ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গুইদোর ঘনিষ্ট সম্পর্কও মাদুরোর প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কারণ। ছবি: সংগৃহীত

চীনের হাতে ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ!

গত দুই দশকে চীন একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ দিয়েছে ভেনেজুয়েলাকে। কিন্তু ভেনেজুয়েলা সেই ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

রুহুল আমিন
জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৯, ২১:২২ আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০
প্রকাশিত: ২০ জুলাই ২০১৯, ২১:২২ আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯, ২১:৩০


ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গুইদোর ঘনিষ্ট সম্পর্কও মাদুরোর প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কারণ। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা জুয়ান গুইদো নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। তখন তিনি ভেবেছিলেন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে খুব সহজেই ক্ষমতা থেকে উৎখাত করতে পারবেন।

এই ক্ষেত্রে গুইদোর ত্রিমুখী পরিকল্পনা ছিল। প্রথমত, নির্বাচনের অনিয়মকে সামনে এনে মাদুরোর রাষ্ট্রপতিত্বকে অবৈধ ঘোষণা তাকে ক্ষমতায় বসাবে। দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং তৃতীয়ত নতুন করে নির্বাচন তাকে ক্ষমতায় বসানো।

যাই হোক, এরপর ছয় মাস পার হলো কিন্তু এখনো গুইদো মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারেননি। ৩৫ বছর বয়সী গুইদোর ওই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ হলো মাদুরোর প্রতি কিছু আন্তর্জাতিক শক্তির জোর সমর্থন। বিশেষ করে চীনের মতো দেশের সমর্থন।

বিশ্ব শক্তির একটি চীন, যাদের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার খুবই গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। আর চীন সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলিয়ে গুইদোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অসম্মতি জানায়।

গুইদোর বিদেশি মিত্ররা চীনের এই ভূমিকাকে মাদুরো এবং তার সরকারের প্রতি সমর্থন হিসেবে বিবেচনা করছে। এমনকি ভেনেজুয়েলার চলমান সঙ্কটের জন্য তারা চীনকে দায়ীও করছে। গুইদোর এই বিদেশি মিত্রদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাও রয়েছেন।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও চিলি সফরের সময় বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন মাদুরোর সরকারকে চীনের অর্থ সহায়তার কারণেই ভেনেজুয়েলার চলমান সঙ্কট দীর্ঘায়িত হচ্ছে। আর অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কমান্ডো প্রধান অ্যাডমিরাল ক্রেইগ ফ্যালার দাবি করেন, ভেনেজুয়েলাকে প্রযুক্তিগত নজরদারির মাধ্যমে সাহায্য করছে চীন, যা ভেনেজুয়েলার জনগণকে নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নে ব্যবহার করা হচ্ছে।

যদিও চলমান সঙ্কটে চীনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার বিষয়টি স্বীকার করেই গুইদো মাদুরো সরকারের প্রতি সমর্থন বন্ধে বেইজিংকে কনভিন্স করার চেষ্টা করছেন।

চীনা ভূমিকা নিয়ে পম্পেও’র সমালোচনার একদিন পরই ভেনেজুয়েলার সঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট গুইদো ব্লোমবার্গে একটি নিবন্ধ লিখেন। যার শিরোনাম ছিল, ‘ভেনেজুয়েলায় চীনকে কেন পক্ষ পরিবর্তন করা উচিত’। ওই লেখায় গুইদো যুক্তি দেন, তার সরকার চীনের স্বার্থ রক্ষা করবে এবং চাভিস্তা (হুগো চাভেজের রাজনীতির উত্তরসূরী) সরকারের চেয়ে তার সময়ে বেশি বিনিয়োগের সুযোগ হবে। এমনকি চীন যদি তাদের সমর্থন পরিবর্তন করে তবে ভেনেজুয়েলাতে নতুন করে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পাবে বলেও প্রতিশ্রুতিও দেন গুইদো।

গুইদোর ওই নিবন্ধ এবং পম্পেওর বক্তব্যে এই সত্যই প্রকাশ হয়েছে, চীনের রাজনৈতিক অবস্থানই প্রধান ক্রীড়নক যা ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে।

চীনের কাছে ভেনেজুয়েলা এতো গুরুত্বপূর্ণ কেন?

বেইজিং যেমন অর্থনীতি ও রাজনৈতিক অংশীদারীত্বের ক্ষেত্রে কারাকাসের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি লাতিন আমেরিকার এই দেশটি চীনের কাছেও খুব গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের কাছে বিষয়টি এমন যে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের নিকটবর্তী দেশ হওয়ায় তেল সমৃদ্ধ সমাজতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলা চীনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী পার্টনার ও ভূরাজনৈতিক মিত্র বিবেচিত হচ্ছে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, ভেনেজুয়েলাতে গত কয়েক দশকের চীনের বিনিয়োগ দেশটিকে চীনের ভাবি সমৃদ্ধ অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবেও তৈরি করেছে।

১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পরই চীন ও ভেনেজুয়েলার মধ্যে এই সহযোগিতার শুরু হয়। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরী মাদুরো সরকারের সঙ্গেও সেই সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে। ২০০০ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশ দুটির মধ্যে বাণিজ্য ২০গুণ বৃদ্ধি পায় এবং ভেনেজুয়েলাতে চীনের সরাসরি বিনিয়োগ ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। যদিও ভেনেজুয়েলাকে দেওয়া চীনের সর্বমোট ঋণের পরিমাণ ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারও ছাড়িয়ে গেছে।

