ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখো গেছে। ছবি: সংগৃহীত

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি, সচেতনতায় পুলিশের উদ্যোগ

পুলিশ সদর দফতর সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, গুজব ছড়িয়ে এবং গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ।

প্রিয় ডেস্ক
ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৮ আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৯, ২১:৪১
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৮ আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৯, ২১:৪১


ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখো গেছে। ছবি: সংগৃহীত

(প্রিয়.কম) ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ সম্প্রতি এমন একটি গুজব ছড়ায় দেশে। আর ওই গুজবের জেরে ছেলেধরা সন্দেহে ঢাকাসহ সারা দেশে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন অসুস্থ ব্যক্তি, নারীসহ বেশ কয়েকজন ব্যক্তি। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, গণপিটুনির ঘটনায় গত ১৫ দিনে অন্তত ৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও প্রায় দুই ডজন।

২১ জুলাই, রবিবার কুমিল্লা সদর উপজেলার আমড়াতলী সড়ক এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীসহ তিনজনকে ধরে গণপিটুনি দিয়েছে স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ আহত অবস্থায় তিনজনকে উদ্ধার করেছে। তবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি।

এদিকে রবিবার সকালে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার গালা ইউনিয়নের কান্দিলা বাজারে ছেলেধরা সন্দেহে এক যুবককে গণপিটুনি দিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। খবর পেয়ে পুলিশ ওই যুবককে উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেলারেল হাসপাতালে ভর্তি করে। তবে ওই যুবকের পরিচয় জানা যায়নি।

নওগাঁর মান্দা উপজেলায় রবিবার সকালে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন সাত ব্যক্তি। এর মধ্যে উপজেলার বুড়িদহ গ্রামে ছয়জন এবং মহানগর স্কুলের সামনে থেকে একজনকে স্থানীয়দের হাত থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। আহতদের পরিচয় জানা যায়নি।

শনিবার (৩০ জুলাই) দিবাগত রাতে ছেলেধরা সন্দেহে সাভারের হেমায়েতপুরে গণপিটুনিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী নিহত হওয়ার ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৮০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেছে সাভার মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) কামরুল ইসলাম। এর আগে শনিবার দুপুরে তেঁতুলঝোড়া এলাকায় গণপিটুনিতে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারী নিহত হয়।

গতকাল ঢাকার বাড্ডা, কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির শিকার হয়ে নারীসহ তিনজন  নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া দেশের পাঁচ জেলায় পাঁচজনকে গণপিটুনি দেওয়া হয়। এর মধ্যে চারজন মানসিক ভারসাম্যহীন এবং একজন মাদকাসক্ত। এদের মধ্যে রাজধানীর বাড্ডায় মেয়ের ভর্তির জন্য খোঁজ নিতে বিদ্যালয়ে গিয়ে গণপিটুনিতে এক নারী নিহত হন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে অজ্ঞাতনামা এক যুবক নিহত হন। নেত্রকোনায়ও গণপিটুনিতে একজন নিহত হয়।

এ ছাড়া গত কয়েকদিনে ছেলেধরা সন্দেহে গাজীপুর, নেত্রকোনা, পটুয়াখালী, চাঁদপুর, বরিশাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, লক্ষ্মীপুর, বান্দরবানসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় গণপিটুনির ঘটনা ঘটে।

এদিকে পুলিশ সদর দফতর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, গুজব ছড়িয়ে এবং গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ।

সেতু তৈরিতে মানুষের মাথা লাগার গুজব

পদ্মা সেতুর নির্মাণ কাজের জন্য মানুষের মাথা লাগবে বলে যে গুজব ছড়িয়ে পড়েছে, তার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ।

পদ্মাসেতুর প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ছড়িয়ে পড়া ওই গুজবের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন থাকতে বলা হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয় যে, পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা লাগবে বলে একটি মহল সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

সেতুর নির্মাণকাজের অগ্রগতি তুলে ধরে ওই বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয় যে, ব্রিজ নির্মাণে মানুষের মাথা প্রয়োজন হওয়ার বিষয়টি পুরোপুরি গুজব।

পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য ওই অঞ্চলের কাছে বেশ কয়েকটি এলাকায় বিভিন্ন বয়সী মানুষ অপহৃত হচ্ছে বলেও গুজব ছড়িয়ে পড়ায় কিছু এলাকায় মানুষের মধ্যে ভিত্তিহীন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে দেশের বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে খবর বের হয়।

তবে কোনো এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছ থেকেই কোনো অপহরণের খবর পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশে সেতু নির্মাণ বা এ রকম বড় কোনো স্থাপনা নির্মাণ কাজে নরবলির গুজব নতুন নয়। দেশের শাসনব্যবস্থার ঐতিহাসিক পটভূমি এবং গ্রামাঞ্চলের মানুষের চিন্তাধারা পর্যবেক্ষণ করলেই এর কারণ বোঝা সম্ভব।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখবেন আমাদের এই অঞ্চল বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন রাজা, সম্রাটদের মতো বিভিন্ন ধাঁচের শাসকদের অধীনে ছিল।’

সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘কথিত আছে, ১৫৮০ সালের দিকে মৌলভীবাজারে কমলার দীঘি তৈরি করার সময় দীঘিতে যখন পানি উঠছিল না, তখন রাজা স্বপ্ন দেখেন যে তার স্ত্রী দীঘিতে আত্মবিসর্জন দিলে পানি উঠবে এবং পরবর্তীতে রাজার স্ত্রী আত্মাহুতি দেওয়ার ফলেই ওই দীঘিতে পানি ওঠে।’

দিনাজপুরের রামসাগর তৈরিতেও একই ধরনের কিংবদন্তী প্রচলিত রয়েছে বলে জানান তিনি। সুস্মিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘এসব ঘটনার কোনো প্রামাণিক দলিল বা সুনিশ্চিত ঐতিহাসিক প্রমাণ না থাকলেও শত শত বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে চলে আসার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ ধরনের গল্পের একটা গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়।’

সফলভাবে ব্রিজ তৈরি করতে পিলারের নিচে মানুষের মাথা দিতে হবে - আবহমান কাল থেকে মানুষের মধ্যে প্রচলিত এই কুসংস্কার নিয়ে বাংলা সাহিত্যে বেশকিছু গল্পও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে যেসব গল্প শুনে আসে, কোনো ধরনের যাচাই ছাড়া সেগুলো বিশ্বাস করার প্রবণতার কারণেই এই প্রযুক্তির যুগেও সেসব গল্প সত্যি বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক (সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক) তৌহিদুল হক বলেন, ‘যেকোনো উন্নয়নকে কেন্দ্র করে মানুষের রক্ত লাগে, শিশুদের মাথা লাগে, এ ভ্রান্ত ধারণা মানুষের মনে যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। এগুলো যখন গুজব আকারে ছড়িয়ে পড়ে তখন যে কাউকে দেখলেই সন্দেহ করে সাধারণ মানুষ, তাদের সঙ্গে হিংস্র আচরণ করে।’ 

এদিকে শনিবার গণপিটুনিকে ‘ফৌজদারি অপরাধ’ উল্লেখ করে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে একটি বার্তা পাঠিয়েছে পুলিশ সদর দফতর।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া

ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে অনেককে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। 

সাংস্কৃতিক কর্মী পাভেল রহমান ফেসবুকে পেজে লেখেন, ‘ছেলেধরা সন্দেহে যে মানুষটিকে পিটিয়ে মেরে ফেলছেন, সেই আপনি কেমন ভালো মানুষ!’

টিভি সাংবাদিক সাদিয়া আফরোজ লিখেন, ‘এটাই আমার মাতৃভূমি! জননীকে পিটিয়ে মারা মাতৃভূমি! নপুংশকে ভরা জন্মভূমি? এখানে বেঁচে আছি এখনো?’

হাসান ইমাম রাজন নামের আরেকজন লেখেন, ‘এখন যদি কোনো ছোট বাচ্চা রাস্তায় হারিয়ে যায়, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদেও, তাওতো আর এগিয়ে যাবো না। ছেলে ধরা বলে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলবে...! মানুষ কি বোঝে না কোনটা চোর আর কোনটা ভালো মানুষ...? এই কারণেই মানবিকতা দেশ থেকে উঠেই যাচ্ছে...!’

পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) হারুনুর রশিদ ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণহানির ঘটনার বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘সন্দেহভাজন মনে হলে তাকে মারধর না করে পুলিশের হাতে তুলে দিন।’ ২১ জুলাই, রবিবার দুপুরে চাষাড়ায় নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ কথা বলেন। জেলাজুড়ে ছেলেধরা সন্দেহভাজনদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিতে পুলিশের পক্ষ থেকে মাইকিং করা হয়।

গুজব ছড়ানোর সমাধান: জনগণের কাছে তথ্যপ্রবাহকে অবারিত করা

অধ্যাপক সুস্মিতা চক্রবর্তীর মতে, ‘এ ধরনের গুজব যেন না ছড়িয়ে পড়ে তা নিশ্চিত করার একমাত্র পদ্ধতি, ব্রিজ নির্মাণের খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালকের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে বিস্তারিত জানানো। জনগণের কাছে তথ্যপ্রবাহকে যতটা অবারিত করা হবে, সাধারণ মানুষকে ধোঁয়াশা থেকে মুক্ত করার জন্য যতবেশি প্রয়াস নেওয়া হবে, ততই এ ধরনের গুজব তৈরি হওয়া এবং ছড়িয়ে পড়া কমবে।’

অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘এ ধরনের পরিস্থিতিতে এলাকার নির্বাচিত ও অনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে একটি কমিটি হতে পারে। এলাকায় সন্দেহভাজন কাউকে দেখলে তাকে ধরে কমিটির কাছে এনে যাচাই-বাছাই করা যেতে পারে।’

তৌহিদুল হক মনে করেন, ‘এসব ক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের সব সময় সতর্ক আচরণ করতে হবে। এসব ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য তৎপর থাকতে হবে। টিভিতে, বিজ্ঞাপন, লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশের মতো সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।’

প্রিয় সংবাদ/কামরুল/রুহুল