেদন করেন ব্যারিস্টার সুমন। আদালত তার জবানবন্দী নিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর ২৬, ২৯ ও ৩১ ধারায় করা অভিযোগটি পিটিশন মামলা হিসেবে গ্রহণ করে। পরে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেয় আদালত।

গত ২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা যৌন নিপীড়ন করেন, এমন অভিযোগ উঠলে দুজনকে থানায় নিয়ে যান ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। ওসি নিয়ম ভেঙে জেরার সময় নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন।

মৌখিক অভিযোগ নেওয়ার সময় দুই পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনো নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না। ভিডিওটি প্রকাশ হলে অধ্যক্ষ ও তার সহযোগীদের সঙ্গে ওসির সখ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, থানার ওসির সামনে অঝোরে কাঁদছেন নুসরাত। সেই কান্নার ভিডিও করা হচ্ছে। নুসরাত তার মুখ দুই হাতে ঢেকে রেখেছিলেন। তাতেও আপত্তি ছিল। বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি এও বলা হয়, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, ওসি মোয়াজ্জেম অনুমতি ছাড়া নিয়মবহির্ভূতভাবে নুসরাতকে জেরা এবং তা ভিডিও করেন। পরবর্তী সময়ে ওই ভিডিও ফেসবুক ও ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভিডিওতে দেখা যায়, অত্যন্ত অপমানজনক ও আপত্তিকর ভাষায় একের পর এক প্রশ্ন করা হয় নুসরাতকে। নুসরাতের বুকে হাত দিয়ে শ্লীলতাহানি করা হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নও করতে শোনা যায়। অধ্যক্ষের নিপীড়নের ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

এরপর গত ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসায় যান। এ সময় মাদরাসার এক ছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে- এমন সংবাদ দিলে তিনি ওই বিল্ডিংয়ের চার তলায় যান। সেখানে মুখোশ পরা চার-পাঁচজন তাকে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে মামলা ও অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত অস্বীকৃতি জানালে তারা তার গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। পরে গত ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মৃত্যু হয় নুসরাতের।

প্রিয় সংবাদ/রুহুল