চীনের এই ঋণ ও বিনিয়োগের বেশিরভাগই ভেনেজুয়েলার তেল সেক্টর সম্পর্কিত। ২০০৭ সালে বেইজিং চায়না-ভেনেজুয়েলান জয়েন্ট ফান্ড (এফসিসিভি) গঠন করে, যার আওতায় চীন থেকে ভেনেজুয়েলা ধারাবাহিকভাবে পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে। আর এই ঋণ অপরিশোধিত তেল দিয়ে শোধ করতে পারবে ভেনেজুয়েলা। অপরদিকে এফসিসিভির আওতায় চীনা সরকার ভেনেজুয়েলার অরিনোকো ওয়েল বেল্টে তেল উৎপাদনে অংশ নিতে পারবে। অরিনোকো ওয়েল বেল্টকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেলক্ষেত্র বিবেচনা করা হয়।

মাদুরোর পাশে এখনো কেন চীন রয়েছে?

গত দুই দশকে চীন একটা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ঋণ দিয়েছে ভেনেজুয়েলাকে। কিন্তু ভেনেজুয়েলা সেই ঋণ পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। কারণ চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় তেল উৎপাদন কমে গেছে। আর এটা চীনের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এদিকে ব্যবসার প্রতিকূল অবস্থা বিরাজ করায় সরাসরি বিনিয়োগের অধিকাংশই স্থগিত বা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে চীন।

ভেনেজুয়েলাতে বর্তমানে ঝুঁকির কথা স্বীকার করেই চীন দেশটিতে তাদের উদ্দেশ্য ও অবকাঠামোগত ঋণ প্রদানের নতুন লক্ষ নির্ধারণ করেছে। চীন ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি সংস্থা প্রেট্রোলিয়ো দে ভেনেজুয়েলা-এসএ’র সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে নেওয়া উদ্যোগগুলো নিয়ে কাজ করছে। কারাকাসকে দেওয়া তাদের অর্থের ব্যবহারের বিষয়েও নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।

এইসব ক্ষতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বেইজিং মাদুরোকে এখন পর্যন্ত সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এই ব্যাপারে চীনা সরকারি ভাষ্য হলো, চীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপে পছন্দ করে না। যদিও এই বক্তব্যকে বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্ভাবনা সত্ত্বেও মাদুরোকে সমর্থন করার পক্ষে কোনো ব্যাখ্যা বা মানানসই যুক্তি হিসেবে বিবেচনায় আনা যায় না।

আর অন্যভাবে বললে, এ রকমটি হওয়ার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। বেইজিং এই কারণে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকারকে সমর্থন করছে যে, তারা বিশ্বাস করে বর্তমান সঙ্কটের ফলে তাদের বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হলেও, যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে নাকের ডগায় একটি সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার দেশ থাকা তাদের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

এ ছাড়া ‘সাউথ-সাউথ কোঅপারেশ’ চীনের বর্তমার বিদেশ নীতির প্রধান একটি বিষয় এবং চীন চায় না বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে তাদের যে আস্থা ও সুনাম তা নষ্ট হোক। কারণ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নির্বাচিত বৈধ সরকারকে উৎখাতে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিরোধীদলকে সমর্থন করা মানে তাদের সেই সুনাম নষ্ট হওয়া বলে মনে করছে চীন।

অন্যদিকে গুইদোর সর্বোচ্চ সহেযোগিতার প্রতিশ্রুতির পরও চীনের তাকে বিশ্বাস করার কারণ নেই। কারণ গত কয়েক বছর ধরে ভেনেজুয়েলায় চীনের ঋণ নীতির বিষয়ে বিরোধীদের দ্বৈত অবস্থানের ব্যাপারে চীন অবগত। বেইজিংয়ের এখন এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, চাভিস্তা সরকারের নেওয়া ঋণ গুইদো ক্ষমতায় গেলে পরিশোধ করবে।

এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গুইদোর ঘনিষ্ট সম্পর্কও মাদুরোর প্রতি চীনের সমর্থন অব্যাহত রাখার কারণ। চীনা সরকার বিশ্বাস করে না যে ভেনেজুয়েলার এলিট শ্রেণি, যারা ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজকে অভিভাবক করতে চায় তারা ভেনেজুয়েলা বা এই অঞ্চলে চীনের স্বার্থ রক্ষা করবে।

চীনের এই অবস্থান অবশ্য একেবারে পাথরে বাধানো নয়। গুইদো ও তারা সমর্থকরা এখনো চীনকে মাদুরোর প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারে রাজি করাতে চেষ্টা করতে পারে। তার জন্য গুইদো ও তার সমর্থকদের ট্রাম্প প্রশাসন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে এবং ভেনেজুয়েলায় দেওয়া চীনা ঋণের ব্যাপারে অঙ্গীকারগুলোর প্রতি সম্মান জানানোর বিশেষ কিছু আশ্বাসও দিতে পারে।

যদি বিরোধীরা বেইজিংয়ের আস্থা অর্জনে সত্যিই কোনো রাস্তা খুঁজে পায় তখনই কেবল ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে তাদের।

লেখক: কার্লোস এডুয়ার্ডো পিনা। পিনা ভেনেজুয়েলার একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী।

সূত্র: আল-জাজিরা

প্রিয় সংবাদ/কামরুল